‘নাকের নিচের একটি তিল’ যেভাবে ধরিয়ে দিল শহীদ জিয়ার খুনিকে
- প্রকাশের সময় : ০৬:৪৬:০৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
- / 29
দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে নাম-পরিচয়, চেহারা ও জীবনযাপনের ধরন বদলে আত্মগোপনে ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন। তবে শেষ পর্যন্ত নাকের নিচে থাকা একটি জন্মচিহ্ন এবং নিজের মুখে দেওয়া পরিচয়েই ভেঙে যায় তার দীর্ঘদিনের ছদ্মবেশ।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আত্মগোপনে যাওয়ার পর মোজাফফর হোসেন নিজের পরিচয় পরিবর্তন করেন। নতুন নামে জীবন শুরু করেন এবং পুরোনো পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন ও অতীতের প্রায় সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, যাতে তার অবস্থান শনাক্ত করা না যায়। জীবনের শেষভাগে তিনি গোপনে দেশে ফিরে রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস এলাকায় বসবাস শুরু করেন এবং নিজেকে একজন অবসরপ্রাপ্ত, রাজনীতিবিমুখ সাধারণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিতেন।
ডিবির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মোজাফফরের নাকের ঠিক নিচে একটি জন্মগত তিল বা কালো দাগ ছিল। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে শনাক্তকরণের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মেয়ের সূত্রে অনুসন্ধান
গোয়েন্দারা প্রথমে মোজাফফরের মেয়ের কর্মস্থলকে কেন্দ্র করে অনুসন্ধান শুরু করেন। তিনি একটি বেসরকারি টেলিকম কোম্পানিতে চাকরি করেন বলে জানা যায়। কয়েক মাস ধরে তার কর্মস্থল ও চলাফেরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে একটি বাসা শনাক্ত করা হয়। পরে সেখানে গোপনে নজরদারি চালিয়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করা হয় যে, মোজাফফর হোসেন সেখানে অবস্থান করছেন কি না।
ছদ্মবেশে অভিযান
বুধবার (১৫ জুলাই) গভীর রাতে ডিবির একটি দল টেলিকম প্রতিষ্ঠানের কর্মী পরিচয়ে ওই বাসায় যায়। তারা দরজায় কড়া নেড়ে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে চান।
এ সময় বাসা থেকে বেরিয়ে আসা এক বৃদ্ধ জানতে চান, এত রাতে কী প্রয়োজন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে গোয়েন্দারা তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে?’
জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা।’
গোয়েন্দাদের দাবি, এই পরিচয় দেওয়ার আগেই তারা নাকের নিচে থাকা জন্মচিহ্ন দেখে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছিলেন। পরে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে গ্রেফতার করা হয়।
৪৫ বছরের পলাতক জীবন
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত হামলায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ মামলায় ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন।
সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরে ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র ও ছদ্মনাম ব্যবহার করে বছরের পর বছর আত্মগোপনে থাকেন। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তিনি ভুয়া নথি ব্যবহার করে বিদেশ ভ্রমণও করেছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে তার অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তবে শেষ পর্যন্ত নাকের নিচে থাকা জন্মচিহ্ন এবং নিজের মুখে দেওয়া পরিচয়ই ভেঙে দেয় ৪৫ বছরের সেই ছদ্মবেশ। বনানী ডিওএইচএসে পরিচালিত ডিবির অভিযানে তার দীর্ঘ পলাতক জীবনের অবসান ঘটে।





















