গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ: রাষ্ট্র পুনর্গঠনের সুযোগ বনাম বিশৃঙ্খলা
- প্রকাশের সময় : ০১:৫৭:৫৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / 421
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কালজয়ী অধ্যায়। দেড় দশকের এক রুদ্ধশ্বাস স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে এই অভ্যুত্থান জাতিকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এক অভূতপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে উৎসারিত এই গণজোয়ার কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের নৈতিক ও কাঠামোগত সংস্কারের দাবি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেই ঐতিহাসিক সুযোগটি যথাযথ ব্যবহারের পরিবর্তে এক গভীর অনিশ্চয়তা ও চরম বিশৃঙ্খলার দিকে রাষ্ট্র ধাবিত হচ্ছে।
একটি সফল বিপ্লবের পর রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র। রাজধানীর ধানমন্ডিতে শরীফ ওসমান হাদীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা আমাদের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই নগ্নভাবে প্রকাশ করে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এমন একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পরও মূল আসামিরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছে। যখন খুনিরা দেশ ত্যাগ করে বাইরে চলে যেতে পারে অথবা ঘাপটি মেরে দেশের অভ্যন্তরেই লুকিয়ে থাকে, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এমন আইন-শৃঙ্খলার সংকটের পাশাপাশি, দেশব্যাপী প্রথম আলো, ডেইলি স্টার-এর মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা এবং সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হওয়া গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর কুঠারাঘাত বসিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাঙালির প্রাণের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট ও উদীচীসহ বিভিন্ন স্থানে যে ধরণের হামলার ঘটনা ঘটছে, তা আমাদের সহনশীলতার ঐতিহ্যে চরম আঘাত। এই ‘মব কালচার’ বা বিচারবহির্ভূত তৎপরতা যখন রাষ্ট্রের নাকের ডগায় ঘটে, তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র পরিচালনার রশিগুলো আলগা হয়ে পড়েছে।
আইন-শৃঙ্খলার এই ক্রমাবনতির পাশাপাশি আরও একটি উদ্বেগজনক দিক হলো নেতৃত্বের বিচ্যুতি ও তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনার ভুল ব্যবহার। অভ্যুত্থানের পর তরুণ প্রজন্মের প্রতি যে রাষ্ট্রীয় বার্তা আসা প্রয়োজন ছিল, তা হলো— “তোমরা ইতিহাস গড়েছ, এবার নিজেদের গড়ার সময়।” তরুণদের উচিত ছিল শিক্ষাঙ্গনে ফিরে যাওয়া এবং রাষ্ট্রের ‘ওয়াচডগ’ হিসেবে কাজ করা। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ছাত্রনেতাদের সরাসরি উপদেষ্টা নিয়োগ এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে তাদের ব্যাপক প্রভাব বিস্তার হিতে বিপরীত ফল বয়ে এনেছে। তরুণদের মেধা গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতার জটিল সমীকরণে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। এতে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র নির্মাণের পরিবর্তে একপাক্ষিক রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের পরিবর্তে এক ধরণের এনজিও-কর্পোরেট সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যাচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রচিন্তার চেয়ে স্বল্পমেয়াদী ‘ব্র্যান্ডিং প্রাধান্য পাচ্ছে।
তরুণদের এই ভুল পথনির্দেশনার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হলো শিক্ষা ও গবেষণার চরম উপেক্ষা। সরকারের নীতিগত সবচেয়ে বড় দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে শিক্ষা খাতে। একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে পুনর্গঠন করতে হলে শিক্ষা ও গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া অপরিহার্য ছিল। অথচ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তরুণদের প্রতি প্রধান বার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে— “উদ্যোক্তা হও।” উদ্যোক্তাবাদ উন্নয়নের অনুষঙ্গ হতে পারে, কিন্তু তা কখনোই উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার বিকল্প নয়। প্রবাসী মেধাবী গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনা বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করার কোনো সুনির্দিষ্ট মহাপরিকল্পনা সরকারের কর্মতালিকায় সেভাবে দৃশ্যমান নয়। জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়ন ছাড়া কেবল মুনাফাভিত্তিক ‘উদ্যোক্তা’ তৈরির প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত জাতিকে মেধাশূন্য করে তুলতে পারে।
এই সার্বিক অস্থিতিশীলতা ও দিকভ্রান্তির মধ্যেও, মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো, এই পরিস্থিতি অনিচ্ছাকৃতভাবে জাতিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রেইলার’ দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা দর্শন যখন রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তখন দেশ কতটা পিছিয়ে যেতে পারে—তার প্রমাণ আজ মানুষের সামনে দৃশ্যমান। বিভিন্ন শাসন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা লাভ করে জনগণের গণতান্ত্রিক চেতনা ও রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
উপসংহারে বলা যায়, ইতিহাস সুযোগ দেয়, কিন্তু তা বারবার নয়। জাতীয় পুনর্গঠনের কেন্দ্রে শিক্ষা, গবেষণা এবং কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে না রেখে কেবল প্রচারমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা স্থায়ী সুফল আনে না। শরীফ ওসমান হাদী হত্যার বিচার করতে না পারা কিংবা সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা রুখতে না পারা নেতৃত্বের এক করুণ ব্যর্থতা। রাষ্ট্রকে ক্ষমতার হাতিয়ার না বানিয়ে একটি নিরাপদ ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল এই অভ্যুত্থানের মূল অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার থেকে বিচ্যুতি ঘটলে এই ব্যর্থতার হিসাব একদিন ইতিহাসই কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেবে।


























