৭ মাসের বাচ্চা ফিরে পেতে লিগ্যাল এইডে ১৩ বছরের মা
“মেয়েটি প্রথম যেদিন এখানে আসে, বিশ্বাস করিনি ওর বাচ্চা আছে…সে নিজেও একটা বাচ্চা।”
- প্রকাশের সময় : ১০:২২:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / 2
ফেইসবুকে পরিচয় থেকে প্রেম; দুই বছর আগে তারা বসেন বিয়ের পিঁড়িতে। তখন কনের বয়স সবে ১১ বছর, আর বর শাকিল ওরফে শাকিব মিয়া ছিলেন ২০ বছরের তরুণ।
এর মধ্যে তাদের কোলজুড়ে আসে এক পুত্র সন্তান। সেই সন্তানকে কেড়ে নিয়ে মাকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্বামী-শ্বাশুড়ির বিরুদ্ধে। ১৩ বছর বয়সি মা ছেলেকে ফিরে পেতে দ্বারস্থ হন লিগ্যাল এইডে।
মঙ্গলবার ঢাকার লিগ্যাল এইড অফিসার মো. সায়েম খান বাচ্চাটিকে তার শিশু মায়ের কাছে থাকার আদেশ দেন। তাতে ছেলেকে কোলে ফিরে পেয়েছেন কিশোরী মা।
আড়াই মাস আগে শিশুটিকে রেখে মাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়—এমন অভিযোগ এনে গেল ১ জুলাই ঢাকা জেলা লিগ্যাল এইডে অফিসে অভিযোগ দেওয়া হয় শাকিল ও তার মা আছমার বিরুদ্ধে। বাচ্চাকে উদ্ধারের আরজি জানান মা।
অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের ১৬ জুলাই লিগ্যাল এইড অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে সেদিন তারা হাজির হননি। এজন্য লিগ্যাল এইড অফিসার সায়েম খান শিশুটিকে উদ্ধার করতে চকবাজার থানা পুলিশকে নির্দেশ দেন। সেই অনুযায়ী সোমবার শিশুটিকে উদ্ধার করে পুলিশ।
মঙ্গলবার শাকিল ও তার মা আছমা লিগ্যাল এইড অফিসে হাজির হন। শিশুটিকেও নিয়ে আসা হয়। আসেন কিশোরী মা-ও। পরে শুনানি শুরু হয়।
প্রথমে লিগ্যাল এইড অফিসার সায়েম খান শিশুটির বাবাকে ডেকে নিয়ে পাশে বসান। এরপর মাকেও ডেকে নিয়ে সামনে বসানো হয়; তার কোলে ছিল ৭ মাসের বাচ্চাটিও। সেখানে দুই পক্ষের আইনজীবীরাও উপস্থিত ছিলেন।
এসময় অফিসার কিশোরীর কাছে জানতে চান, “তোমার বাবু?”
কিশোরী বলেন, “হ্যাঁ। আমার ছেলে।”
ছেলেকে পেয়ে খুশি কি না জানতে চান অফিসার। কিশোরী বলেন, “অনেক খুশি।”
এরপর অফিসার সবার উদ্দেশ্যে বলেন, মেয়েটি “প্রথম যেদিন এখানে আসে, বিশ্বাস করিনি ওর বাচ্চা আছে। বিশ্বাস করার মতও না বিষয়টা। সে নিজেও একটা বাচ্চা।”
এরপর অফিসার শাকিলের কাছে তার বয়স জানতে চান। শাকিল বলেন, “২২ বছর বয়স।”
এটুকু মেয়েটাকে কীভাবে নিয়ে গেলে, অফিসার জানতে চাইলে শাকিল দাবি করেন, “যখন নিয়ে গেছি প্রাপ্ত বয়স্ক। ওর একটা মামাতো বোন আছে। ওর চেয়ে এক বছরের ছোট। তার থেকে ওকে তিন গুণ বড় দেখায়।”
জোর করে আটকে রাখা হয়েছে কি না অফিসার জানতে চান। শাকিল বলেন, “না আটকে রাখিনি।”
এসময় কিশোরীর আইনজীবী মৃনাল কান্তি মিত্র অফিসারকে বলেন, “পারিবারিক কোর্টে গার্ডিয়ানশিপের মামলাও করে দিছে।”
পরে অফিসার শিশুটি তার মায়ের কাছে থাকবে মর্মে জানান।
এ পর্যায়ে শাকিলের আইনজীবী খন্দকার মো. শাহজাহান ইসলাম অফিসারকে বলেন, “বাচ্চাকে আটকে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগ যদি মনে করি, তাহলে বিষয়টা একপক্ষে চলে যায়। আমরা বিশ্বাস করি বা না করি, ঘটনা কিন্তু ঘটে গেছে।
“মা তার বাচ্চাকে ফেলে রেখে চলে গেছে। এজন্য তাকে আর তার মায়ের কাছে দেওয়া যায় না। এজন্য গার্ডিয়ানশিপের মামলা করি। এখন বাচ্চাটা মায়ের কাছে গেলে বিষয়টা সাংঘর্ষিক হয়ে যায় না?”
তখন অফিসার বলেন, “যেহেতু বাচ্চাটাকে নিয়ে আসা হয়েছে, মায়ের কাছে থাকুক। মানবিক দিক তো দেখতে হবে।”
বাচ্চাকে মায়ের কাছে রাখার আদেশ দিয়ে আগামী মঙ্গলবার শুনানির পরবর্তী দিন রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছেন লিগ্যাল এইড অফিসের বেঞ্চ সহকারী মোশাররফ হোসেন।
শুনানি শেষে কিশোরী লিগ্যাল এইড অফিসারের কাছে জানতে চান, বাচ্চা তার কাছে থাকবে কি না। অফিসার বলেন, “হ্যাঁ, তোমার কাছে থাকবে।”
কিশোরীর বাবা অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। আর মা দুই বছর আগে জীবিকার তাগিদে সৌদি আরব যান। ওই কিশোরী তার বাবার সঙ্গে ঢাকার একটি এলাকায় থাকেন। তার মা ঘটনা শুনে ১৪ দিন আগে দেশে ফিরেছেন; তিনিও স্বামীকে নিয়ে লিগ্যাল এইড অফিসে উপস্থিত হন।
কিশোরীর মা অভিযোগ করে বলেন, “আমার মেয়ে পড়াশোনা করতো। এই ছেলে ফুঁসলায়ে আমার মেয়েকে নিয়ে অনেক দিন রাখে। এরপর নিয়ে আসি। আবার আমার মেয়েকে নিয়ে গেছে।
“আমি তো শুরু থেকেই এই ছেলের কাছে মেয়ে দেব না। আমার যদি ছেলের ফ্যামিলি দেখে পছন্দ হয় নাই, আমি মেয়ে দেব কেন? আমার মেয়ের তো বিয়ের বয়স হয়নি। ওর কেবল ১৩ বছর বয়স।”
কিশোরীর বাবা বলেন, “তাকে (শাকিলকে) বলি আমার মেয়ে মেট্রিক পরীক্ষা দিবে, তারপর বিয়ের কথা বলব। ও আমার মেয়েকে ভাগায় নিয়ে যায়। এক সপ্তাহ রাখে। মান-সম্মানের দিকে তাকায়ে কিছু বলিনি।
“পরে আবার ভাগায়ে নিয়ে আমার মেয়েকে বিয়ে করছে। কোন জায়গায় গিয়ে বিয়ে করছে, তাও আমি জানি না। আমাকে অনেক হুমকি-ধামকি দিছে।”
তবে শাকিল বলেন, “ফেসবুকে ওর সাথে আমার পরিচয়। পরিচয়ের মাসখানেক পর আমাকে বলে, তাকে নিয়ে আসতে। না নিয়ে আসলে মরে যাওয়ার হুমকি দেয়। কিছু চিন্তা না করে নিয়ে গেছি। বিয়ে-শাদি করছি।
“আমার মা ওরে মাইন্যা নিছে। আমার মা ওরে নামাজ-কালাম পড়তে কয়। আমার মাকে আজে-বাজে কথা বলতো। মায়ের সাথে বনতো না। ওর জন্য আমি আমার কাছেও অনেক অত্যাচার করছি।”
তিনি বলেন, “পরে ও চলে যায়। ওর বাপে ওকে বরিশালে নিয়ে আটকে রাখে। বাচ্চা হওয়ার পরে আবার আমার বাসায় নিয়ে আসি। আনার পর ওর বাবা যখন আমাদের বাসায় আসতো, তখন ঝগড়া বাধতো। একা থাকলে ঝগড়া হতো না।
“আমার ঘর-জামাই থাকতে বলে। আমি থাকি না। ওর বাপে স্ট্রোক করছে—একথা বলে তিন মাস আগে এক ঘণ্টার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়। বাচ্চা রেখে যাই। এরপর আর কোনো খোঁজ-খবর নেয় নাই তিন মাসের মধ্যে। এখন তারা দরদ দেখাইতেছে।”
কিশোরীর আইনজীবী মৃনাল কান্তি মিত্র বলেন, “শুটিং স্পট দেখানোর কথা বলে মেয়েটাকে নিয়ে সেখান থেকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে আটকে রাখে। শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। ব্ল্যাংক স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে বলে বিয়ে হয়ে গেছে। স্বামীর অধিকার দেখিয়ে তাকে বারবার নির্যাতন করে।
“গত ১ জানুয়ারি বাচ্চা ডেলিভারি হয়। বাচ্চাকে রেখে গত মে মাসে ভিকটিমকে বিদায় করে দেয়। বাচ্চাটাকে মায়ের কাছ থেকে নিয়ে নিতে গার্ডিয়ানশিপের মামলা করে। তারা নিরুপায় হয়ে লিগ্যাল এইডে আসে। বাচ্চা উদ্ধারে সার্চ ওয়ারেন্ট দেওয়া হয়। আজ বাচ্চাকে এখানে নিয়ে আসা হয়। বাচ্চাটা মায়ের কাছে থাকবে—এমন আদেশ এসেছে।”
সূত্র: বিডিনিউজ

























