Dhaka ০৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
বন্ধ ও অলাভজনক কারখানায় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রোড শো করবে সরকার আবাসিকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের বাড়তি দাম প্রত্যাহার, বিইআরসির সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার ভাঙারিতে বিক্রি, ক্রেতা-বিক্রেতা গ্রেফতার ব্যাংকের নমিনী মানে কি টাকার মালিক? ভুল ধারণা ভাঙুন! ৬ নবজাতকের মৃত্যুর দায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালের : স্বাস্থ্যমন্ত্রী জুনের প্রথমার্ধে গরমের দাপট, শেষের দিকে বাড়তে পারে বৃষ্টিপাত ৬০ বছর পর ফিরল ‘মাংসখেকো’ স্ক্রুওয়ার্ম পরজীবী, উদ্বেগে খামারিরা মাকে হত্যা করে ঘরের মেঝেতে পুঁতে রাখা মরদেহ উদ্ধার গ্রীষ্মেই ফুটেছে বর্ষার কদম ফুল কালীগঞ্জে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মানববন্ধন

কোরবানির গোশত, দারিদ্র্য ও ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সি এনিমিয়া : একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট

ডা. মিজানুর রহমান (মিজান)
  • প্রকাশের সময় : ১২:৩০:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬
  • / 8

অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুইজনের একজন কোনো না কোনো মাত্রায় রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।

বর্তমানে শুধু সাধারণ জনগোষ্ঠী নয়, উচ্চবিত্ত সমাজের একটি অংশ-যারা অতিমাত্রায় ডায়েট কন্ট্রোল বা অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন-তাদের মাঝেও এই রোগের প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি অ্যানিমিয়ার প্রধান কারণ হলেও, ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সিজনিত মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার প্রাদুর্ভাবও নেহায়েত কম নয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভিটামিন বি১২ ঘাটতি বা “লো বর্ডারলাইন বি১২” মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত। এছাড়া বাংলাদেশের গ্রামীণ গর্ভবতী নারীদের উপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর শরীরে ভিটামিন বি১২ ঘাটতি পাওয়া গেছে।

প্রাণিজ আমিষের অপুষ্টিজনিত কারণ ছাড়াও, বয়স্কদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবন করেন, ডায়াবেটিসের কারণে মেটফরমিন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করেন, কিংবা Intrinsic Factor-এর ঘাটতিজনিত Pernicious Anaemia- তে ভোগেন, তাদের মধ্যেও মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া দেখা যায়।

ভিটামিন বি১২ এর প্রধান উৎস হলো প্রাণিজ খাদ্য-যেমন মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর “Poverty Map 2022 ” অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯.২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। গ্রামে এ হার ২০ শতাংশেরও বেশি এবং শহরে প্রায় ১৬.৫ শতাংশ।

তবে সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। Power and Participation Research Centre (PPRC)-এর ২০২৫ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২৭.৯ শতাংশ মানুষ Upper Poverty Line-এর নিচে অবস্থান করছে। অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি তথ্য মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২০–২৮ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দারিদ্র্েযর মধ্যে বাস করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অঞ্চলভেদেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। দীর্ঘদিন উত্তরবঙ্গে চাকরি করার সুবাদে দেখেছি, অনেক পরিবার এখনও দারিদ্র্য ও অপুষ্টির সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

যেখানে একটি পরিবারের প্রতিদিনের ডাল-ভাতের সংস্থান করাই কষ্টকর, সেখানে প্রতি মাসে অন্তত একবার মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রেই এক দুঃসাধ্য স্বপ্ন। ফলে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতিজনিত ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সি মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার প্রকোপ কতটা হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

এই রোগের সাধারণ উপসর্গগুলো হলো-

– অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি
– মাথা ঘোরা
– শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড়
– ক্ষুধামন্দা
– জিহ্বা লাল ও ব্যথাযুক্ত হওয়া
– হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
– হাঁটতে ভারসাম্যহীনতা
– মনোযোগ কমে যাওয়া ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস

শারীরিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
– রক্তস্বল্পতার কারণে ফ্যাকাশে ভাব
– মসৃণ ও উজ্জ্বল লাল জিহ্বা
– স্নায়বিক দুর্বলতা
– গুরুতর ক্ষেত্রে মানসিক বিভ্রান্তি বা ডিমেনশিয়াসদৃশ উপসর্গ

এক সময় অ্যানিমিয়া বলতে আমরা মূলত চোখের পাতা বা জিহ্বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়াকে বুঝতাম। কিন্তু বর্তমানে প্রায়ই Raw Beef Appearance Tongue বা কাঁচা কাটা মাংসের মতো উজ্জ্বল লাল জিহ্বা দেখা যায়, যা ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সিজনিত মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

৮-১০ সদস্যের একটি নিম্নবিত্ত পরিবার যেখানে প্রতিদিনের ডাল- ভাতের মত কার্বোহাইড্রেটজাত খাবার সংগ্রহ করতেই হিমশিম খায়, সেখানে নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ সংগ্রহের লড়াই অনেকটাই একতরফা অসম হয়ে পড়ে। ফলে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।

পবিত্র ঈদুল আযহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবিকতা, ত্যাগ, সাম্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য শিক্ষা। ইসলামের বিধান অনুযায়ী কুরবানীর গোশত সাধারণত তিন ভাগে বণ্টন করা হয়-একভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য, একভাগ নিজের পরিবারের জন্য এবং একভাগ দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষও বছরজুড়ে বিরলভাবে পাওয়া উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের সুযোগ পান। গরু ও খাসির মাংস ভিটামিন বি১২-এর অত্যন্ত সমৃদ্ধ উৎস, বিশেষ করে কলিজায় এর পরিমাণ অনেক বেশি।

ঈদুল আযহার সময় দরিদ্র মানুষের হাতে যে পরিমাণ মাংস পৌঁছে যায়, তা শুধু আনন্দই নয়-একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগত সহায়তাও প্রদান করে। যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, তবুও প্রাণিজ আমিষের দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে ভোগা মানুষের জন্য এটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যেই ইবাদতের পাশাপাশি মানবকল্যাণ, আর্থ-সামাজিক ভারসাম্য ও সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা নিহিত রয়েছে। যেমন রোজার ঈদে যাকাত ও ফিতরা, দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রামে ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করে, তেমনি কোরবানির ঈদে, কোরবানির গোশত ইসলামী রীতি অনুযায়ী বণ্টনের মাধ্যমে, প্রাণিজ আমিষের ঘাটতিজনিত নানা রোগ, বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ ডেফিশিয়েন্সি মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া প্রতিরোধেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা পালনে ভূমিকা রাখে ।

কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য ও আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা ইসলামের নির্দেশিত পথে ,এই আনন্দ সমাজের সকল মানুষের সাথে ভাগাভাগি করতে পারব।

লেখক : আরপি (মেডিসিন), ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর।

 

 

 

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

কোরবানির গোশত, দারিদ্র্য ও ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সি এনিমিয়া : একটি নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট

প্রকাশের সময় : ১২:৩০:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ জুন ২০২৬

অ্যানিমিয়া বা রক্তশূন্যতা বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সাধারণ স্বাস্থ্যসমস্যা। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতার হার প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি দুইজনের একজন কোনো না কোনো মাত্রায় রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।

বর্তমানে শুধু সাধারণ জনগোষ্ঠী নয়, উচ্চবিত্ত সমাজের একটি অংশ-যারা অতিমাত্রায় ডায়েট কন্ট্রোল বা অপরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেন-তাদের মাঝেও এই রোগের প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে আয়রনের ঘাটতি অ্যানিমিয়ার প্রধান কারণ হলেও, ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সিজনিত মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার প্রাদুর্ভাবও নেহায়েত কম নয়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভিটামিন বি১২ ঘাটতি বা “লো বর্ডারলাইন বি১২” মিলিয়ে প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত। এছাড়া বাংলাদেশের গ্রামীণ গর্ভবতী নারীদের উপর পরিচালিত কিছু গবেষণায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর শরীরে ভিটামিন বি১২ ঘাটতি পাওয়া গেছে।

প্রাণিজ আমিষের অপুষ্টিজনিত কারণ ছাড়াও, বয়স্কদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ সেবন করেন, ডায়াবেটিসের কারণে মেটফরমিন জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করেন, কিংবা Intrinsic Factor-এর ঘাটতিজনিত Pernicious Anaemia- তে ভোগেন, তাদের মধ্যেও মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া দেখা যায়।

ভিটামিন বি১২ এর প্রধান উৎস হলো প্রাণিজ খাদ্য-যেমন মাছ, মাংস, ডিম ও দুধ। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর “Poverty Map 2022 ” অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৯.২ শতাংশ মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। গ্রামে এ হার ২০ শতাংশেরও বেশি এবং শহরে প্রায় ১৬.৫ শতাংশ।

তবে সাম্প্রতিক উচ্চ মূল্যস্ফীতি, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। Power and Participation Research Centre (PPRC)-এর ২০২৫ সালের এক জরিপে বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ২৭.৯ শতাংশ মানুষ Upper Poverty Line-এর নিচে অবস্থান করছে। অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি তথ্য মিলিয়ে বলা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ২০–২৮ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দারিদ্র্েযর মধ্যে বাস করছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ নিম্নবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অঞ্চলভেদেও এই বৈষম্য স্পষ্ট। দীর্ঘদিন উত্তরবঙ্গে চাকরি করার সুবাদে দেখেছি, অনেক পরিবার এখনও দারিদ্র্য ও অপুষ্টির সাথে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

যেখানে একটি পরিবারের প্রতিদিনের ডাল-ভাতের সংস্থান করাই কষ্টকর, সেখানে প্রতি মাসে অন্তত একবার মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ সংগ্রহ করা অনেক ক্ষেত্রেই এক দুঃসাধ্য স্বপ্ন। ফলে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতিজনিত ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সি মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার প্রকোপ কতটা হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

এই রোগের সাধারণ উপসর্গগুলো হলো-

– অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি
– মাথা ঘোরা
– শ্বাসকষ্ট বা বুক ধড়ফড়
– ক্ষুধামন্দা
– জিহ্বা লাল ও ব্যথাযুক্ত হওয়া
– হাত-পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশভাব
– হাঁটতে ভারসাম্যহীনতা
– মনোযোগ কমে যাওয়া ও স্মৃতিশক্তি হ্রাস

শারীরিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
– রক্তস্বল্পতার কারণে ফ্যাকাশে ভাব
– মসৃণ ও উজ্জ্বল লাল জিহ্বা
– স্নায়বিক দুর্বলতা
– গুরুতর ক্ষেত্রে মানসিক বিভ্রান্তি বা ডিমেনশিয়াসদৃশ উপসর্গ

এক সময় অ্যানিমিয়া বলতে আমরা মূলত চোখের পাতা বা জিহ্বা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়াকে বুঝতাম। কিন্তু বর্তমানে প্রায়ই Raw Beef Appearance Tongue বা কাঁচা কাটা মাংসের মতো উজ্জ্বল লাল জিহ্বা দেখা যায়, যা ভিটামিন বি১২ ডেফিসিয়েন্সিজনিত মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।

৮-১০ সদস্যের একটি নিম্নবিত্ত পরিবার যেখানে প্রতিদিনের ডাল- ভাতের মত কার্বোহাইড্রেটজাত খাবার সংগ্রহ করতেই হিমশিম খায়, সেখানে নিয়মিত মাছ, মাংস, ডিম বা দুধ সংগ্রহের লড়াই অনেকটাই একতরফা অসম হয়ে পড়ে। ফলে প্রাণিজ আমিষের ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করছে।

পবিত্র ঈদুল আযহা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবিকতা, ত্যাগ, সাম্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য শিক্ষা। ইসলামের বিধান অনুযায়ী কুরবানীর গোশত সাধারণত তিন ভাগে বণ্টন করা হয়-একভাগ আত্মীয়স্বজনের জন্য, একভাগ নিজের পরিবারের জন্য এবং একভাগ দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষও বছরজুড়ে বিরলভাবে পাওয়া উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের সুযোগ পান। গরু ও খাসির মাংস ভিটামিন বি১২-এর অত্যন্ত সমৃদ্ধ উৎস, বিশেষ করে কলিজায় এর পরিমাণ অনেক বেশি।

ঈদুল আযহার সময় দরিদ্র মানুষের হাতে যে পরিমাণ মাংস পৌঁছে যায়, তা শুধু আনন্দই নয়-একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগত সহায়তাও প্রদান করে। যদিও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়, তবুও প্রাণিজ আমিষের দীর্ঘদিনের ঘাটতিতে ভোগা মানুষের জন্য এটি তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবের মধ্যেই ইবাদতের পাশাপাশি মানবকল্যাণ, আর্থ-সামাজিক ভারসাম্য ও সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা নিহিত রয়েছে। যেমন রোজার ঈদে যাকাত ও ফিতরা, দরিদ্র মানুষের জীবনসংগ্রামে ভাগ্য পরিবর্তনে সহায়তা করে, তেমনি কোরবানির ঈদে, কোরবানির গোশত ইসলামী রীতি অনুযায়ী বণ্টনের মাধ্যমে, প্রাণিজ আমিষের ঘাটতিজনিত নানা রোগ, বিশেষ করে ভিটামিন বি১২ ডেফিশিয়েন্সি মেগালোব্লাস্টিক অ্যানিমিয়া প্রতিরোধেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভূমিকা পালনে ভূমিকা রাখে ।

কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য ও আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন আমরা ইসলামের নির্দেশিত পথে ,এই আনন্দ সমাজের সকল মানুষের সাথে ভাগাভাগি করতে পারব।

লেখক : আরপি (মেডিসিন), ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর।