ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ নিয়ে বিশ্বকাপে তীব্র বিতর্ক, প্রশ্নের মুখে ফিফা
- প্রকাশের সময় : ০৪:২৯:৪১ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
- / 6
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম ২৪ দিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রভাব থেকে অনেকটাই মুক্ত ছিল। কিন্তু নকআউট পর্ব শুরুর আগমুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি হস্তক্ষেপ পুরো টুর্নামেন্টকে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ফরোয়ার্ড ও দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা ফলারিন বালোগুন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে লাল কার্ড দেখে এক ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। ফলে বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তার খেলার সুযোগ ছিল না। তবে রবিবার ফিফা হঠাৎ করেই সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দেয়, যার ফলে সোমবার সিয়াটলে অনুষ্ঠিতব্য ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ পান বালোগুন।
এই সিদ্ধান্তের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, “যা সঠিক ছিল তা করার জন্য এবং একটি বড় অবিচার সংশোধন করার জন্য ফিফাকে ধন্যবাদ।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পরই বিশ্ব ফুটবলজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে- ফিফার সিদ্ধান্ত কি কেবল নিয়মের ভিত্তিতেই হয়েছে, নাকি এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে?
ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বালোগুনের লাল কার্ডের পর ট্রাম্প সরাসরি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলেন এবং সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।
এরপরই ফিফা শাস্তি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। যদিও সংস্থাটি খুব সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, তাদের শৃঙ্খলা কমিটি শৃঙ্খলাবিধির ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে।
এই ধারার আওতায় কোনও শাস্তি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত রাখা যায়। অর্থাৎ বালোগুনের লাল কার্ড বহাল থাকলেও আপাতত এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। তবে ভবিষ্যতে তিনি আবার শৃঙ্খলাভঙ্গ করলে আগের স্থগিত শাস্তিও কার্যকর হবে এবং নতুন শাস্তিও যোগ হতে পারে।
ফিফা অতীতেও একই ধারা ব্যবহার করেছিল। পর্তুগালের সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ক্ষেত্রেও বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে লাল কার্ড পাওয়ার পর একই ধরনের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তখনও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছিল।
বেলজিয়ামের তীব্র আপত্তি
ফিফার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ হয়েছে বেলজিয়াম ফুটবল ফেডারেশন। সংস্থাটির অভিযোগ, ম্যাচের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত ফিফার নিজস্ব নীতিমালা ও ‘ফেয়ার প্লে’র পরিপন্থী।
বেলজিয়ামের জাতীয় দলের কোচ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা শুধু দেশের সম্মান রক্ষার জন্য নয়, ফুটবলের স্বার্থেই বিষয়টির বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি। এটি ফুটবলের সততা, নৈতিকতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন।”
বিশ্লেষকদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র এই ম্যাচে জয় পায়, তাহলে বিশ্বের অনেক ফুটবল সমর্থকের চোখে সেই জয়ের ওপর বিতর্কের ছায়া থেকেই যাবে।
লাল কার্ড নিয়ে আগে থেকেই ছিল বিতর্ক
বসনিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমে রেফারি বালোগুনকে লাল কার্ড দেখাননি। পরে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির পরামর্শে ভিডিও দেখে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।
ধীরগতির রিপ্লেতে দেখা যায়, বালোগুনের পা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের পায়ের পেছনে আঘাত করে এবং তার গোড়ালি অস্বাভাবিকভাবে বেঁকে যায়।
তবে অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকের দাবি, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিল না। তাদের মতে, স্বাভাবিক গতিতে ঘটনাটি গুরুতর মনে না হলেও স্লো-মোশন রিপ্লে বিষয়টিকে অনেক বেশি ভয়াবহ করে তুলেছে।
অন্যদিকে অনেক সাবেক রেফারি মনে করেন, বর্তমান ফিফা নির্দেশিকা অনুযায়ী এমন ট্যাকলের জন্য লাল কার্ড দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতেও একই ধরনের চ্যালেঞ্জে নিয়মিত লাল কার্ড দেওয়া হয়।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, একই ধরনের ট্যাকল করেও আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি শাস্তি এড়িয়ে গেলেন, অথচ বালোগুন লাল কার্ড পেলেন কেন?
ব্যাখ্যার অভাবে বাড়ছে সন্দেহ
বিতর্ক আরও বেড়েছে কারণ ম্যাচের পর ফিফা প্রথমে স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনও সুযোগ নেই এবং বালোগুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে খেলতে পারবেন না।
কিন্তু মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে অবস্থান পরিবর্তন করে নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। অথচ এর পক্ষে বিস্তারিত কোনও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ফলে অনেকের ধারণা, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপই সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে। যদিও ফিফা বা ট্রাম্প- কেউই সরাসরি এমন দাবি স্বীকার করেনি।
ট্রাম্পের জন্য বিশ্বকাপও রাজনৈতিক মঞ্চ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসর ট্রাম্পের জন্য সবসময়ই বড় একটি প্রচারের সুযোগ।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পুরুষ আইস হকি দলের অলিম্পিক জয়কে নিজের নেতৃত্বের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন তিনি। এবারও বিশ্বকাপের ঘটনায় হস্তক্ষেপ করে তিনি নিজেকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষাকারী নেতা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছেন বলে মত বিশ্লেষকদের।
সিএনএনের এক সূত্রের দাবি, বালোগুনের লাল কার্ডের পর ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান।
ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ইনফান্তিনোকে প্রায়ই ট্রাম্পের পাশে দেখা গেছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভিষেক উপলক্ষে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, “আমরা শুধু আমেরিকাকেই নয়, পুরো বিশ্বকেই আবার মহান করে তুলব।”
এর আগে কাতার বিশ্বকাপকে ঘিরে মানবাধিকার বিতর্ক, ২০৩৪ সালের বিশ্বকাপ সৌদি আরবকে দেওয়া এবং ট্রাম্পকে ফিফার ‘পিস প্রাইজ’ প্রদান- এসব সিদ্ধান্ত নিয়েও ইনফান্তিনো ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
অবশ্য ইনফান্তিনোর যুক্তি, বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের নেতার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা ফিফা সভাপতির দায়িত্বের অংশ।
নতুন নজির নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ফুটবল বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বালোগুনের ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য একটি বিতর্কিত নজির তৈরি করলো।
এখন প্রশ্ন উঠছে- বিশ্বের অন্য কোনও প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেতাও কি ভবিষ্যতে নিজেদের দলের খেলোয়াড়দের পক্ষে একইভাবে ফিফার ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করবেন?
এছাড়া বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে যেকোনও বিতর্কিত লাল কার্ড বা শাস্তির সিদ্ধান্ত এখন আরও বেশি নজরদারির মধ্যে থাকবে। যদি বালোগুনের ক্ষেত্রে শাস্তি স্থগিত করা সম্ভব হয়, তাহলে অন্য দেশগুলোর খেলোয়াড়দের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুযোগ দেওয়ার দাবি উঠতে পারে।
অন্য বড় খবরকেও ছাপিয়ে গেল বিতর্ক
রবিবার বিশ্বকাপে আরেকটি বড় ঘটনা ছিল ব্রাজিলের বিদায়। নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার এরলিং হলান্ডের জোড়া গোলে ব্রাজিল টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়।
কিন্তু সেই বড় ঘটনাকেও ছাপিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ এবং বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি মাঠের বাইরের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও এখন প্রশ্ন উঠছে। এমন পরিস্থিতি এমন এক বিশ্বকাপের জন্য হতাশাজনক, যা শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে অনেকটাই দূরে থাকতে পেরেছিল। সূত্র: সিএনএন

























