Dhaka ০৩:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

এআইয়ের ভুল তথ্যে চীনের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধে জড়াচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ১২:১৮:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 7

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চীনা একটি জাহাজে অভিযান চালাতে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। শেষ মুহূর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, জাহাজটির পণ্য নিয়ে তৈরি করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য সঠিক নয়। ফলে অভিযান বাতিল করা হয়।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের বসন্তে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় এ ঘটনা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদান পরিবহন করা হচ্ছে—এমন তথ্য একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

ঘটনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, ওই তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজটি আটকের প্রস্তুতি নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। সশস্ত্র সেনাসদস্যদের জাহাজে ওঠার প্রস্তুতি ছিল এবং সামরিক বিমানও আকাশে অবস্থান করছিল।

তবে অভিযান শুরুর ঠিক আগে কয়েকজন অভিজ্ঞ বিশ্লেষক মূল গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করেন। তখন তারা দেখতে পান, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে মূল তথ্যের মিল নেই। পরে জানা যায়, প্রতিবেদনটি তৈরিতে ব্যবহৃত এআই চ্যাটবট জাহাজে থাকা পণ্যকে ভুলভাবে শনাক্ত করেছিল।

ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ ছিল। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চীনা জাহাজে মার্কিন অভিযান চালানো হলে তা দুই দেশের মধ্যে দ্রুত উত্তেজনা বাড়িয়ে সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত।

জানা গেছে, মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের এক বিশ্লেষক জাহাজটির পণ্যবাহী তালিকা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি উন্মুক্ত উৎসের তথ্য ও সরকারি ব্যবস্থায় থাকা গোপন সংকেত গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে একটি এআই চ্যাটবটের সহায়তা নেন।

চ্যাটবটটি তথ্য বিশ্লেষণ করে জাহাজের পণ্য সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পরে ওই বিশ্লেষক এআইয়ের দেওয়া ফলাফলকে প্রচলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাঠামোয় সাজিয়ে তা সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতরণ করেন।

বিশ্লেষকটি বাণিজ্যিক কোনো এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছিলেন, নাকি মার্কিন সরকারের নিজস্ব এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বর্তমানে একাধিক ধরনের এআই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

এআইয়ের তৈরি ভুল বা ভিত্তিহীন তথ্যকে সাধারণভাবে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়। চীনা জাহাজের ঘটনায়ও এ ধরনের ভুল তথ্য তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্বাচন, সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং রসদ সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে না পড়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের গতি বাড়াতে একটি কৌশল প্রকাশ করেন। এতে এআই নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ বাড়ানো, প্রশাসনিক বাধা কমানো এবং সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড ও যাচাই কাঠামো না থাকার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সামরিক শাখা ও গোয়েন্দা ইউনিট নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ফলে এআইয়ের তৈরি বিশ্লেষণ সামরিক সিদ্ধান্তে ব্যবহারের আগে কীভাবে যাচাই করা হবে, সে বিষয়ে সর্বত্র একই ধরনের নিয়ম নেই।

বিশেষ করে সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করা হলে তার পরিণতি প্রাণহানি কিংবা বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে গড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এআই দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত তৈরিতে সহায়তা করলেও এর ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে ব্যবহার করলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়তে পারে। চীনা জাহাজের ঘটনাটি এ ধরনের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত ওই জাহাজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালানো হয়নি এবং ঘটনাটি বড় কোনো সংঘাতে রূপ নেয়নি। তবে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পর ভুলটি ধরা পড়ায় সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি মানবিক যাচাই ও একাধিক স্তরে তথ্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সূত্র: সিএনএন

 

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

এআইয়ের ভুল তথ্যে চীনের সঙ্গে প্রায় যুদ্ধে জড়াচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশের সময় : ১২:১৮:৪১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চীনা একটি জাহাজে অভিযান চালাতে যাচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্র। শেষ মুহূর্তে মার্কিন কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, জাহাজটির পণ্য নিয়ে তৈরি করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্য সঠিক নয়। ফলে অভিযান বাতিল করা হয়।

সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের বসন্তে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সময় এ ঘটনা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত একটি চীনা জাহাজে পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাদান পরিবহন করা হচ্ছে—এমন তথ্য একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে আসে।

ঘটনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, ওই তথ্যের ভিত্তিতে জাহাজটি আটকের প্রস্তুতি নেয় মার্কিন সামরিক বাহিনী। সশস্ত্র সেনাসদস্যদের জাহাজে ওঠার প্রস্তুতি ছিল এবং সামরিক বিমানও আকাশে অবস্থান করছিল।

তবে অভিযান শুরুর ঠিক আগে কয়েকজন অভিজ্ঞ বিশ্লেষক মূল গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করেন। তখন তারা দেখতে পান, প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে মূল তথ্যের মিল নেই। পরে জানা যায়, প্রতিবেদনটি তৈরিতে ব্যবহৃত এআই চ্যাটবট জাহাজে থাকা পণ্যকে ভুলভাবে শনাক্ত করেছিল।

ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানায়, গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি ‘পুরোপুরি মিথ্যা’ ছিল। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে চীনা জাহাজে মার্কিন অভিযান চালানো হলে তা দুই দেশের মধ্যে দ্রুত উত্তেজনা বাড়িয়ে সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারত।

জানা গেছে, মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের এক বিশ্লেষক জাহাজটির পণ্যবাহী তালিকা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে কাজ করছিলেন। তিনি উন্মুক্ত উৎসের তথ্য ও সরকারি ব্যবস্থায় থাকা গোপন সংকেত গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে এসব তথ্য মিলিয়ে একটি এআই চ্যাটবটের সহায়তা নেন।

চ্যাটবটটি তথ্য বিশ্লেষণ করে জাহাজের পণ্য সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পরে ওই বিশ্লেষক এআইয়ের দেওয়া ফলাফলকে প্রচলিত গোয়েন্দা প্রতিবেদনের কাঠামোয় সাজিয়ে তা সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে বিতরণ করেন।

বিশ্লেষকটি বাণিজ্যিক কোনো এআই চ্যাটবট ব্যবহার করেছিলেন, নাকি মার্কিন সরকারের নিজস্ব এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করেছিলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে বর্তমানে একাধিক ধরনের এআই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

এআইয়ের তৈরি ভুল বা ভিত্তিহীন তথ্যকে সাধারণভাবে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলা হয়। চীনা জাহাজের ঘটনায়ও এ ধরনের ভুল তথ্য তৈরি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী বর্তমানে গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্বাচন, সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং রসদ সরবরাহসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার বাড়াচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়ানো এবং সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পিছিয়ে না পড়ার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের গতি বাড়াতে একটি কৌশল প্রকাশ করেন। এতে এআই নিয়ে পরীক্ষামূলক কাজ বাড়ানো, প্রশাসনিক বাধা কমানো এবং সামরিক ও বেসামরিক কর্মীদের মধ্যে এআই ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তবে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিন্ন নিরাপত্তা মানদণ্ড ও যাচাই কাঠামো না থাকার বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সামরিক শাখা ও গোয়েন্দা ইউনিট নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা এআই ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। ফলে এআইয়ের তৈরি বিশ্লেষণ সামরিক সিদ্ধান্তে ব্যবহারের আগে কীভাবে যাচাই করা হবে, সে বিষয়ে সর্বত্র একই ধরনের নিয়ম নেই।

বিশেষ করে সামরিক লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বেশি। কারণ ভুল তথ্যের ভিত্তিতে কোনো লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করা হলে তার পরিণতি প্রাণহানি কিংবা বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে গড়াতে পারে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এআই দ্রুত তথ্য বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত তৈরিতে সহায়তা করলেও এর ফলাফল যথাযথভাবে যাচাই না করে ব্যবহার করলে ভুল সিদ্ধান্তের ঝুঁকি বাড়তে পারে। চীনা জাহাজের ঘটনাটি এ ধরনের ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে।

শেষ পর্যন্ত ওই জাহাজের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান চালানো হয়নি এবং ঘটনাটি বড় কোনো সংঘাতে রূপ নেয়নি। তবে অভিযান শুরুর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পর ভুলটি ধরা পড়ায় সামরিক ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পাশাপাশি মানবিক যাচাই ও একাধিক স্তরে তথ্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সূত্র: সিএনএন