শার্শায় আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার শাহিনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি
- প্রকাশের সময় : ০৮:৪৭:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২১ জুন ২০২৬
- / 1
যশোরের শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি, জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি, দলিল নিবন্ধনে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচিত সাব-রেজিস্ট্রার মো. শাহিন আলমকে অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার নিবন্ধন অধিদপ্তরের টেলিফোনিক নির্দেশনার পর জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয় এ সিদ্ধান্ত নেয়। রোববার জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব স্বাক্ষরিত এক দাপ্তরিক আদেশে শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অতিরিক্ত দায়িত্ব থেকে শাহিন আলমকে অবিলম্বে অব্যাহতি দেওয়ার কথা জানানো হয়।
আদেশে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিবন্ধন অধিদপ্তরের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, শার্শা উপজেলার গোগা ইউনিয়নের সেতাই গ্রামের ৪৪ শতক সরকারি খাস জমি ভুয়া খতিয়ান তৈরি করে ব্যক্তি মালিকানাধীন হিসেবে রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এ ঘটনায় দলিল লেখক ও একটি প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে সরকারি সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
জমির ক্রেতা আফসার আলী দাবি করেন, তিনি প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকায় জমিটি কিনলেও পরে জানতে পারেন সেটি সরকারি খাস জমি।
এছাড়া জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে কমমূল্যে দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি সপ্তাহে গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০টি দলিল নিবন্ধিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দলিলে জমির প্রকৃত শ্রেণি পরিবর্তন করে কম মূল্য দেখানো হয়, ফলে সরকার স্ট্যাম্প ডিউটি, নিবন্ধন ফি ও কর বাবদ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে।
২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সম্পাদিত কয়েকটি দলিল পর্যালোচনায় জমির প্রকৃত মূল্য গোপন করার তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাত্র একটি দিনের কয়েকটি দলিলেই প্রায় ৪৯ লাখ টাকার মূল্য কম দেখানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এমন অনিয়ম চলতে থাকলে রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অভিযোগ রয়েছে, গত প্রায় ১৫ মাসে অর্ধশতাধিক সরকারি খাস জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি দানপত্র, হেবা, ওয়ারিশসূত্রে মালিকানা হস্তান্তর, বিনিময় ও ভ্রম সংশোধন দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, দানপত্র ও হেবা ঘোষণাপত্র নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রতি শতক জমির জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিনিময় ও ভ্রম সংশোধন দলিলের ক্ষেত্রে ৫০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে গেলে একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি গণমাধ্যমকর্মীদের তথ্য সংগ্রহেও বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
শাহিন আলম ২০২৫ সালের ৩ মার্চ ঝিকরগাছা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগদান করেন। পরে তিনি শার্শা, চৌগাছা ও বাঘারপাড়া উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পান। একসঙ্গে চারটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের দায়িত্ব পালন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন উঠেছিল।
এদিকে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও দুর্নীতির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগ বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গোগা ইউনিয়নের বাসিন্দা নুরুল হুদা বলেন, “সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারি ফি-এর বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা চাই।”
শার্শা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আলম বাবু বলেন, “খাস জমি রেজিস্ট্রি ও জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত ছিল। দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাব-রেজিস্ট্রার শাহিন আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
জেলা রেজিস্ট্রার মুহাম্মদ আবু তালেব বলেন, শার্শা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, “সরকারি খাস জমি রাষ্ট্রের সম্পদ। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া ছাড়া এসব জমি হস্তান্তরের সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”





















