Dhaka ০২:০২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

কিছু ব্যাংক থেকে এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে : গভর্নর

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশের সময় : ০৮:০৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬
  • / 12

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশ সংকটে রয়েছে। কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে। এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে। একটি ব্যাংকিং সিস্টেমকে স্থিতিশীল করতে সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন গভর্নর।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, গ্রাহকরা ব্যাংক আমানত রাখতে আস্থা রাখতে পাচ্ছেন না, কারণ অনেকে বলছেন-গভর্নর নিজেই তো ঋণ খেলাপি।

তখন গভর্নর নিজের ঋণ খেলাপি হওয়ার যে অভিযোগ সেটা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মোস্তাকুর রহমান।

গভর্নর বলেন, আমি ইনভলভ ছিলাম একটা গ্রিন ফ্যাক্টরি লিগ সার্টিফিকেট (অর্থাৎ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার আগে)। এখানে দুই ধরনের বিষয় আছে। একটা হচ্ছে ওভারভিউ হয়ে বিলম্ব হওয়া সেটা এক জিনিস। আরেকটা হচ্ছে ঋণ খেলাপি, বিবিএল হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি একদিনের জন্য বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি একদিনের জন্য এক্সপোর্ট বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরির এক মাসের জন্য বেতন দিতে দেরি হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি ব্যাংকের কাছে এক টাকা ঋণ মওকুফ চায় নাই।

তিনি আরও বলেন, শুধু যেটা হয়েছে, সেই কারখানা প্রথম শুরুতে অর্থায়ন করেছিল এফএসএসপি প্রজেক্টের অধীনে। যেখানে সুদের হার ছিল ৪ শতাংশ। ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পরে ব্যাংক জানায় যে, ওই ফান্ডটা শেষ হয়ে গেছে। আপনাদের এখন ৯ থেকে ১১ শতাংশ সুদ দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে রিপেমেন্ট আগের প্রজেকশন অনুসারে হয় নাই। সেটা বিলন্ব হয়েছে এবং সেখানে কোভিড (করোনাভাইরাস) ছিল। এছাড়া অন্যান্য সমস্যাও ছিল। তবে, এটা নিশ্চিত থাকেন যে আমরা কখনো এক পয়সা, এক টাকা ঋণ মওকুফ চায়নি। সেই প্রতিষ্ঠানের ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধও করে দিছে। সুতরাং বলতে-বলতে একটা মিথ্যা কথাকে অনেক সময় সত্য করে ফেলি।

এ সময় গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। দীর্ঘদিন যেসব আমানতকারী টাকা ফেরত পাচ্ছিলেন না, তারা এখন ধীরে ধীরে টাকা পেতে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা ইসলামী ব্যাংককে সাপোর্ট দিতে চাই। ব্যাংকটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে গভর্নর বলেন, গত ২৫ মার্চ আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখ ছিল। এরপর বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকার শেষে মে মাসে নতুন এমডি নির্বাচন করা হয়। পরে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটি এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন শেষে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তিনি জানান, একই সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড গঠনেও কিছুটা সময় লেগেছে। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) সমন্বয়ের কাজ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কার্যক্রমে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।

ইসলামী ব্যাংকে সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, আমরা কাউকে ঋণ দিতে বলি না, বদলি বা পদোন্নতির জন্যও কোনো নির্দেশ দেই না। এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

গভর্নর আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তাকে গত ১৬ মার্চ পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।

ঈদের আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, এটি একটি সিস্টেমিক ব্যাংক। তাই বোর্ডে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করতে আমাদের দ্রুত নতুন নিয়োগ দিতে হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর-রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

কিছু ব্যাংক থেকে এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে : গভর্নর

প্রকাশের সময় : ০৮:০৪:২৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, দেশের ব্যাংক খাতের একটি বড় অংশ সংকটে রয়েছে। কিছু ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বেরিয়ে গেছে। এক-তৃতীয়াংশ ডিপোজিট চুরি হয়ে গেছে। একটি ব্যাংকিং সিস্টেমকে স্থিতিশীল করতে সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অর্থ মন্ত্রণালয় আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন গভর্নর।

সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, গ্রাহকরা ব্যাংক আমানত রাখতে আস্থা রাখতে পাচ্ছেন না, কারণ অনেকে বলছেন-গভর্নর নিজেই তো ঋণ খেলাপি।

তখন গভর্নর নিজের ঋণ খেলাপি হওয়ার যে অভিযোগ সেটা নিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন মোস্তাকুর রহমান।

গভর্নর বলেন, আমি ইনভলভ ছিলাম একটা গ্রিন ফ্যাক্টরি লিগ সার্টিফিকেট (অর্থাৎ ব্যাংকের গভর্নর হওয়ার আগে)। এখানে দুই ধরনের বিষয় আছে। একটা হচ্ছে ওভারভিউ হয়ে বিলম্ব হওয়া সেটা এক জিনিস। আরেকটা হচ্ছে ঋণ খেলাপি, বিবিএল হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি একদিনের জন্য বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি একদিনের জন্য এক্সপোর্ট বন্ধ হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরির এক মাসের জন্য বেতন দিতে দেরি হয় নাই। আজ পর্যন্ত সেই ফ্যাক্টরি ব্যাংকের কাছে এক টাকা ঋণ মওকুফ চায় নাই।

তিনি আরও বলেন, শুধু যেটা হয়েছে, সেই কারখানা প্রথম শুরুতে অর্থায়ন করেছিল এফএসএসপি প্রজেক্টের অধীনে। যেখানে সুদের হার ছিল ৪ শতাংশ। ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার পরে ব্যাংক জানায় যে, ওই ফান্ডটা শেষ হয়ে গেছে। আপনাদের এখন ৯ থেকে ১১ শতাংশ সুদ দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবে রিপেমেন্ট আগের প্রজেকশন অনুসারে হয় নাই। সেটা বিলন্ব হয়েছে এবং সেখানে কোভিড (করোনাভাইরাস) ছিল। এছাড়া অন্যান্য সমস্যাও ছিল। তবে, এটা নিশ্চিত থাকেন যে আমরা কখনো এক পয়সা, এক টাকা ঋণ মওকুফ চায়নি। সেই প্রতিষ্ঠানের ইতোমধ্যে ১০০ কোটি টাকার ওপরে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধও করে দিছে। সুতরাং বলতে-বলতে একটা মিথ্যা কথাকে অনেক সময় সত্য করে ফেলি।

এ সময় গভর্নর বলেন, ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি দুর্বল ব্যাংককে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। দীর্ঘদিন যেসব আমানতকারী টাকা ফেরত পাচ্ছিলেন না, তারা এখন ধীরে ধীরে টাকা পেতে শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, আমরা ইসলামী ব্যাংককে সাপোর্ট দিতে চাই। ব্যাংকটিতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে দ্রুত বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের এমডি নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়ে গভর্নর বলেন, গত ২৫ মার্চ আবেদন গ্রহণের শেষ তারিখ ছিল। এরপর বিভিন্ন সংস্থার রিপোর্ট সংগ্রহ, যাচাই-বাছাই ও সাক্ষাৎকার শেষে মে মাসে নতুন এমডি নির্বাচন করা হয়। পরে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কমিটি এবং প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন শেষে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

তিনি জানান, একই সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড গঠনেও কিছুটা সময় লেগেছে। নতুন চেয়ারম্যান দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্প্রতি প্রথম বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার (সিবিএস) সমন্বয়ের কাজ এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কার্যক্রমে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।

ইসলামী ব্যাংকে সরকারের অবৈধ হস্তক্ষেপের অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, আমরা কাউকে ঋণ দিতে বলি না, বদলি বা পদোন্নতির জন্যও কোনো নির্দেশ দেই না। এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

গভর্নর আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় তাকে গত ১৬ মার্চ পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর কোনো হস্তক্ষেপ ছিল না।

ঈদের আগে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন গভর্নর। তিনি বলেন, এটি একটি সিস্টেমিক ব্যাংক। তাই বোর্ডে ন্যূনতম সদস্যসংখ্যা নিশ্চিত করতে আমাদের দ্রুত নতুন নিয়োগ দিতে হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মৎস্য ও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন-উর-রশিদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থ সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যানসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট।