হাইড্রেশন ব্রেক: পানি পান না বিজ্ঞাপন বিরতি?
- প্রকাশের সময় : ০৭:২৪:৩৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
- / 13
সময়ের সাথে সাথে সব খেলার নিয়ম-কানুনেই যুগান্তকারী সব পরিবর্তন এসেছে। এখন খেলোয়াড়দের সুরক্ষাকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়। একবার ভাবুন তো ক্রিকেটে এখন ব্যাটসম্যানদের যতটা সুরক্ষা দেয়া হয়, স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের আমলে সেটা থাকলে তাঁর রান কত হতো, আর গড় কত হতো!
ফুটবলেও খেলোয়াড়দের সুরক্ষা দিতে ফাউলের ব্যাপারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ক্রিকেটে যেমন টিভি আম্পায়ারের মাধ্যমে ডিসিশন রিভিউ সিস্টেম বা ডিআরএস চালু হয়েছে। ফুটবলেও এসেছে ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি বা ভিএআর। আম্পায়ার বা রেফারি তার সিদ্ধান্ত আরো নিখুঁত করার জন্য প্রযুক্তির সাহায্য নেন। ফলে সময়ের সাথে সাথে খেলোয়াড়দের সুরক্ষা যেমন নিশ্চিত হয়েছে, কমে এসেছে ভুলের সংখ্যাও।
নতুন নতুন অনেক নিয়মকেই খেলোয়াড় ও দর্শকরা স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এবারের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপে হুট করে চালু হওয়া ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ নিয়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। এতদিন ফুটবল ছিল দুই অর্ধের খেলা। ৯০ মিনিটের খেলায় মাঝখানে ১৫ মিনিটের বিরতি থাকতো। কিন্তু এবার প্রতি ম্যাচে প্রথমার্ধের ২২ মিনিটে ও দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটে ৩ মিনিট করে হাইড্রেশন ব্রেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দুই ভাগের ফুটবল এখন চার ভাগের হয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে না হলেও ভারতের আইপিএলসহ বিভিন্ন দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি লীগে স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউটের নিয়ম চালু আছে। বাস্কেটবল, আমেরিকান ফুটবলেও টাইমআউটের প্রচলন আছে। তবে ফুটবলে বাধ্যতামূলক ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ এবারই প্রথম।
এর আগে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস বনাম মেক্সিকোর মধ্যকার নকআউট ম্যাচের ৩২ ও ৭৬তম মিনিটে ৩ মিনিট করে কুলিং ব্রেক দিয়েছিলেন রেফারি। তখন ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা হলে রেফারি চাইলে কুলিং ব্রেক দিতে পারতেন। এবারের বিশ্বকাপে সেই কুলিং ব্রেক ফিরেছে হাইড্রেশন ব্রেক নামে এবং তাপমাত্রা যাই হোক, এমনকি ছাদ বন্ধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মাঠেও হাইড্রেশন ব্রেক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এখানেই সবাই বাণিজ্যের গন্ধ পাচ্ছেন।
হাইড্রেশন ব্রেক চালুর যুক্তি হিসেবে অবশ্যই স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি ঢাল হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। ফিফার দাবি, খেলোয়াড়দের পানিশূন্যতা, ক্লান্তি এবং তাপজনিত শারীরিক ঝুঁকি কমাতে এই বিরতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এটা ঠিক আধুনিক ফুটবল আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রুতগতির, খেলোয়াড়রাও মাঠে অনেক বেশি দৌড়ান। নির্দিষ্ট বিরতিতে শরীরকে রিহাইড্রেট করতে পারলে খেলোয়াড়দের ইনিজুরি প্রবণতা কমে আসবে। হাইড্রেশন ব্রেক চালুর পক্ষে যুক্তি অকাট্য সন্দেহ নেই। মনে হতে পারে, খেলোয়াড়দের ভালোর কথা ভেবে ফিফার বুঝি ঘুম হারাম।
তাহলে হাইড্রেশন ব্রেক চালুর আগে কি প্রয়োজনে পানি খেতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। আগে থ্রো-ইন, কর্নার কিক বা কোনো খেলোয়াড় ইনজুরিতে পড়লে অন্য খেলোয়াড়রা প্রয়োজনমত সাইডলাইনে দৌড়ে গিয়ে পানি খেয়ে আসতেন। অনেক সময় কোচিং স্টাফ বা মেডিকেল টিমের সদস্যরা সাইডলাইন থেকে মাঠের ভেতরে বোতল ছুড়ে দিতেন। আর গোলকিপাররা সবসময়ই তাদের পোস্টের পেছনে পানির বোতল রাখার অনুমতি পেতেন। তবে আগে পানি খাওয়ার জন্য খেলা থামানো হতো না। তাই পানি পানের জন্য খেলায় কোনো বাড়তি সময় লাগতো না, খেলার গতিও নষ্ট হতো না।
এ জন্যই সবার সন্দেহ আসলে খেলোয়াড়দের ভালোর নামে আসলে বাণিজ্যিক কারণেই এই অপ্রয়োজনীয় ব্রেক বাধতামূলক করা হয়েছে। হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। এতদিন নাটক, সিনেমা, খবরের মাঝে বিজ্ঞাপন বিরতি থাকতো। এখন সরাসরি খেলার মাঝেও কি তবে বিজ্ঞাপন দেখতে হবে? শুধু সাধারণ দর্শক নন, খেলোয়াড় এবং কোচরাও তাদের বিরক্তি লুকাননি।
এবারের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক ভার্জিল ফন ডাইক গত রবিবার তাদের প্রথম ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রতিবার যখন এই বিরতির সুযোগে টিভিতে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়, সত্যি বলতে এটা আমার একদমই পছন্দ নয়।’
লিভারপুলের সাবেক কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপেরও হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে তীব্র আপত্তি। তিনি স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘স্পনসরদের সুবিধার জন্য তৈরি করা এই বিরতি খেলার গতি নষ্ট করবে।’
ফুটবল হলো গতি আর ছন্দের খেলা। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে খেলা। কোনো দল যখন আক্রমণে যায়, তখন খেলায় তারা একটি মোমেন্টাম পায়। বারবার বিরতি খেলার সেই মোমেন্টাম নষ্ট করে। আচমকা খেলার গতি থেমে যায়, ছন্দ হারিয়ে যায়। এই বাড়তি বিরতিতে খোলোয়াড়দের ফোকাসও নষ্ট হয়ে যায়।
ফুটবল এখন যতটা খেলা, তারচেয়ে বেশি বাণিজ্য। টেলিভিশন আর অনলাইনে বিশ্বের প্রতিটি কোনায় সম্প্রচারিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল। কোটি কোটি দর্শক বুঁদ হয়ে খেলা দেখেন। গ্লোবালাইজেশনের নামে ফিফা এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ আয়োজন করছে। তবে গ্লোবালাইজেশনের সাথে সাথে কমার্শিয়ালাইজেশনটাও হচ্ছে ভালো। প্রতি ম্যাচে বাড়তি ৬ মিনিটের বিরতিতে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ পাচ্ছে সম্প্রচারকারীরা। তাকে ফিফার আয় বাড়বে হাজার কোটি টাকা।
সবার এখন প্রশ্ন, বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেকের নামে এই ৬ মিনিটের বিরতি কি পানি পানের জন্য না বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য?























