জুলাইয়ের রক্তঋণ শোধ হবে সততা ও নৈতিকতার চর্চায়, শুধু বক্তৃতায় নয়: জাবি উপাচার্য
- প্রকাশের সময় : ০৮:৩০:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
- / 9
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তঋণ শুধু আলোচনা সভা, বড় বড় বক্তৃতা কিংবা বই লিখে শোধ হবে না। প্রকৃত অর্থে এই ঋণ শোধ করতে হলে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে সততা, নৈতিকতা ও আদর্শের চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেল ৪টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান অডিটোরিয়ামের সেমিনার কক্ষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ আয়োজিত ‘জুলাই: রক্তঋণের উত্তরাধিকার’ শীর্ষক আলোচনা সভা, লেখা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নিজের সভাপতিত্ব নিয়ে সম্ভাব্য সমালোচনার প্রসঙ্গ তুলে উপাচার্য বলেন, ‘অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির অনুষ্ঠানে উপাচার্য কেন সভাপতিত্ব করছেন। আমার কাছে জুলাই কোনো সংগঠনের বিষয় নয়, এটি একটি চেতনা। আমাকে যদি শুধু একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবেও ডাকা হতো, তবুও আমি একই আনন্দ নিয়ে উপস্থিত হতাম।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘জুলাই আমার কাছে অনির্ধারিত, প্রস্তুতিহীন একজন মানুষের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের ইতিহাস। রাত গভীরে ভাঙা গাড়িতে আতঙ্ক নিয়ে টকশো থেকে ফেরার ইতিহাস। তাই কে আয়োজন করল, সেটি নয়; আলোচনার বিষয়বস্তুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ তরুণ শক্তির কাছে কোনো ফ্যাসিবাদ টিকতে পারে না। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—প্রতিবারই তরুণরাই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিয়েছে।’
অনুষ্ঠানে উপস্থিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত শিক্ষার্থী ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের উল্লেখ করে উপাচার্য বলেন, ‘আমাদের সামনে আহত কাজল বসে আছেন, সৌভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে আছেন। এখানে শহীদ আলিফ ও শ্রাবণ গাজীর পরিবারও উপস্থিত আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত রক্তদানের পরও আমরা কেন সেই আত্মত্যাগের যথাযথ প্রতিদান দিতে পারি না? কারণ আমরা যা বলি, তা বিশ্বাস করি না; যে অঙ্গীকার করি, সে অনুযায়ী চলি না।’
তিনি বলেন, ‘আমি একটি প্রশাসনিক পদে এসে বুঝেছি, মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে “Practice of Virtue”। শুধু নিজেকে সৎ দাবি করলেই হবে না, ব্যক্তিজীবনেও সততার চর্চা থাকতে হবে। আপনি গোপনে অসৎ কাজ করে প্রকাশ্যে সততার কথা বললে সমাজ বদলাবে না।’
জুলাই আন্দোলনের ভয়াবহ মুহূর্তের স্মৃতি তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, ১৫ জুলাইয়ের হামলার সময় তিনি নিজেও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছিলেন। ‘সেদিন শিক্ষার্থীদের আর্তচিৎকার, হামলা এবং মৃত্যুভয়ের সেই দৃশ্য আমি কখনো ভুলতে পারব না। আমার পাশেই একজন সাংবাদিক রক্তাক্ত হয়েছিলেন, তাঁর রক্ত আমার পাঞ্জাবিতে লেগেছিল।’
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তরুণরাই বারবার পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু অভিভাবক প্রজন্ম বারবার ব্যর্থ হয়েছে। এর প্রধান কারণ সততার অভাব। নতুন প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা মুখে যা বলবে, কাজে সেটিই বাস্তবায়ন করবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের উপস্থিতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি তাঁর মধ্যে ভবিষ্যতের নেতৃত্বের সম্ভাবনা দেখি। তবে কোনো একজন ব্যক্তি একা পরিবর্তন আনতে পারবেন না। তাঁর চারপাশের মানুষদেরও সৎ, নির্লোভ ও নৈতিক হতে হবে।’
বক্তব্যের শেষদিকে উপাচার্য বলেন, ‘জুলাইয়ের চেতনার অনুষ্ঠানে আমাকে যদি দর্শক সারির শেষ আসনেও বসতে বলা হয়, আমি সানন্দে আসব। কারণ জুলাই আমার কাছে কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটি ন্যায়, সততা ও নৈতিকতার চেতনা।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব দল ও সংগঠনে নৈতিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। আমাদের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত—“আমি যা বলি, তা-ই করব।” তাহলেই শহীদদের রক্তের ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করা সম্ভব হবে।’























