Dhaka ০৩:১৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

হাইকোর্টে বাড়ছে রিট নিষ্পত্তি

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ১১:৫৯:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 11

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিটের প্রবণতা বন্ধ করা গেলে মামলার চাপ আরও কমে আসবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আদালতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে রিট মামলার সংখ্যা আরও কমে আসবে। তাঁর মতে, আদালতে শৃঙ্খলা থাকলে মানুষ প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার পায়।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি মামলা।

এরপর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৫৯০টি রিট মামলা। অর্থাৎ ওই সময়ে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রিট নিষ্পত্তি হয়েছে। জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।

হাইকোর্টে লক্ষাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থে মামলার নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট করা হয়। এসব মামলার উদ্দেশ্য অনেক সময় আত্মপ্রচার। রিট মামলা করার পরপরই অনেকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।

তিনি বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। আইনের বিভিন্ন বিষয়ে আপিল বিভাগ ইতোমধ্যে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন এবং কোনগুলো পারবেন না।

অ্যাটর্নি জেনারেল উদাহরণ দিয়ে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করা যায় না—এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায় রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের কোনো কোনো বেঞ্চ বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ করে আদেশ দিচ্ছেন। এতে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের বিষয় শৃঙ্খলার মধ্যে আনা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।

ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতা নিয়ে তিনি বলেন, জমি দখল, জমির সীমানা কিংবা বিল-বাঁওড় নিয়ে বিরোধের মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও অনেকে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করছেন। অথচ এসব বিরোধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিম্ন আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন। প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি হাইকোর্টে আসার কারণে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে পাঁচ ধরনের রিট করার সুযোগ রয়েছে। এগুলো হলো—হেবিয়াস করপাস, ম্যান্ডামাস, সার্টিওরারি, প্রহিবিশন ও কো-ওয়ারেন্টো।

কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটক রাখা হলে হেবিয়াস করপাস রিট করা যায়। এ ক্ষেত্রে বেআইনিভাবে আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারেন হাইকোর্ট।

কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী কোনো কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা না করলে ম্যান্ডামাস রিটের মাধ্যমে সেই কাজ করার নির্দেশ দেওয়া যায়।

কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে আদেশ দিলে সার্টিওরারি রিটের মাধ্যমে সেই আদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া যায়। আর কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তার আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা শুনতে শুরু করলে প্রহিবিশন রিটের মাধ্যমে সেই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া যায়।

অন্যদিকে, কেউ আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকারি পদে থাকলে কো-ওয়ারেন্টো রিটের মাধ্যমে তার ওই পদে থাকার বৈধতা যাচাই করা হয়।

মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিট মামলার আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ওই ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করতে পারেন।

গত কয়েক দশকে জনস্বার্থে করা বিভিন্ন রিট মামলায় হাইকোর্টের আদেশ ও রায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিকার এসেছে। এসব মামলার মাধ্যমেই দেশের নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদী দখলদার উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও পাহাড় কাটা রোধেও বিভিন্ন সময়ে রিটের মাধ্যমে আদালতের হস্তক্ষেপ এসেছে।

এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য মানবিক ক্ষতিপূরণ এবং নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় রিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল ভোগ করেছেন দেশের বহু মানুষ।

সূত্র: বাসস

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

হাইকোর্টে বাড়ছে রিট নিষ্পত্তি

প্রকাশের সময় : ১১:৫৯:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধ নিয়ে রিটের প্রবণতা বন্ধ করা গেলে মামলার চাপ আরও কমে আসবে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আদালতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে রিট মামলার সংখ্যা আরও কমে আসবে। তাঁর মতে, আদালতে শৃঙ্খলা থাকলে মানুষ প্রকৃত অর্থে ন্যায়বিচার পায়।

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি মামলা।

এরপর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত তিন মাসে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে নিষ্পত্তি হয় ৯ হাজার ৫৯০টি রিট মামলা। অর্থাৎ ওই সময়ে নতুন মামলা দায়েরের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রিট নিষ্পত্তি হয়েছে। জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে।

হাইকোর্টে লক্ষাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থে মামলার নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট করা হয়। এসব মামলার উদ্দেশ্য অনেক সময় আত্মপ্রচার। রিট মামলা করার পরপরই অনেকে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত।

তিনি বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। আইনের বিভিন্ন বিষয়ে আপিল বিভাগ ইতোমধ্যে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন এবং কোনগুলো পারবেন না।

অ্যাটর্নি জেনারেল উদাহরণ দিয়ে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট আবেদন করা যায় না—এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায় রয়েছে। এরপরও বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টের কোনো কোনো বেঞ্চ বেসরকারি ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ করে আদেশ দিচ্ছেন। এতে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে। এ ধরনের বিষয় শৃঙ্খলার মধ্যে আনা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমবে।

ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার প্রবণতা নিয়ে তিনি বলেন, জমি দখল, জমির সীমানা কিংবা বিল-বাঁওড় নিয়ে বিরোধের মতো ব্যক্তিগত বিষয়েও অনেকে সরাসরি হাইকোর্টে রিট করছেন। অথচ এসব বিরোধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিম্ন আদালতে গিয়ে প্রতিকার চাইতে পারেন। প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি হাইকোর্টে আসার কারণে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে পাঁচ ধরনের রিট করার সুযোগ রয়েছে। এগুলো হলো—হেবিয়াস করপাস, ম্যান্ডামাস, সার্টিওরারি, প্রহিবিশন ও কো-ওয়ারেন্টো।

কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটক রাখা হলে হেবিয়াস করপাস রিট করা যায়। এ ক্ষেত্রে বেআইনিভাবে আটক বা গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দিতে পারেন হাইকোর্ট।

কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের আইন অনুযায়ী কোনো কাজ করার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও তা না করলে ম্যান্ডামাস রিটের মাধ্যমে সেই কাজ করার নির্দেশ দেওয়া যায়।

কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে আদেশ দিলে সার্টিওরারি রিটের মাধ্যমে সেই আদেশ বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া যায়। আর কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তার আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোনো মামলা শুনতে শুরু করলে প্রহিবিশন রিটের মাধ্যমে সেই কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়া যায়।

অন্যদিকে, কেউ আইনগত যোগ্যতা ছাড়া কোনো সরকারি পদে থাকলে কো-ওয়ারেন্টো রিটের মাধ্যমে তার ওই পদে থাকার বৈধতা যাচাই করা হয়।

মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিট মামলার আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়। ওই ঐতিহাসিক রায়ে বলা হয়, জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করতে পারেন।

গত কয়েক দশকে জনস্বার্থে করা বিভিন্ন রিট মামলায় হাইকোর্টের আদেশ ও রায়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রতিকার এসেছে। এসব মামলার মাধ্যমেই দেশের নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নদী দখলদার উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ ও পাহাড় কাটা রোধেও বিভিন্ন সময়ে রিটের মাধ্যমে আদালতের হস্তক্ষেপ এসেছে।

এ ছাড়া জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য মানবিক ক্ষতিপূরণ এবং নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় রিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির করা রিটের রায় বা আদেশের সুফল ভোগ করেছেন দেশের বহু মানুষ।

সূত্র: বাসস