মার্কিন ফুটবলারের লাল কার্ড ইস্যু: ফিফার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ উয়েফা
- প্রকাশের সময় : ১০:২২:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
- / 2
যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগুনকে বিশ্বকাপে লাল কার্ডের পরও এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দেওয়ায় বিশ্ব ফুটবলে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ফিফার এই সিদ্ধান্তকে ‘অভূতপূর্ব, বোধগম্য নয় এবং কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির দাবি, এই সিদ্ধান্ত ফুটবলের ন্যায্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড দেখেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তারকা স্ট্রাইকার বালোগুন। নিয়ম অনুযায়ী, শেষ ষোলোর ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে তার খেলতে না পারার কথা ছিল। কিন্তু ফিফা শাস্তি কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় স্বাগতিক দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা বালোগুন এখন সেই ম্যাচে খেলতে পারবেন।
ফিফা ‘লাল রেখা’ অতিক্রম করেছে
উয়েফা এক বিবৃতিতে বলেছে, টুর্নামেন্ট চলাকালে স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করার সিদ্ধান্ত ফুটবলের নিয়মের একটি মৌলিক নীতিকে ভেঙে দিয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৮৮টি লাল কার্ডের মধ্যে মাত্র একজন ফুটবলার নিষেধাজ্ঞা এড়াতে পেরেছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি গ্যারিঞ্চা, যিনি ১৯৬২ বিশ্বকাপে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগের মধ্যে শাস্তি এড়িয়েছিলেন। তবে তখন স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার বর্তমান নিয়ম চালু হয়নি।
উয়েফার ভাষায়, “এক ম্যাচের স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা কোনও বিবেচনাধীণ বিষয় নয়; এটি প্রতিযোগিতার বিধিমালায় স্পষ্টভাবে নির্ধারিত একটি মৌলিক নীতি।”
সংস্থাটি আরও বলেছে, “যখন নিয়মের রক্ষকরাই নিয়মের নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হন, তখন খেলার সততা ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং প্রতিযোগিতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।”
উয়েফার মতে, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের জন্য একটি নজির তৈরি করলো। এখন একই ধরনের ঘটনায় অন্য দেশগুলোর খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও সমান সুবিধা দেওয়ার দাবি উঠতে পারে, যা পুরো প্রতিযোগিতাকেই প্রভাবিত করবে।
ট্রাম্পের ফোনকল ঘিরে বিতর্ক
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ফোন করে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করেন। এরপরই ফিফা শাস্তি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
রবিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লিখেছেন, “মহান একটি অবিচার সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।”
এই ঘটনায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
বেলজিয়ামের আপত্তি
বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (আরবিএফএ) জানিয়েছে, তারা বালোগুনের ম্যাচ খেলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করবে।
দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাক্সিম প্রেভো বলেন, “যদি সত্যিই একটি ফোনকলের কারণেই এই সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তাহলে এটি ফুটবল ও ক্রীড়ার মৌলিক নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।”
বেলজিয়ামের প্রধান কোচ রুডি গার্সিয়াও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “মনে হচ্ছে ৫ জুলাই নয়, আজ যেন ১ এপ্রিল- এপ্রিল ফুল দিবস চলছে। আমরা শুধু জাতীয় দলকে নয়, পুরো ফুটবলকেই রক্ষা করার চেষ্টা করছি।”
আরবিএফএর অভিযোগ, তারা সিদ্ধান্তের লিখিত কপি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং প্রযোজ্য বিধিমালা জানতে চাইলেও ফিফা সন্তোষজনক কোনও ব্যাখ্যা দেয়নি।
তাদের দাবি, ব্যাখ্যা দেওয়ার পরিবর্তে ফিফা উল্টো বিষয়টিকে আপিল হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত তা অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করেছে।
বেলজিয়াম ফুটবল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ন্যায্য প্রতিযোগিতা, নৈতিকতা এবং ফুটবলের স্বার্থ রক্ষায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাবে।
রাজনীতির খেলার মাঠ হতে পারে না ফুটবল
ফিফার সাবেক সভাপতি সেপ ব্লাটারও এ ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, “রাজনৈতিক ফোনকলের মাধ্যমে লাল কার্ড বাতিল হয় না। এটি বাতিল হয় নিয়ম, প্রমাণ এবং স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কোনও দেশের প্রেসিডেন্ট ফিফা সভাপতির সঙ্গে কথা বলার পর বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচের আগে একজন খেলোয়াড়ের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- ফিফা কোথায় যাচ্ছে?”
ব্লাটারের মন্তব্য, “ফুটবল কখনওই রাজনৈতিক ক্ষমতার খেলাঘর হতে পারে না।”
ক্রীড়া সিদ্ধান্তে রাজনীতির স্থান নেই
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রীড়াবিষয়ক কমিশনার গ্লেন মিকালেফও বলেন, ক্রীড়া-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ক্রীড়া সংস্থাগুলোরই নেওয়া উচিত, রাজনীতিবিদদের নয়।
তার মতে, রাজনৈতিক প্রভাব খেলার স্বায়ত্তশাসনকে দুর্বল করে দেয় এবং ক্রীড়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়।
থমাস টুখেলের প্রশ্ন- শেষ কোথায়?
ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ থমাস টুখেলও ফিফার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচে ইংল্যান্ডের ডিফেন্ডার জারেল কোয়ানসাহ লাল কার্ড দেখার পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনিও কি এখন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন করবেন?
জবাবে টুখেল বলেন, “এটার শুরু কোথায়, শেষই বা কোথায়? এখন কি প্রতিটি লাল বা হলুদ কার্ড নিয়েই আপিল হবে? সীমারেখা কোথায় টানা হবে?”
তিনি বলেন, “আমরা শুধু চাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধারাবাহিকতা থাকুক।”
টুখেলের মতে, বালোগুনের লাল কার্ডটি ব্যক্তিগতভাবে তার কাছে সঠিক সিদ্ধান্ত মনে না হলেও ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), রেফারি এবং ম্যাচ কর্মকর্তারা পর্যালোচনা করে যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তখন পরে সেটি কে, কীভাবে এবং কোন ভিত্তিতে পরিবর্তন করলো- সেটাই বড় প্রশ্ন।
তিনি আরও বলেন, “যদি এখন একটি সিদ্ধান্ত এভাবে বদলে যায়, তাহলে অন্য সব বিতর্কিত হলুদ বা লাল কার্ড নিয়েও একই দাবি উঠবে।”
ফিফার অবস্থান
বিশ্বকাপে রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ১৩ জন ফুটবলার লাল কার্ড দেখেছেন। বালোগুন ছাড়া বাকি ১২ জনই পরবর্তী ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা ভোগ করেছেন।
ফিফা তাদের শৃঙ্খলা বিধির একটি ধারা ব্যবহার করে বালোগুনের শাস্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ওই ধারায় শাস্তি পুরোপুরি বা আংশিকভাবে স্থগিত করার সুযোগ রয়েছে।
তবে সমালোচকদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত বিশ্বকাপের নিজস্ব বিধিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ টুর্নামেন্টের নিয়মে স্পষ্টভাবে বলা আছে, কোনও খেলোয়াড় লাল কার্ড পেলে তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলের পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকবেন।
এদিকে, ফিফা যদি তাদের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে, তাহলে বেলজিয়াম চাইলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সালিশি আদালত (সিএএস)-এর বিশ্বকাপকালীন বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যেতে পারবে।
ফলে বালোগুনকে ঘিরে বিতর্ক এখন শুধু একটি লাল কার্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ফুটবলের ন্যায্যতা, নিয়মের প্রয়োগ এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের প্রশ্নে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সূত্র: বিবিসি

























