মাধ্যমিক শিক্ষা ও নারী উন্নয়নে সরকারী উপবৃত্তির ভূমিকা
- প্রকাশের সময় : ০৩:৫৬:৪৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
- / 10
শিক্ষাই নারীর ক্ষমতায়ন ও সার্বিক উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি। এক সময় আমাদের দেশে নারী শিক্ষার হার ছিল তলানীতে। এখন দেশে নারী শিক্ষা হার সমতায় ফিরেছে। আর এই শিক্ষার হার সমতায় ফেরাতে সরকারি উপবৃত্তি, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং পরীক্ষার ফরম পূরণে নগদ অর্থ সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং উপস্থিতির হার আশাতীতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং নারী উন্নয়নে সরকারি উপবৃত্তির প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণার মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সরকারি উপবৃত্তি প্রকল্পের ভূমিকা মূল্যায়ন করা এবং এই শিক্ষার মাধ্যমে নারীরা পরিবার ও সমাজে লিঙ্গবৈষম্য হ্রাসে কি ধরনের অবদান রাখছে তা অন্বেষণ করা হয়। এছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষা নারীদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ, উপার্জনক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক পুঁজির মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়নে কতটা সহায়ক তা এই গবেষণায় বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কেস স্টাডি পরিচালনা করা হয়েছে। সরকারের দেওয়া বিভিন্ন প্রতিবেদন, প্রশ্নপত্র এবং দলীয় আলোচনা পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং এসম্পর্কিত প্রকাশিত বিভিন্ন বই অনুস্মরণ করে গবেষণা পরিচাণা করা হয়।
গবেষণার দেখা যায়, উপবৃত্তি কর্মসূচি দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে এক বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশে মাধ্যমিক স্তরে জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা, বাল্যবিবাহ রোধ এবং অনগ্রসর নারী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকারি উপবৃত্তি কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে।
এই কর্মসূচির ফলে বিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অন্তর্ভুক্তি ও শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উপবৃত্তির পাশাপাশি বিনা বেতনে অধ্যয়ন এবং বিনামূল্যে বই বিতরণের মতো সহায়ক উদ্যোগগুলো দরিদ্র অভিভাবকদের কন্যা সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার মাধ্যমে নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রসারিত হয়েছে; তারা আজ গার্মেন্টস শিল্প, নার্সিং, শিক্ষকতাসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি পেশায় যুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জন করছে। এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রগতি নারীদের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করেছে এবং পরিবার ও সমাজে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও নেতৃত্বকে শক্তিশালী করে নারীর ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করেছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর নারীরা গার্মেন্টস, নার্সিং, প্রাথমিক শিক্ষকতা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি করেছে। শিক্ষিত নারীরা এখন পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছে এবং তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি ও জেন্ডার সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিশেষে, গবেষণাটি নিশ্চিত করে যে মাধ্যমিক স্তরের উপবৃত্তি কর্মসূচি বাংলাদেশের নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের পথে একটি মাইলফলক। তবে সমাজ থেকে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও ধর্মীয় গোঁড়ামি সম্পূর্ণ দূর না হওয়ায় নারী উন্নয়নে এখনও কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। তাই নারী শিক্ষার এই অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে এবং উচ্চশিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
লেখক: বালিয়াকান্দি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, রাজবাড়ী।






















