প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: নতুন অধ্যায়ের সূচনা
- প্রকাশের সময় : ০৪:০৯:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
- / 29
চীন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রদ্বয়ের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রাচীন ও প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো। বাঙালি সভ্যতা ও চীনা সভ্যতার মধ্যে খ্রিষ্টের জন্মেরও হাজার বছর আগে থেকে যোগাযোগ রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে চীন ও বাংলার মানুষের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ১৯৭৫ সাল থেকে চীন ও বাংলাদেশের আধুনিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম অংশীদার চীন এবং বাংলাদেশ চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যবসায়িক অংশীদার। সম্প্রতি ২০১৭ সালে প্রধানমন্ত্রীর বাবা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭৭ সালের ২ জানুয়ারি প্রথম বিদেশ সফর ছিল চীনে। ২০০২ সালে জোট সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া চীন সফর করেন। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজির সঙ্গে দেখা করেন এবং ‘এক চীন নীতি’র প্রতি সমর্থন জানান।
চীন সফর: কূটনীতির কৌশলগত পরিবর্তন
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কূটনীতিকরা। অতীতে ভারতকেন্দ্রিক প্রাধান্য থেকে সরে এসে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতিতে একে কৌশলগত পরিবর্তন বলে মনে করেন তারা। কারণ চীন বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান অংশীদার। বাংলাদেশের বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের একটি প্রধান অংশ চীনকেন্দ্রিক। তাই বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বার্থে চীন সফর জরুরি ছিল বলে মনে করেন কূটনীতিকরা।
বিএনপি সরকারের সঙ্গে অতীতে চীনের সম্পর্কে কয়েকবার টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। বিএনপি কয়েক বছর আগে থেকেই চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন কিংবা চীনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার একটি কৌশল নেয়। অতীতে তাইওয়ান ঘিরে ঢাকার অবস্থান বিএনপি সরকারকে বিপাকে ফেলে দেয়। আবার ২০২১ সালে চীনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ঘিরে বিএনপি বিবৃতি দেয়। সেটি নিয়েও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিরোধ ঘটে। তবে এবার বিএনপি সরকার দায়িত্ব নিয়ে ‘এক চীন নীতি’কে স্বীকৃতি দেয়। সেটি সম্পর্ক উন্নয়নের কৌশলগত অবস্থান।
যৌথ ঘোষণাতেও দুই দেশ একে অপরের মৌলিক স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় ‘এক চীন নীতি’র প্রতি অঙ্গীকার ব্যক্ত করে এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে। বাংলাদেশ পুনর্ব্যক্ত করে যে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিং সরকারই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার।
অন্যদিকে, চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে।
‘সরকার ওই সময় একটি ভুল করে বসেছিল, কিন্তু সেই ভুল থেকে তারা দ্রুত বেরিয়েও এসেছে। আর সেই ভুলটাকে মনে করিয়ে দেওয়াতে চীনেরও কোনো স্বার্থ নেই। চীনের স্বার্থ বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোতে। আর বাংলাদেশ যেহেতু ওই অবস্থান থেকে সরেই এসেছে, এ বিষয়ে তাদের আর চাওয়ার কিছু নেই। সুতরাং এটা নিয়ে অস্থির হওয়ার কিছু নেই। এখন আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমরা যাতে ভবিষ্যতে আবার একই রকম ভুল না করি। একই ভুল আবার যেন না করি।’
চীন সফরের প্রাপ্তি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে বেইজিংয়ের ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের উপস্থিতিতে চুক্তিগুলো সই হয়। মোট ১৭টি মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ) সই হয়েছে। তার মধ্যে ১৩টি বাংলাদেশ ও চীনের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দুই দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের (মিনিস্ট্রি টু মিনিস্ট্রি) মধ্যে সই হয়েছে। আর তিনটি হয়েছে বাংলাদেশের বিডার সঙ্গে চীনের বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের এবং একটি সই হয়েছে পলিটিক্যাল পার্টি টু পলিটিক্যাল পার্টি, অর্থাৎ বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনাকারী দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহাদী আমিন বলেন, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের অধীনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়গুলো নিয়ে এমওইউ হয়েছে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি পৃথক কো-অপারেশন প্ল্যান সই হয়েছে। এছাড়া টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল এডুকেশনে সহযোগিতায় দুটি পৃথক এমওইউ এবং বাংলাদেশ থেকে জাতীয় ফল কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম খাতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির লক্ষ্যে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
যৌথ ইশতেহারে একসঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতি
বাংলাদেশ-চীন একটি যৌথ ইশতেহার তৈরি করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পক্ষ বিশ্বাস করে চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নের সুযোগ বয়ে আনবে। নতুন যুগে দুই দেশ ও দুই দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনতে উভয় পক্ষ তাদের ‘কমপ্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’ বা ‘সামগ্রিক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নিয়ে যৌথভাবে ‘চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভাগ্যের কমিউনিটি’ গড়ে তুলতে সম্মত হয়েছে।
উভয় পক্ষ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের ধারা বজায় রাখতে, শাসন পরিচালন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়াতে এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে একটি কৌশলগত সংলাপের ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। এ ছাড়া কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক একটি ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ ব্যবস্থার পথ খোঁজার বিষয়েও উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে।
শিক্ষা, জনশক্তি উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং কৃষি গবেষণায় চীনের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবকিছু মিলিয়ে চীনের সঙ্গে আমাদের বহুদিনের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারত্বের সম্পর্ককে আরও নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার জন্য এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
অনেকে মনে করেন, এই সফরে ১৭টির মতো চুক্তি, প্রোটোকল অথবা স্মারক সই হয়েছে এবং সেগুলো সবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। আমি মনে করি, এই চুক্তিগুলো আমাদের দুই দেশের সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার করতে জোরালো ভূমিকা রাখবে। সে জন্য আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরটি অত্যন্ত সফল হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আমাদের পররাষ্ট্রসম্পর্কের অগ্রগতির নতুন দুয়ার উন্মোচন হবে। পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা আরও এগিয়ে যাবে। এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, আবুবকর বিশ্বাস মকসেদ আলী কলেজ, কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ।

























