বেসরকারি শিক্ষা জাতীয়করণ এখন সময়ের দাবি
- প্রকাশের সময় : ১১:১২:১৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
- / 12
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশে ৩৫ হাজারেরও বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিক বিদ্যালয়, স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ, মাদ্রাসা এবং কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই এমপিওভুক্ত এবং দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাব্যবস্থার মূল দায়িত্ব পালন করছে।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের প্রায় ৯৩ থেকে ৯৭ শতাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত, যাঁদের মধ্যে চার লাখের বেশি এমপিওভুক্ত। তাঁরা সরকারের কাছ থেকে মূল বেতন এবং সীমিত কিছু ভাতা পেলেও সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের মতো পূর্ণাঙ্গ চাকরির সুবিধা পান না।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা একই পাঠ্যক্রম, একই সিলেবাস, একই পরীক্ষাব্যবস্থা এবং একই একাডেমিক ক্যালেন্ডারের আওতায় দায়িত্ব পালন করেন। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান—সব ক্ষেত্রেই তাঁদের দায়িত্ব সরকারি শিক্ষকদের সমপর্যায়ের। কিন্তু বেতন-ভাতা, আবাসন সুবিধা, চিকিৎসা, উৎসব ভাতা, পদোন্নতি, বদলি ও অবসর-পরবর্তী সুবিধার ক্ষেত্রে এখনও বড় ধরনের বৈষম্য বিদ্যমান।
বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা, এক হাজার টাকা বাড়িভাড়া এবং ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। অন্যদিকে বেতন ছাড়ের প্রক্রিয়াও দীর্ঘ ও জটিল। সরকারি অর্থ ছাড়ের পরও বিভিন্ন প্রশাসনিক ধাপ অতিক্রম করতে গিয়ে অনেক সময় মাসের ২০ তারিখের পর শিক্ষকদের হাতে বেতন পৌঁছায়। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রায় এমন ব্যবস্থা সময়োপযোগী নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সহজে বদলির সুযোগ পান না। অবসরের পর অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পেতেও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। অনেক শিক্ষক অর্থাভাবে চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রতি মাসে তাঁদের বেতন থেকে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য নিয়মিত অর্থ কেটে রাখা হয়।
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ শোনা যায়। যদি রাষ্ট্র শিক্ষার্থীদের নির্ধারিত ফি ও প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য আয় স্বচ্ছভাবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে, তাহলে একদিকে যেমন জবাবদিহিতা বাড়বে, অন্যদিকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হবেন।
বাংলাদেশে অতীতে সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০১৩ সালে নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের মাধ্যমে লাখো শিক্ষক-কর্মচারীর কর্মজীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। ফলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিও নতুন নয়।
জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০, ইউনেস্কো ও আইএলওর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষায় অধিক বিনিয়োগ, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে বেসরকারি শিক্ষকদের বৈষম্য দূর করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয়করণই একমাত্র সমাধান কি না, তা নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার বিষয়; তবে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান বৈষম্য ও প্রশাসনিক জটিলতার একটি টেকসই সমাধান এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রত্যাশা—তাঁদের জীবনমান উন্নয়ন, চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা এবং অবসর-পরবর্তী আর্থিক নিশ্চয়তা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কারণ, একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মূল শক্তি শিক্ষক। তাঁদের ন্যায্য মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকছেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।













