ভূমি প্রতারণা রোধে রেজিস্ট্রেশন আইন ৫২(খ) ধারা বাতিল জরুরি

- প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:১৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ নভেম্বর ২০২৫
- / 267
মানব সভ্যতার গোড়ার দিক থেকেই মানুষের মৌলিক চাহিদা ও নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে ভূমি। জীবনধারণ, বাসস্থান, খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাÑসবকিছুরই উৎস এই ভ‚মি। একটি দেশের উন্নতি, স্থিতিশীলতা ও ন্যায়বিচারের মাপকাঠি হচ্ছে তার ভ‚মি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও সুষ্ঠুতা। কিন্তু বাংলাদেশের ভ‚মি প্রশাসনে বিদ্যমান একটি আইনি ফাঁকÑরেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫২(খ) ভ‚মি ব্যবস্থার মেরুদন্ডকেই দুর্বল করে দিচ্ছে, যা থেকে উদ্ভব হচ্ছে অসংখ্য বিরোধ, প্রতারণা ও সামাজিক অশান্তি।
ধারাটিতে কী আছে?
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ৫২ ক ও খ ধারাঅনুসারে, কোনো জমি বিক্রয়ের দলিল নিবন্ধন করার সময় রেজিস্ট্রার অফিসারকে দুটি শর্ত পূরণ করতে হয়Ñ
(ক) যদি বিক্রেতা উত্তরাধিকার ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে (যেমন: ক্রয়সূত্রে) জমির মালিক হন, তাহলে বিক্রেতার নামে সর্বশেষ খতিয়ান দেখাতে হবে।
(খ) যদি বিক্রেতা উত্তরাধিকারসূত্রে (ওয়ারিশসূত্রে) মালিক হন, তাহলে বিক্রেতার অথবা তার পূর্বসূরির (যার কাছ থেকে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছেন) নামে সর্বশেষ খতিয়ান দেখালেই চলবে।
অর্থাৎ, এই ধারার বিশেষ সুবিধাটি হলোÑউত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমি বিক্রি করতে গেলে বিক্রেতার নিজের নামে নামজারি বাধ্যতামূলক নয়। কেবল পূর্বসূরির খতিয়ান দেখিয়েই দলিল রেজিস্ট্রি করা সম্ভব।
সুযোগটি কেন বিপজ্জনক?
এই ধারাটি একটি বিশাল আইনি ফাঁক তৈরি করেছে, যা অসাধু ব্যক্তিদের জন্য অবৈধ জমি বিক্রির সহজ রাস্তা খুলে দিয়েছে।
* নিজের অংশের অতিরিক্ত জমি বিক্রির সুযোগ : একজন ব্যক্তিতার মৃত পিতার পাঁচ সন্তানের একজন। তার প্রাপ্য অংশ এক-পঞ্চমাংশ হলেও, সে পিতার নামের পুরনো খতিয়ান দেখিয়ে পুরো জমিটিই বিক্রি করে দিতে পারে।
* পুনরাবৃত্তিমূলক প্রতারণা : একই খতিয়ানের কপিবারবার ব্যবহার করে একাধিকবার জমি বিক্রির ঘটনা ঘটছে।
* হাউজিং কোম্পানিগুলোর অপকর্ম : কিছুঅসৎ প্রতিষ্ঠান এই ফাঁক কাজে লাগিয়ে উত্তরাধিকারসূত্রে মালিক দাবি করা ব্যক্তির কাছ থেকে পুরো জমি কিনে দখল নেয়, যার ফলে প্রকৃত মালিকরা জমি হারান।
দলিল সম্পাদনের বিবর্তন :
রেজিস্ট্রেশন(সংশোধন) আইন–২০০৪ প্রবর্তনের পূর্বে ব্রিটিশ শাসন আমলে প্রবর্তিত রেজিস্ট্রেশন আইন–১৯০৮ অনুযায়ী দলিল সম্পাদনের পদ্ধতিতে অসংখ্য দুর্বলতা ছিল।
পুরনো পদ্ধতি (রেজিস্ট্রেশন আইন–১৯০৮)
* নির্দিষ্ট কোনো ফরম ছিল না; দলিল লেখক নিজস্ব ভাষায় লিখতেন।
* বিক্রেতা বা ক্রেতার ছবি, পরিচয়পত্র, মালিকানা যাচাই বাধ্যতামূলক ছিল না।
* কেবল বিক্রেতার স্বাক্ষর, দুই সাক্ষী ও এক সনাক্তকারী দিলেই দলিল রেজিস্ট্রি করা যেত।
ফলে ভুয়া দলিল তৈরি সহজ ছিল, প্রকৃত মালিকানা যাচাই অসম্ভব, জমির সীমানা অস্পষ্ট থাকত এবং সাধারণ মানুষ দলিলের ভাষা বুঝতে পারত না।
নতুন পদ্ধতি (রেজিস্ট্রেশন সংশোধন আইন–২০০৪ ও ২০০৬)
* আইনটির ধারা ২২-এ অনুযায়ী সরকার এস.আর.ও. নং ৮১-আইন/২০০৫ (তারিখ ০৬.০৪.২০০৫) এর মাধ্যমে নির্ধারিত ফরম চালু করে। এতে বিক্রেতা ও ক্রেতার ছবি, নাম, ঠিকানা, স্বাক্ষর, ২৫ বছরের মালিকানা বিবরণ, বায়না দলিল, জমির চৌহদ্দি, নকশা ও মূল্য সংক্রান্ত বিবরণ বাধ্যতামূলক করা হয়।
ফলে জালিয়াতির সুযোগ কমেছে, মালিকানা যাচাই সহজ হয়েছে, দলিল অনেকটা স্বচ্ছ ও বোধগম্য হয়েছে, মামলা–মোকদ্দমাও কিছুটা কমেছে।
সীমাবদ্ধতা :
তবুও দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় বিক্রেতার নামে মিউটেশন বাধ্যতামূলক নয়, বিশেষ করে ৫২(খ) ধারা থাকায় উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমিতে প্রতারণা এখনও বন্ধ হয়নি।
সমাধান কী?
এই সমস্যারোধে মূলত ৫২(খ) ধারা বাতিল করাই জরুরি। যে জমি বিক্রি হবে, তার বিক্রেতার নিজের নামে হালনাগাদকৃত খতিয়ান (মিউটেশন) থাকা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একইসঙ্গে মিউটেশন প্রক্রিয়াকে সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে।
স্বয়ংক্রিয় নামজারি (অটোমেটেড সিস্টেম):
বর্তমানেদেশের ২১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে স্বয়ংক্রিয় নামজারি ব্যবস্থা, যেখানে দলিল রেজিস্ট্রির তথ্য সরাসরি এসিল্যান্ড অফিসে চলে যায় এবং আবেদন ছাড়াই ক্রেতার নামে নামজারি হয়। ভ‚মি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সিস্টেম জুলাই ২০২৫-এর মধ্যে সারাদেশে চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল । এখন এটা বাস্তবায়নের চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে।এভাবে নাগরিকবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত নামজারি প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে জনগণ দ্রæত ভ‚মি সেবা পাবে এবং সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
রেজিস্ট্রি অফিসে জবাবদিহিতা ও ডিজিটাল অডিট
রেজিস্ট্রিঅফিসে জমি রেজিস্ট্রেশনের জন্য ব্যবহৃত দলিল ও কাগজপত্রের ডিজিটাল সংরক্ষণ ও অডিট ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এতে দুর্নীতির সুযোগ কমবে, কর্মকর্তা–কর্মচারীর স্বচ্ছতা বাড়বে এবং ভ‚মি লেনদেন আরও নিরাপদ হবে।
ফলাফল:
যদি নামজারি ছাড়া কোনো দলিল রেজিস্ট্রি না হয়, তাহলেÑ
* অবৈধ দলিলের সুযোগ বন্ধ হবে,
* মালিকানা পরিষ্কার হবে,
* জমি বিরোধ ও মামলা ব্যাপক হারে হ্রাস পাবে।
সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ :
অনেক সময় মানুষ হঠাৎ জানতেপারেন তাদের পরিবারের জমি অন্য কারো দখলে চলে গেছে। নতুন দখলদার যদি থাকে একটি হাউজিং প্রকল্প, তাহলে সেখানে বহুতল ভবনও নির্মিত হয়ে যেতে পারে। আইনি লড়াই করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর।
ভুক্তভোগীকে প্রথমে দলিলটি অবৈধ প্রমাণ করতে আদালতে মামলা করতে হয়, তারপর জারি কার্যক্রম চালিয়ে জমি উদ্ধারের জন্য আলাদা মামলা করতে হয়। এই প্রক্রিয়ায় বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়।
সম্প্রতি প্রণীত ভ‚মি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৩ এ ‘মালিক না হয়েও জমি বিক্রয়’ করাকে ৭ বছর পর্যন্ত কারাদÐের দÐনীয় অপরাধ করা হয়েছে। এটি একটি স্বাগত পদক্ষেপ। কিন্তু এটি একটি প্রতিকারমূলক (ঈঁৎধঃরাব) ব্যবস্থা, প্রতিরোধমূলক (চৎবাবহঃরাব) নয়। চোরকে শাস্তি দেওয়া গেলেও চুরি যাওয়া জিনিস ফেরত পাওয়া যে খুব কঠিন, তা বলাই বাহুল্য।
রেজিস্ট্রেশন(সংশোধন) আইন–২০০৪ ও ২০০৬ ভ‚মি লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এনেছে। তবে রেজিস্ট্রেশন আইন–১৯০৮-এর ৫২(খ) ধারা বহাল থাকায় উত্তরাধিকারসূত্রে জমি বিক্রির ফাঁকফোকর এখনো রয়ে গেছে। অতএব, এই ধারা বাতিল করে রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয় নামজারি (অঁঃড়সধঃবফ গঁঃধঃরড়হ) কার্যকর করাই হবে দেশের ভ‚মি নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রথম শর্ত।
“মানুষ সন্তান হারানোর ব্যথা ভুলে যায়, কিন্তু জমি হারানোর ব্যথা ভুলে না”Ñএই প্রবাদ বাক্যটি আমাদের সমাজে মানুষের ভ‚মির প্রতি গভীর আবেগ ও নির্ভরতারই প্রতিফলন। একটি দেশের ভ‚মি ব্যবস্থাপনা কতটা ন্যায্য ও দক্ষ, তার উপরই নির্ভর করে সেই দেশের সামাজিক শান্তি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯০৮-এর ৫২(খ) ধারাটি একটি অপ্রয়োজনীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ সুযোগ তৈরি করে রেখেছে, যা কেবল অসাধুদেরই সহায়তা করছে। জনগণের সম্পত্তির নিরাপত্তা ও ভ‚মি প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এই ধারা বাতিল করে রেজিস্ট্রেশনের সাথে সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নাম জারি কার্যকর করার ব্যবস্থা করা এখনই সময়ের অপরিহার্য দাবি।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।
তথ্যসূত্র: * ডাইরেক্টর, ল্যান্ড রেকর্ড, ভ‚মি ভবন, ঢাকা
* পেশকার , জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, দিনাজপুর
























