Dhaka ১২:৪২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একের পর এক নৃশংস হত্যা, সিরিয়াল সাইকো কিলার মোরশেদকে যেভাবে ধরলো পুলিশ

খোরশেদ আলম, নওগাঁ
  • প্রকাশের সময় : ১১:১৪:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬
  • / 17

 

নওগাঁসহ আশপাশের জেলাগুলোতে একের পর এক নৃশংস ও রহস্যময় হামলার হোতা, কুখ্যাত ‘সিরিয়াল সাইকো কিলার’ গোলাম মোরশেদকে (২৭) গ্রেফতার করেছে জেলা পুলিশ। গত ১০ জুন ভোরে গাজীপুরের বাসন থানার সফিপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

আজ (১১ জুন, ২০২৬) সন্ধ্যা ৮টায় নওগাঁ পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

আতঙ্কের অন্য নাম ‘টিউবওয়েলের হাতল’ ও ‘বাঁশ’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় গভীর রাতে দেওয়াল টপকে মানুষের ঘরে ঢুকে মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যাচ্ছিল এক রহস্যময় হামলাকারী। তার মূল টার্গেট ছিল টিউবওয়েলের হাতল বা বাঁশ দিয়ে ঘুমন্ত মানুষের মাথায় আঘাত করা। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও কোনো কূল-কিনারা না পাওয়ায় চরম বিব্রতকর ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পড়ে জেলা পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই সিরিয়াল কিলারের উল্লেখযোগ্য কিছু নৃশংস হামলার বিবরণ:

১৭ জানুয়ারি, ২০২৬: ধামইরহাট উপজেলার জাহানপুর গ্রামে হাসান আলীর প্রাচীর টপকে কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবার ঘরে ঢোকে মোরশেদ। টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে সে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাবিবা মারা যান। একই রাতে মোরশেদ আরও দুটি বাড়িতে ঢুকে একইভাবে হামলা চালায়।

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: ধামইরহাটের জাহানপুর এলাকায় শাহিন ইসলামের স্ত্রী সুলতানা বেগমের মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে। ওই রাতেই আরও তিনটি বাড়িতে ঢুকে টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে চারজনকে জখম করে সে।

৭ মে, ২০২৬: বদলগাছী উপজেলার দুর্গাপুর, গোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকায় রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে তিনটি বাড়িতে দেওয়াল টপকে প্রবেশ করে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) ও বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০) নামের তিন নারীর মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত করে।

যেভাবে ধরা পড়ল ছদ্মবেশী ‘সাইকো’

পর পর এসব ঘটনায় পুরো জেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নিজেই ঘটনাস্থলগুলো পরিদর্শন করেন। তিনি ডিবি ও জেলা পুলিশের সব ইউনিটকে নিয়ে মাঠে নামেন এবং পাশের জেলাগুলোর পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তদন্ত শুরু করেন।

অবশেষে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি এবং সর্বোচ্চ গোয়েন্দা মেধা কাজে লাগিয়ে গত ৯ জুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি চৌকস দল অভিযানে নামে। ১০ জুন ভোর সাড়ে ৬টায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার বাসন থানার সফিপুর কোনাপাড়া থেকে কুখ্যাত এই অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত গোলাম মোরশেদ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট গ্রামের হইবর (হবিবর) রহমানের ছেলে।

১৬টি ঘটনার লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মোরশেদ নওগাঁ ও আশপাশের এলাকায় একই কায়দায় প্রায় ১৬টি হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে বলে নিজের মুখে স্বীকার করেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট শত্রুতা ছাড়াই গভীর রাতে হঠাৎ চড়াও হয়ে মানুষের মাথায় আঘাত করার পেছনে তার চরম বিকৃত মানসিকতা বা ‘সাইকোপ্যাথিক’ আচরণ প্রকাশ পেয়েছে, যা সিনেমার ভয়ংকর ভিলেনকেও হার মানায়।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান, জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মোঃ হাসিবুল্লাহ হাবিব, নওগাঁ সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, পত্নীতলা থানার ওসি মোঃ নিয়মুল হক, বদলগাছী থানার ওসি মোহাম্মদ রুহুল আমিনসহ জেলায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।

দীর্ঘদিনের এই রহস্যময় আতঙ্কের মূল হোতা গ্রেফতার হওয়ায় নওগাঁর সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পুলিশ সুপারের এই সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

একের পর এক নৃশংস হত্যা, সিরিয়াল সাইকো কিলার মোরশেদকে যেভাবে ধরলো পুলিশ

প্রকাশের সময় : ১১:১৪:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

 

নওগাঁসহ আশপাশের জেলাগুলোতে একের পর এক নৃশংস ও রহস্যময় হামলার হোতা, কুখ্যাত ‘সিরিয়াল সাইকো কিলার’ গোলাম মোরশেদকে (২৭) গ্রেফতার করেছে জেলা পুলিশ। গত ১০ জুন ভোরে গাজীপুরের বাসন থানার সফিপুর কোনাপাড়া এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

আজ (১১ জুন, ২০২৬) সন্ধ্যা ৮টায় নওগাঁ পুলিশ সুপারের সভাকক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

আতঙ্কের অন্য নাম ‘টিউবওয়েলের হাতল’ ও ‘বাঁশ’

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় গভীর রাতে দেওয়াল টপকে মানুষের ঘরে ঢুকে মাথায় আঘাত করে পালিয়ে যাচ্ছিল এক রহস্যময় হামলাকারী। তার মূল টার্গেট ছিল টিউবওয়েলের হাতল বা বাঁশ দিয়ে ঘুমন্ত মানুষের মাথায় আঘাত করা। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও কোনো কূল-কিনারা না পাওয়ায় চরম বিব্রতকর ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে পড়ে জেলা পুলিশ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এই সিরিয়াল কিলারের উল্লেখযোগ্য কিছু নৃশংস হামলার বিবরণ:

১৭ জানুয়ারি, ২০২৬: ধামইরহাট উপজেলার জাহানপুর গ্রামে হাসান আলীর প্রাচীর টপকে কলেজছাত্রী উম্মে হাবিবার ঘরে ঢোকে মোরশেদ। টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে মাথায় উপর্যুপরি আঘাত করে সে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাবিবা মারা যান। একই রাতে মোরশেদ আরও দুটি বাড়িতে ঢুকে একইভাবে হামলা চালায়।

৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: ধামইরহাটের জাহানপুর এলাকায় শাহিন ইসলামের স্ত্রী সুলতানা বেগমের মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে। ওই রাতেই আরও তিনটি বাড়িতে ঢুকে টিউবওয়েলের হাতল দিয়ে চারজনকে জখম করে সে।

৭ মে, ২০২৬: বদলগাছী উপজেলার দুর্গাপুর, গোয়ালভিটা ও নয়নশহর এলাকায় রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টার মধ্যে তিনটি বাড়িতে দেওয়াল টপকে প্রবেশ করে শাহানাজ (২২), নাসরিন (১৩) ও বাকপ্রতিবন্ধী বৃষ্টি (২০) নামের তিন নারীর মাথায় বাঁশ দিয়ে আঘাত করে গুরুতর আহত করে।

যেভাবে ধরা পড়ল ছদ্মবেশী ‘সাইকো’

পর পর এসব ঘটনায় পুরো জেলা জুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম নিজেই ঘটনাস্থলগুলো পরিদর্শন করেন। তিনি ডিবি ও জেলা পুলিশের সব ইউনিটকে নিয়ে মাঠে নামেন এবং পাশের জেলাগুলোর পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তদন্ত শুরু করেন।

অবশেষে আধুনিক তথ্য-প্রযুক্তি এবং সর্বোচ্চ গোয়েন্দা মেধা কাজে লাগিয়ে গত ৯ জুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়ব্রত পালের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি চৌকস দল অভিযানে নামে। ১০ জুন ভোর সাড়ে ৬টায় গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকার বাসন থানার সফিপুর কোনাপাড়া থেকে কুখ্যাত এই অপরাধীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত গোলাম মোরশেদ দিনাজপুর জেলার বিরামপুর উপজেলার পাতহাট গ্রামের হইবর (হবিবর) রহমানের ছেলে।

১৬টি ঘটনার লোমহর্ষক স্বীকারোক্তি

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত মোরশেদ নওগাঁ ও আশপাশের এলাকায় একই কায়দায় প্রায় ১৬টি হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে বলে নিজের মুখে স্বীকার করেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট শত্রুতা ছাড়াই গভীর রাতে হঠাৎ চড়াও হয়ে মানুষের মাথায় আঘাত করার পেছনে তার চরম বিকৃত মানসিকতা বা ‘সাইকোপ্যাথিক’ আচরণ প্রকাশ পেয়েছে, যা সিনেমার ভয়ংকর ভিলেনকেও হার মানায়।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান, জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মোঃ হাসিবুল্লাহ হাবিব, নওগাঁ সদর থানার ওসি মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, পত্নীতলা থানার ওসি মোঃ নিয়মুল হক, বদলগাছী থানার ওসি মোহাম্মদ রুহুল আমিনসহ জেলায় কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ।

দীর্ঘদিনের এই রহস্যময় আতঙ্কের মূল হোতা গ্রেফতার হওয়ায় নওগাঁর সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। পুলিশ সুপারের এই সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্ব সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে।