Dhaka ০১:৪৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচুরিয়ার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আ. গফুরের সাথে দেখা করতে আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবীর রিজভী

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশের সময় : ১০:০৮:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫
  • / 115

‘৭৮ বছর বয়সেও ট্রেনে হকারি করে জীবীকা নির্বাহ করছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আ. গফুর’ শিরোনামে গত ১৩ অক্টোবর দৈনিক জনতার আদালত অনলাইনে এবং ১৪ অক্টোবর দৈনিক জনতার আদালতের প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশিত হয়েছিল সচিত্র প্রতিবেদন। সেই আ. গফুরের সাথে দেখা করতে আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির জেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। রাজবাড়ী জেলা বিএনপি সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রাজবাড়ী জেলা বিএনপির আহŸায়ক অ্যাড. লিয়াকত আলী জানান, আ. গফুরের বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি গোচর হওয়ায় বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবির রিজভী পাঁচুরিয়ায় তার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন।
দৈনিক জনতার আদালতের সেই প্রতিবেদন:
গুনে গুনে বলে দিলেন তার বয়স ৭৮ বছর ৫ মাস। চলেন ফেরেন স্বাভাবিক মানুষের মত। কোনো সমস্যা হয়না। তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আব্দুল গফুর। প্রতিবন্ধী হওয়া সত্তে¡ও ভিক্ষা না করে এ বয়সেও ট্রেনে বাসে হকারি করছেন দীর্ঘ ৬২ বছর ধরে। আব্দুল গফুর রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা।
সম্প্রতি তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট দুটি টিনের ছাপড়া ঘর। এখানেই তার স্ত্রী নুরজাহান বেগমকে নিয়ে বাস করেন আব্দুল গফুর। তাদের কোনো সন্তান নেই। ডাক দিতেই বেড়া হাতড়ে হাতড়ে বের হয়ে আসেন আব্দুল গফুর। চা নাস্তা আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বলেন, আমি অন্ধ হলেও আমার মনটা অন্ধ নয়। কথা হয় আব্দুল গফুরের সাথে।
জানালেন, তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। ভিটের জমিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি জন্মান্ধ। পৃথিবীটা কেমন সেটা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এ নিয়ে আক্ষেপ নেই। তারা পাঁচ ভাই, তিন বোন ছিলেন। এদের মধ্যে চার ভাই মারা গেছেন। ভাইদের মধ্যে বেঁচে আছেন শুধু তিনি। তিন বোনের একজন মারা গেছেন। জীবীত এক বোনও জন্মান্ধ। ১৬ বছর বয়স থেকে তিনি মহানবী(সা.)’র শিক্ষায় ভিক্ষা না করে কাজ করা শুরু করেন। নবীজীর শিক্ষা করোনা ভিক্ষা একথা বলে শোনালেন, মহানবী(সা.)’র সেই বিখ্যাত কম্বলের গল্পটি। ‘একদিন একজন আনসারী ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর কাছে ভিক্ষা চাইল। মহানবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন তার বাড়িতে কিছু আছে কিনা। লোকটি বলল, একটি কম্বল আছে যা সে পরিধান করে এবং একটি পাত্র আছে যা দিয়ে সে পানি পান করে। মহানবী (সা.) তাকে সেই দুটি জিনিস নিয়ে আসতে বললেন এবং সেগুলো বিক্রি করে অর্জিত টাকা দিয়ে কুঠার কিনতে বললেন। সেই কুঠার দিয়ে কাঠ কেটে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য তাকে উৎসাহিত করলেন।
বলেন, আমার তখন ১৬ বছর। ঢেঁকিতে ধান ভেঙে চার আনা পান। সেই চার আনা দিয়ে বিড়ি সিগারেট কিনে গ্রাম ঘুরে বিক্রি করেন। যা লাভ হলো তা দিয়ে পরদিন একটু বেশি কেনেন। এভাবে শুরু হয় তার রোজকার কাজ। পরে বিড়ি সিগারেট বিক্রি বাদ দিয়ে খাদ্য উপকরণ বিক্রি শুরু করেন। তার স্ত্রী পরম যতেœ নারকেলের নারু বানিয়ে দেয়। সাথে বাজার থেকে টেস্টি হজমি, চকলেট, চিপস, বাদাম ইত্যাদি কিনে সেগুলো প্যাকেটজাত করে বিক্রি করেন। পাঁচুরিয়া থেকে ট্রেনে ফরিদপুর, ভাঙ্গা, রাজবাড়ী, ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত বিক্রি করেন এসব। ট্রেনে উঠতে তার কোনো সমস্যা হয়না। কাউকে বললেই ট্রেনে তুলে দেয়। টাকায় হাত দিলেই বুঝতে পারেন কোনটা কত টাকার নোট। কোনোদিন দুইশ, আবার কোনোদিন পাঁচশ টাকা বিক্রি হয়। দিনে যা আয় করেন তা দিয়ে দুজনের সংসার চলে যায়। তার স্ত্রী তাকে সবসময় সহযোগিতা করেন।
আব্দুল গফুরের স্ত্রী নুরজাহান বেগম জানান, ৪০ বছর আগে আব্দুল গফুরের সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি সবকিছু জেনেই তাকে বিয়ে করেন। তার স্বামী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী- এনিয়ে কোনো দুঃখ নেই। সে একজন ভালো মানুষ। চোখে না দেখলেও তাকে খুব ভালোবাসেন।- এটাই তার বড় পাওয়া। তিনি তার স্বামীকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। জানালেন, তার স্বামী সমাজসেবা অফিস থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পান।
ভান্ডারিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন পেশায় একজন ভ্যানচালক। আব্দুল গফুরের নাম বলতেই তিনি চিনে ফেলেন। বলেন, তাকে চেনে না এই এলাকায় এমন কেউ নেই। আব্দুল গফুরের অনুভ‚তি ও স্মরণ শক্তি খুব প্রখর। যা তাদের মত মানুষকেও হার মানায়।
পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুস সালাম জানান, ছোটকাল থেকেই আব্দুল গফুর টিনের একটি বাক্স নিয়ে ট্রেনে বাসে হকারি করে জীবীকা নির্বাহ করেন। তার আরও দুই ভাই-বোন জন্মান্ধ ছিলেন। আব্দুল গফুর প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এছাড়া সরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতার সুযোগ এলে তিনি আব্দুল গফুরকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্তে¡ও তিনি ভিক্ষা না করে কাজ করছেন এটা একটি দৃষ্টান্ত।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

পাঁচুরিয়ার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আ. গফুরের সাথে দেখা করতে আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবীর রিজভী

প্রকাশের সময় : ১০:০৮:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৫

‘৭৮ বছর বয়সেও ট্রেনে হকারি করে জীবীকা নির্বাহ করছেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আ. গফুর’ শিরোনামে গত ১৩ অক্টোবর দৈনিক জনতার আদালত অনলাইনে এবং ১৪ অক্টোবর দৈনিক জনতার আদালতের প্রিন্ট ভার্সনে প্রকাশিত হয়েছিল সচিত্র প্রতিবেদন। সেই আ. গফুরের সাথে দেখা করতে আসছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির জেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। রাজবাড়ী জেলা বিএনপি সূত্রে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
রাজবাড়ী জেলা বিএনপির আহŸায়ক অ্যাড. লিয়াকত আলী জানান, আ. গফুরের বিষয়টি বিএনপির হাইকমান্ডের দৃষ্টি গোচর হওয়ায় বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নেতা রুহুল কবির রিজভী পাঁচুরিয়ায় তার সঙ্গে দেখা করতে যাবেন।
দৈনিক জনতার আদালতের সেই প্রতিবেদন:
গুনে গুনে বলে দিলেন তার বয়স ৭৮ বছর ৫ মাস। চলেন ফেরেন স্বাভাবিক মানুষের মত। কোনো সমস্যা হয়না। তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী আব্দুল গফুর। প্রতিবন্ধী হওয়া সত্তে¡ও ভিক্ষা না করে এ বয়সেও ট্রেনে বাসে হকারি করছেন দীর্ঘ ৬২ বছর ধরে। আব্দুল গফুর রাজবাড়ী সদর উপজেলার পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের খোলাবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা।
সম্প্রতি তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট দুটি টিনের ছাপড়া ঘর। এখানেই তার স্ত্রী নুরজাহান বেগমকে নিয়ে বাস করেন আব্দুল গফুর। তাদের কোনো সন্তান নেই। ডাক দিতেই বেড়া হাতড়ে হাতড়ে বের হয়ে আসেন আব্দুল গফুর। চা নাস্তা আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বলেন, আমি অন্ধ হলেও আমার মনটা অন্ধ নয়। কথা হয় আব্দুল গফুরের সাথে।
জানালেন, তারা আর্থিকভাবে সচ্ছল নন। ভিটের জমিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। তিনি জন্মান্ধ। পৃথিবীটা কেমন সেটা দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এ নিয়ে আক্ষেপ নেই। তারা পাঁচ ভাই, তিন বোন ছিলেন। এদের মধ্যে চার ভাই মারা গেছেন। ভাইদের মধ্যে বেঁচে আছেন শুধু তিনি। তিন বোনের একজন মারা গেছেন। জীবীত এক বোনও জন্মান্ধ। ১৬ বছর বয়স থেকে তিনি মহানবী(সা.)’র শিক্ষায় ভিক্ষা না করে কাজ করা শুরু করেন। নবীজীর শিক্ষা করোনা ভিক্ষা একথা বলে শোনালেন, মহানবী(সা.)’র সেই বিখ্যাত কম্বলের গল্পটি। ‘একদিন একজন আনসারী ব্যক্তি মহানবী (সা.)-এর কাছে ভিক্ষা চাইল। মহানবী (সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন তার বাড়িতে কিছু আছে কিনা। লোকটি বলল, একটি কম্বল আছে যা সে পরিধান করে এবং একটি পাত্র আছে যা দিয়ে সে পানি পান করে। মহানবী (সা.) তাকে সেই দুটি জিনিস নিয়ে আসতে বললেন এবং সেগুলো বিক্রি করে অর্জিত টাকা দিয়ে কুঠার কিনতে বললেন। সেই কুঠার দিয়ে কাঠ কেটে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করার জন্য তাকে উৎসাহিত করলেন।
বলেন, আমার তখন ১৬ বছর। ঢেঁকিতে ধান ভেঙে চার আনা পান। সেই চার আনা দিয়ে বিড়ি সিগারেট কিনে গ্রাম ঘুরে বিক্রি করেন। যা লাভ হলো তা দিয়ে পরদিন একটু বেশি কেনেন। এভাবে শুরু হয় তার রোজকার কাজ। পরে বিড়ি সিগারেট বিক্রি বাদ দিয়ে খাদ্য উপকরণ বিক্রি শুরু করেন। তার স্ত্রী পরম যতেœ নারকেলের নারু বানিয়ে দেয়। সাথে বাজার থেকে টেস্টি হজমি, চকলেট, চিপস, বাদাম ইত্যাদি কিনে সেগুলো প্যাকেটজাত করে বিক্রি করেন। পাঁচুরিয়া থেকে ট্রেনে ফরিদপুর, ভাঙ্গা, রাজবাড়ী, ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত বিক্রি করেন এসব। ট্রেনে উঠতে তার কোনো সমস্যা হয়না। কাউকে বললেই ট্রেনে তুলে দেয়। টাকায় হাত দিলেই বুঝতে পারেন কোনটা কত টাকার নোট। কোনোদিন দুইশ, আবার কোনোদিন পাঁচশ টাকা বিক্রি হয়। দিনে যা আয় করেন তা দিয়ে দুজনের সংসার চলে যায়। তার স্ত্রী তাকে সবসময় সহযোগিতা করেন।
আব্দুল গফুরের স্ত্রী নুরজাহান বেগম জানান, ৪০ বছর আগে আব্দুল গফুরের সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি সবকিছু জেনেই তাকে বিয়ে করেন। তার স্বামী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী- এনিয়ে কোনো দুঃখ নেই। সে একজন ভালো মানুষ। চোখে না দেখলেও তাকে খুব ভালোবাসেন।- এটাই তার বড় পাওয়া। তিনি তার স্বামীকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করেন। জানালেন, তার স্বামী সমাজসেবা অফিস থেকে প্রতিবন্ধী ভাতা পান।
ভান্ডারিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মতিন পেশায় একজন ভ্যানচালক। আব্দুল গফুরের নাম বলতেই তিনি চিনে ফেলেন। বলেন, তাকে চেনে না এই এলাকায় এমন কেউ নেই। আব্দুল গফুরের অনুভ‚তি ও স্মরণ শক্তি খুব প্রখর। যা তাদের মত মানুষকেও হার মানায়।
পাঁচুরিয়া ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুস সালাম জানান, ছোটকাল থেকেই আব্দুল গফুর টিনের একটি বাক্স নিয়ে ট্রেনে বাসে হকারি করে জীবীকা নির্বাহ করেন। তার আরও দুই ভাই-বোন জন্মান্ধ ছিলেন। আব্দুল গফুর প্রতিবন্ধী ভাতা পান। এছাড়া সরকারি কোনো সাহায্য সহযোগিতার সুযোগ এলে তিনি আব্দুল গফুরকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্তে¡ও তিনি ভিক্ষা না করে কাজ করছেন এটা একটি দৃষ্টান্ত।