শূন্যতার রাজনীতি: একটি সম্ভাবনার আত্মহত্যা
- প্রকাশের সময় : ১১:০১:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 189
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, প্রতিটি যুদ্ধ, বিপ্লব কিংবা গণঅভ্যুত্থানের পরই একটি জাতির সামনে নতুন করে গড়ে উঠার, পুনর্গঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ হাজির হয়। ১৯৭১-এর পরেও এমনটা হয়েছিল। ১৯৯০-এর পরেও। কিন্তু আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আবারও সেই একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এক বিরল সম্ভাবনা আমাদের আঙুল ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছে।
এবারের সম্ভাবনার মুখ ছিল একটি নতুন, তারুণ্যনির্ভর রাজনৈতিক শক্তি। গণঅভ্যুত্থানের উত্তাপ থেকে জন্ম নেয়া এই আন্দোলন প্রথমে ছিল অরাজনৈতিক, পরে রাজনীতির ময়দানে পা রাখে। পুরনো রাজনীতির বিভাজন, বিদ্বেষ ও পচনের বিরুদ্ধে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় আশার আলো। মানুষ ভেবেছিল, এই দলটি হবে ভিন্ন। হবে ঐক্য ও আদর্শের প্রতীক।
কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, এই আশার আলো তত ম্লান হয়েছে। দলটি আজ মতাদর্শহীনতা ও দিকহীনতার এক গভীর সংকটে আটকে আছে। বাম না ডানে, না হয়তো পুরো নতুন কোনো পথ—সে সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি তারা। জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কে, সংকটে তাদের ভূমিকা চোখে পড়ার মতো নয়। মবিং, লুটপাট, জাতীয় সংগীত অবমাননার মতো ঘটনায় তাদের কণ্ঠস্বর প্রায় অনুপস্থিত। তাদের রাজনীতি একটি শূন্যস্থান দখল করে আছে—নীতিহীন, অবস্থানহীন, নিশ্চুপ এক উপস্থিতি।
এই শূন্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে শিক্ষাখাতে। ২০২৪-এর আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা। শিক্ষার দীর্ঘ বঞ্চনা, আবাসন ও চাকরির অনিশ্চয়তাই তরুণদের রাস্তায় নামিয়েছিল। তাই স্বাভাবিক ছিল যে নতুন এই রাজনৈতিক শক্তি শিক্ষার ব্যাপক সংস্কারকে তাদের কেন্দ্রীয় এজেন্ডা করবে।
কিন্তু বাস্তবতা পুরোপুরি ভিন্ন। তারা শিক্ষার মৌলিক সংস্কার—যেমন জিডিপির ৫% বরাদ্দ, গবেষণার উন্নয়ন, শিক্ষকদের মর্যাদাপূর্ণ বেতনকাঠামোর জন্য জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তারা আচরণ করেছে এক চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর মতো, শুধুমাত্র নিজেদর পছন্দের ব্যক্তিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টায় মগ্ন থেকেছে।
এটি কোনো দৈব ব্যর্থতা নয়। এটি একটি সম্ভাবনার আত্মহত্যা। তারা ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তারা বুঝতে পারেনি যে বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ দশকের পর দশক ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রান্তিক ও দরিদ্র রাখা হয়েছে এক গভীর সামাজিক হীনমন্যতা থেকে। এ দেশে একটি বিকৃত ধারণা কাজ করে—শিক্ষকদের দরিদ্র ও অনাহূত থাকাই যেন তাদের ‘সম্মানের’ পূর্বশর্ত। এই মনোবৃত্তি ভাঙার সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল ২০২৪-পরবর্তী সময়। নতুন রাজনৈতিক শক্তি চাইলে এই দুষ্টচক্র ভাঙার পথিকৃত হতে পারত।
কিন্তু তারা নীরব থেকেছে। তারা রাজনীতির আসল ময়দান—নীতি, আদর্শ ও দূরদর্শী সংস্কারের লড়াই—এড়িয়ে গেছে। জোহরান মামদানির মতো ব্যক্তিরা যখন স্পষ্ট নৈতিক অবস্থান নিয়ে এগোচ্ছেন, তখন এই নবীন শক্তি রয়ে গেছে আদর্শগত শূন্যতা আর রাজনৈতিক অস্পষ্টতার অন্ধকারে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান আমাদের দেখিয়েছিল যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা কতটা প্রখর। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষাকে একটি সংগঠিত, নীতিবাদী ও দিকনির্দেশনাপূর্ণ রাজনৈতিক বলয়ে পরিণত করতে ব্যর্থতা একটি জাতির সম্ভাবনাকে আত্মঘাতী হওয়ার পথে ঠেলে দিয়েছে। আমরা আবারও দেখছি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি: বিপ্লবের পর যে জায়গায় একটি নবজাগরণের কথা, সেখানে জমে উঠছে ফাঁকা বুলি ও নিষ্ক্রিয়তার স্তূপ। এর নামই হলো শূন্যতার রাজনীতি—আর এটিই একটি গোটা জাতির ভবিষ্যতের সম্ভাবনাকে আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যাওয়ার শামিল।
লেখক : মো. মাহবুবুর রহমান
সহকারীঅধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।
Email : mmrrajbari71@gmail.com

























