Dhaka ০৪:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
বঙ্গভবন ছাড়লেন মো. সাহাবুদ্দিন নওগাঁয় মাদকবিরোধী অভিযানে ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটসহ দুইজনের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ১ বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪ টুথপেস্টের ২৬টিতেই মিলল বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে সব সুবিধা পাবেন মো. সাহাবুদ্দিন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজকের ই-পেপার (২৬ জুলাই ২০২৬) কালুখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তায় দায়িত্বে আনসার বাহিনী পোরশায় সারাইগাছি পুলিশ বক্স উদ্বোধন, সড়কে ছিনতাই-ডাকাতি নির্মূলে কঠোর বার্তা বনিবনা না হলে কবে আবার তিনিও জামায়াত থেকে বের হয়ে যান: রাশেদ খাঁন হাইতির এতিমখানা থেকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে বিস্ময়বালক ‘কিকি’ রামোস জানা গেল এসএসসির ফল প্রকাশের সাম্ভব্য তারিখ

ডিজিটাল ভূমি জরিপ : রেকর্ড সংশোধনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৬:৫৬:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫
  • / 621

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS) এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে BDS (জরিপ) — যা দেশের জমির মালিকানা, রেকর্ড এবং সীমানা নির্ধারণের ইতিহাসে ডিজিটাল যুগের এক নতুন উপহার। পূর্ববর্তী সিএস, এসএ এবং আরএস জরিপে জমির মালিকানা নিয়ে অগণিত ভুল, নামের বানান বিভ্রান্তি, জমির পরিমাণে অসঙ্গতি দেখা যেত, ফলে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চালু করেছে ডিজিটাল জরিপ পদ্ধতি—বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS), যা আগের সব বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি দিয়ে জমির রেকর্ড ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী ও নির্ভুল ভিত্তি গড়ে তুলবে। অনেকে এই জরিপকে “শেষ সুযোগ” বলে অভিহিত করছেন। কারণ এবার রেকর্ডে একবার সঠিকভাবে নাম উঠলে, তা ডিজিটাল ডাটাবেজে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে; ভবিষ্যতে কেউ সহজে পরিবর্তন করতে পারবে না। ফলে জমির প্রকৃত মালিকদের এখনই সচেতন ও প্রস্তুত থাকা অপরিহার্য।

BDS-এর গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা :
বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার মোট মামলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি-সংক্রান্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ রেকর্ডে ভুল নাম, সীমানা অসঙ্গতি বা একাধিক মালিকানা দাবির সংঘাত। BDS হচ্ছে দেশের প্রথম প্লট-টু-প্লট ভিত্তিক ডিজিটাল জরিপ। এখানে প্রতিটি প্লটের খতিয়ান, দাগ নম্বর, মালিকানা ও সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে স্যাটেলাইট ইমেজিং, জিপিএস ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে—যাতে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তি না থাকে।
এই জরিপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে—
* জমির সঠিক মালিকানা নির্ধারণ নিশ্চিত হবে।
* দখল ও কাগজপত্রের সামঞ্জস্য যাচাই করা যাবে, ফলে মালিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
* জমি-সংক্রান্ত মামলা ও জটিলতা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
* ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্ভরযোগ্য, প্রযুক্তিনির্ভর রেকর্ড পাবে।
* দেশের ভূমি প্রশাসন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক হয়ে উঠবে।

ডিজিটাল জরিপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য :

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে – এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী।
* অনলাইনে আপত্তি দাখিল ও শুনানির সুযোগ থাকায় প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও স্বচ্ছ।
* জমির মালিকরা ভিডিও শুনানিতে অংশ নিয়ে সরাসরি তাদের মতামত দিতে পারবেন।
* নিজের জমির রেকর্ড ও আপত্তির অগ্রগতি রিয়েল টাইমে অনলাইনে ট্র্যাক করা যাবে।
* ফলাফল প্রকাশের পর রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হবে।
* ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি এক অমূল্য দলিল হয়ে থাকবে।


জমির মালিকদের জন্য ধাপে ধাপে করণীয় :
১️. সীমানা চিহ্নিতকরণ ও নকশা যাচাই:
✅ নকশা প্রস্তুত কালে মাঠে উপস্থিত থাকবেন এবং নিজের জমির সীমানা বাঁশ বা পিলার দিয়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করবেন।
✅ নকশা প্রস্তুত হওয়ার পর জরিপ দল মাঠে যাবে, আপনি অবশ্যই উপস্থিত থেকে আপনার জমির নকশা সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
২️. রেকর্ড যাচাই ও তথ্য প্রদান:
✅ ভোটার আইডি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (রেজিস্ট্রি দলিল, খতিয়ান, মিউটেশন, খাজনার রশিদ ইত্যাদি) সহ মাঠে উপস্থিত থাকবেন।
✅ নিজের নাম, ঠিকানা, অংশ, যোগফল ইত্যাদি তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড করাবেন। জমির আকার বা সীমা নিয়ে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য দিলে পরে আপনি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
✅ বাস্তব দখল নিশ্চিত করুন—চাষাবাদ, ঘের, সীমানা প্রাচীর বা গাছপালার উপস্থিতি দখলের বাস্তবতা প্রমাণ করে।
✅ প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমানা মিলিয়ে নিন এবং সমঝোতা করুন।
৩️. পর্চা গ্রহণ, সংশোধন ও আপত্তি দায়ের:
✅ প্রতিটি খতিয়ানের একটি পর্চা পাবেন — ভালোভাবে যাচাই করবেন। বানান, অংশ বা ঠিকানায় ভুল থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তসদিক (দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) মাধ্যমে সংশোধন করাবেন।
✅ তসদিক (দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) পর ৩০ দিন পর্যন্ত খসড়া প্রকাশনা চলবে। কোনো ভুল বা আপত্তি থাকলে নির্ধারিত ফরমে কোর্ট ফি সহকারে ৩০ দিনের মধ্যেই আপত্তি (৩০ বিধি) দায়ের করবেন।
❌ ৩০ দিন পার হলে (তামাদী হলে) আর আপত্তি দায়েরের সুযোগ থাকবে না।
৪️. আপীল ও আদালত:
✅ আপত্তি (৩০ বিধি) কেসের রায়ে অসন্তুষ্ট হলে ৩০ দিনের মধ্যে আপীল (৩১ বিধি) কেস দায়ের করতে পারবেন।
❌ সময় পার হয়ে গেলে বিশেষ আপীল করার সুযোগ থাকবে না।
❌ আপত্তি (৩০ বিধি) কেস না থাকলে আপীল (৩১ বিধি) কেস দায়ের করা যাবে না।
✅ একমাত্র ট্রাইব্যুনাল বা দেওয়ানী আদালতে কেস দায়ের করতে হবে।
৫️. সর্বদা যোগাযোগ রাখুন:
✅ সব সময় জরিপ দলের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। এতে আপনার জমির তথ্য সঠিক ও নিরাপদ থাকবে।
✅ সচেতন ভূমি মালিকই নিরাপদ ভূমির নিশ্চয়তা।

বর্তমান অবস্থা, সরকারি অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ :
দেশের ছয়টি এলাকায় BDS জরিপ শেষ পর্যায়ে রয়েছে—
* চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন
* নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন
* রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন
* মানিকগঞ্জ
* ধামরাই
* কুষ্টিয়া
এইসব এলাকায় অনেক জমির মালিক এখনও কাগজপত্র যাচাই বা আপত্তি দাখিল করেননি, যা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে যেখানে জরিপ এখনো শুরু হয়নি, সেখানে এখনই প্রয়োজন—
* সব দলিল ও রেকর্ড হালনাগাদ করা এবং এনআইডি ও খতিয়ানে বানান ও তথ্যের ভুল সংশোধন করা।
* নিজে উপস্থিত থেকে জমির দখল নিশ্চিত করা বা বিশ্বস্ত প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়া।

কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত :
ভূমিমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের জরিপ সম্পন্ন হতে দশকের পর দশক লেগে যেত। কিন্তু বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS) দ্রুত শেষ হবে, এবং একবার সম্পন্ন হলে জমির যাবতীয় তথ্য—খতিয়ান, দাগ, টিন নম্বরসহ—এক ক্লিকেই জানা যাবে।
ড. মো. আ. মান্নান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বিশেষজ্ঞ (ল্যান্ড সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট এলার্মস), বলেন—
“*BDS (জরিপ)*কে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যতের ঝুঁকি ডেকে আনা। জমির নবম কলামে যদি কারো নাম ভুলে বাদ পড়ে যায়, পরে তা সংশোধন করা কঠিন হবে। তাই এখনই কাগজপত্র ঠিক রাখা ও দখল নিশ্চিত করা জরুরি।”

বাস্তবতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ:
যদিও দেশে ভূমি অফিসগুলো এখন ডিজিটাল সেবার আওতায়, তবুও কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে জনগণ পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না। এ জন্য শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়া—
* কার কাছে কোন কাগজপত্র জমা হয়েছে, তার একটি ডিজিটাল ট্র্যাক রাখতে হবে।
* জমির রেকর্ড ব্যবস্থায় অফিসিয়াল অডিট ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
* জনবান্ধব ভূমি সেবা নিশ্চিতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসনের ইতিহাসে বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS) একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়; বরং জমির মালিকানা, সামাজিক স্থিতি এবং আইনি নিরাপত্তার এক শক্তিশালী ভিত্তি। যদি জনগণ সচেতন হন, কাগজপত্র ঠিক রাখেন ও সময়মতো আপত্তি জানান, তবে বাংলাদেশের জমি ব্যবস্থাপনায় আর বিভ্রান্তি থাকবে না—থাকবে কেবল স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার।

তাই—
“BDS (জরিপ)-এ সতর্ক থাকুন, সুরক্ষিত রাখুন আপনার জমির ভবিষ্যৎ।”

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।
তথ্যসূত্র: ডাইরেক্টর, ল্যান্ড রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, ভূমি ভবন, ঢাকা
উপসহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার , জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, দিনাজপুর

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ডিজিটাল ভূমি জরিপ : রেকর্ড সংশোধনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ

প্রকাশের সময় : ০৬:৫৬:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS) এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে শুরু হয়েছে BDS (জরিপ) — যা দেশের জমির মালিকানা, রেকর্ড এবং সীমানা নির্ধারণের ইতিহাসে ডিজিটাল যুগের এক নতুন উপহার। পূর্ববর্তী সিএস, এসএ এবং আরএস জরিপে জমির মালিকানা নিয়ে অগণিত ভুল, নামের বানান বিভ্রান্তি, জমির পরিমাণে অসঙ্গতি দেখা যেত, ফলে পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে চালু করেছে ডিজিটাল জরিপ পদ্ধতি—বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS), যা আগের সব বিভ্রান্তি থেকে মুক্তি দিয়ে জমির রেকর্ড ব্যবস্থায় একটি স্থায়ী ও নির্ভুল ভিত্তি গড়ে তুলবে। অনেকে এই জরিপকে “শেষ সুযোগ” বলে অভিহিত করছেন। কারণ এবার রেকর্ডে একবার সঠিকভাবে নাম উঠলে, তা ডিজিটাল ডাটাবেজে স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকবে; ভবিষ্যতে কেউ সহজে পরিবর্তন করতে পারবে না। ফলে জমির প্রকৃত মালিকদের এখনই সচেতন ও প্রস্তুত থাকা অপরিহার্য।

BDS-এর গুরুত্ব, প্রয়োজনীয়তা :
বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থার মোট মামলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ জমি-সংক্রান্ত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ রেকর্ডে ভুল নাম, সীমানা অসঙ্গতি বা একাধিক মালিকানা দাবির সংঘাত। BDS হচ্ছে দেশের প্রথম প্লট-টু-প্লট ভিত্তিক ডিজিটাল জরিপ। এখানে প্রতিটি প্লটের খতিয়ান, দাগ নম্বর, মালিকানা ও সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে স্যাটেলাইট ইমেজিং, জিপিএস ও ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে—যাতে কোনো ভুল বা বিভ্রান্তি না থাকে।
এই জরিপ সফলভাবে সম্পন্ন হলে—
* জমির সঠিক মালিকানা নির্ধারণ নিশ্চিত হবে।
* দখল ও কাগজপত্রের সামঞ্জস্য যাচাই করা যাবে, ফলে মালিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
* জমি-সংক্রান্ত মামলা ও জটিলতা নাটকীয়ভাবে কমে যাবে।
* ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্ভরযোগ্য, প্রযুক্তিনির্ভর রেকর্ড পাবে।
* দেশের ভূমি প্রশাসন স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও আধুনিক হয়ে উঠবে।

ডিজিটাল জরিপের বিশেষ বৈশিষ্ট্য :

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে – এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সবাই আশাবাদী।
* অনলাইনে আপত্তি দাখিল ও শুনানির সুযোগ থাকায় প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও স্বচ্ছ।
* জমির মালিকরা ভিডিও শুনানিতে অংশ নিয়ে সরাসরি তাদের মতামত দিতে পারবেন।
* নিজের জমির রেকর্ড ও আপত্তির অগ্রগতি রিয়েল টাইমে অনলাইনে ট্র্যাক করা যাবে।
* ফলাফল প্রকাশের পর রেকর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভূমি মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজে যুক্ত হবে।
* ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এটি এক অমূল্য দলিল হয়ে থাকবে।


জমির মালিকদের জন্য ধাপে ধাপে করণীয় :
১️. সীমানা চিহ্নিতকরণ ও নকশা যাচাই:
✅ নকশা প্রস্তুত কালে মাঠে উপস্থিত থাকবেন এবং নিজের জমির সীমানা বাঁশ বা পিলার দিয়ে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করবেন।
✅ নকশা প্রস্তুত হওয়ার পর জরিপ দল মাঠে যাবে, আপনি অবশ্যই উপস্থিত থেকে আপনার জমির নকশা সঠিকভাবে মিলিয়ে দেখবেন।
২️. রেকর্ড যাচাই ও তথ্য প্রদান:
✅ ভোটার আইডি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (রেজিস্ট্রি দলিল, খতিয়ান, মিউটেশন, খাজনার রশিদ ইত্যাদি) সহ মাঠে উপস্থিত থাকবেন।
✅ নিজের নাম, ঠিকানা, অংশ, যোগফল ইত্যাদি তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড করাবেন। জমির আকার বা সীমা নিয়ে ইচ্ছাকৃত ভুল তথ্য দিলে পরে আপনি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
✅ বাস্তব দখল নিশ্চিত করুন—চাষাবাদ, ঘের, সীমানা প্রাচীর বা গাছপালার উপস্থিতি দখলের বাস্তবতা প্রমাণ করে।
✅ প্রতিবেশীর সঙ্গে সীমানা মিলিয়ে নিন এবং সমঝোতা করুন।
৩️. পর্চা গ্রহণ, সংশোধন ও আপত্তি দায়ের:
✅ প্রতিটি খতিয়ানের একটি পর্চা পাবেন — ভালোভাবে যাচাই করবেন। বানান, অংশ বা ঠিকানায় ভুল থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তসদিক (দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) মাধ্যমে সংশোধন করাবেন।
✅ তসদিক (দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা/সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ) পর ৩০ দিন পর্যন্ত খসড়া প্রকাশনা চলবে। কোনো ভুল বা আপত্তি থাকলে নির্ধারিত ফরমে কোর্ট ফি সহকারে ৩০ দিনের মধ্যেই আপত্তি (৩০ বিধি) দায়ের করবেন।
❌ ৩০ দিন পার হলে (তামাদী হলে) আর আপত্তি দায়েরের সুযোগ থাকবে না।
৪️. আপীল ও আদালত:
✅ আপত্তি (৩০ বিধি) কেসের রায়ে অসন্তুষ্ট হলে ৩০ দিনের মধ্যে আপীল (৩১ বিধি) কেস দায়ের করতে পারবেন।
❌ সময় পার হয়ে গেলে বিশেষ আপীল করার সুযোগ থাকবে না।
❌ আপত্তি (৩০ বিধি) কেস না থাকলে আপীল (৩১ বিধি) কেস দায়ের করা যাবে না।
✅ একমাত্র ট্রাইব্যুনাল বা দেওয়ানী আদালতে কেস দায়ের করতে হবে।
৫️. সর্বদা যোগাযোগ রাখুন:
✅ সব সময় জরিপ দলের সাথে যোগাযোগ রাখবেন। এতে আপনার জমির তথ্য সঠিক ও নিরাপদ থাকবে।
✅ সচেতন ভূমি মালিকই নিরাপদ ভূমির নিশ্চয়তা।

বর্তমান অবস্থা, সরকারি অবস্থান ও চ্যালেঞ্জ :
দেশের ছয়টি এলাকায় BDS জরিপ শেষ পর্যায়ে রয়েছে—
* চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন
* নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশন
* রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন
* মানিকগঞ্জ
* ধামরাই
* কুষ্টিয়া
এইসব এলাকায় অনেক জমির মালিক এখনও কাগজপত্র যাচাই বা আপত্তি দাখিল করেননি, যা ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
অন্যদিকে যেখানে জরিপ এখনো শুরু হয়নি, সেখানে এখনই প্রয়োজন—
* সব দলিল ও রেকর্ড হালনাগাদ করা এবং এনআইডি ও খতিয়ানে বানান ও তথ্যের ভুল সংশোধন করা।
* নিজে উপস্থিত থেকে জমির দখল নিশ্চিত করা বা বিশ্বস্ত প্রতিনিধিকে দায়িত্ব দেওয়া।

কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতামত :
ভূমিমন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের জরিপ সম্পন্ন হতে দশকের পর দশক লেগে যেত। কিন্তু বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS) দ্রুত শেষ হবে, এবং একবার সম্পন্ন হলে জমির যাবতীয় তথ্য—খতিয়ান, দাগ, টিন নম্বরসহ—এক ক্লিকেই জানা যাবে।
ড. মো. আ. মান্নান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও বিশেষজ্ঞ (ল্যান্ড সার্ভে অ্যান্ড সেটেলমেন্ট এলার্মস), বলেন—
“*BDS (জরিপ)*কে অবহেলা করা মানে ভবিষ্যতের ঝুঁকি ডেকে আনা। জমির নবম কলামে যদি কারো নাম ভুলে বাদ পড়ে যায়, পরে তা সংশোধন করা কঠিন হবে। তাই এখনই কাগজপত্র ঠিক রাখা ও দখল নিশ্চিত করা জরুরি।”

বাস্তবতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ:
যদিও দেশে ভূমি অফিসগুলো এখন ডিজিটাল সেবার আওতায়, তবুও কিছু অসাধু কর্মকর্তার অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে জনগণ পূর্ণ সুফল পাচ্ছে না। এ জন্য শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
এছাড়া—
* কার কাছে কোন কাগজপত্র জমা হয়েছে, তার একটি ডিজিটাল ট্র্যাক রাখতে হবে।
* জমির রেকর্ড ব্যবস্থায় অফিসিয়াল অডিট ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে।
* জনবান্ধব ভূমি সেবা নিশ্চিতে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশের ভূমি প্রশাসনের ইতিহাসে বাংলাদেশ ডিজিটাল সার্ভে (BDS) একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্যোগ নয়; বরং জমির মালিকানা, সামাজিক স্থিতি এবং আইনি নিরাপত্তার এক শক্তিশালী ভিত্তি। যদি জনগণ সচেতন হন, কাগজপত্র ঠিক রাখেন ও সময়মতো আপত্তি জানান, তবে বাংলাদেশের জমি ব্যবস্থাপনায় আর বিভ্রান্তি থাকবে না—থাকবে কেবল স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার।

তাই—
“BDS (জরিপ)-এ সতর্ক থাকুন, সুরক্ষিত রাখুন আপনার জমির ভবিষ্যৎ।”

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।
তথ্যসূত্র: ডাইরেক্টর, ল্যান্ড রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর, ভূমি ভবন, ঢাকা
উপসহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার , জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, দিনাজপুর