Dhaka ০২:১০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
জাবিতে রাজবাড়ী জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির নেতৃত্বে শ্রাবণী-রাফি কালীগঞ্জে রাশেদ খানের আগমন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা “মেয়েটি প্রথম যেদিন এখানে আসে, বিশ্বাস করিনি ওর বাচ্চা আছে…সে নিজেও একটা বাচ্চা।” ভারতের জেল থেকে মুক্ত ৫ বাংলাদেশি নারী, বেনাপোল দিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন NEWS24 টেলিভিশনের ১১ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে পাংশায় কেক কাটা ও আলোচনা সভা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬.৪৫ বিলিয়ন ডলার ৫ হাজার কোটি টাকা আয়, নোলানের ‘দ্য অডিসি’তে মুগ্ধ সিনেমাপ্রেমীরা সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্ভুল অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনা বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৫৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ সিরাজদিখানে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মোবাইল নিষিদ্ধ

রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার: নৈতিক দায়িত্ব ও সতর্কতার প্রশ্ন

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৭:২৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 327

ধর্ম মানুষের নৈতিক জীবনবোধ ও আত্মিক অনুশাসনের পথপ্রদর্শক। আর রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা, ক্ষমতার কাঠামো ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—এই দুই ক্ষেত্র যখন নিজ নিজ সীমারেখা অতিক্রম করে একে অপরের ভেতরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবেশ করে, তখন বিভ্রান্তি ও অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি এক সময় ব্যক্তি, সমাজ এবং ধর্মীয় বিশ্বাস—তিনটির জন্যই সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় বক্তব্যের একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসকে নৈতিক অনুশাসনের পরিসর ছাড়িয়ে সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো পরকালের ধারণাকে দলীয় বক্তব্যের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জনমনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এতে একদিকে রাজনৈতিক শালীনতার প্রশ্ন ওঠে, অন্যদিকে ইসলামের সার্বজনীন শিক্ষা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে একজন আইনজীবীর প্রকাশ্য বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তিনি বলেন—“জান্নাতে যেতে চাইলে আমার আপনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।”
এই বক্তব্যকে নিছক আবেগের প্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ এতে জান্নাতের মতো ধর্মীয় মুক্তির ধারণাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার ইঙ্গিত রয়েছে। এখানেই কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—ধর্মীয় মুক্তি কি কোনো দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল? আল্লাহর রহমত কি মানুষের তৈরি কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর শর্তে সীমাবদ্ধ হতে পারে? একজন নাগরিকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কি পরকালীন ভয় বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়া উচিত?

ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার নতুন নয়। তবে প্রকাশ্যে জান্নাত ও জাহান্নামের ফয়সালাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ করে তোলা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের একটি চরম রূপ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এতে নাগরিকের স্বাধীন বিবেচনা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং ব্যক্তি ধীরে ধীরে যুক্তি ও বিবেচনার জায়গা থেকে সরে গিয়ে কেবল ভোটের অঙ্কে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এর ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা ও রাজনীতি—তিনটি ক্ষেত্রই এক ধরনের জটিলতার মুখে পড়ে।

এই ধরনের বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখাও কঠিন। কারণ বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের ধারণার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। এতে বোঝা যায়, এটি কেবল ব্যক্তিগত মত নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতিফলনও হতে পারে। এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—ধর্মের নামে কিছু বলা হলেই তা কি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যাচ্ছে? নাকি সমাজে যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে? ধর্মপ্রাণ মানুষের একাংশের নীরবতাও এখানে ভাবনার বিষয়, কারণ নীরবতা অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকে প্রশ্রয় দেয়।

একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণ করা প্রয়োজন। এই ভূখণ্ডে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্মের আগেও মুসলমান সমাজ ধর্মচর্চা করত। তারা নামাজ আদায় করত, রোজা রাখত, যাকাত দিত, হজ পালন করত এবং ন্যায়-অন্যায়ের বোধ নিয়ে জীবন পরিচালনা করত। তখন কি তাদের ঈমান প্রশ্নবিদ্ধ ছিল? তারা কি ধর্মীয় মুক্তি থেকে বঞ্চিত ছিলেন?
এই প্রশ্ন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বহু মুসলিম-প্রধান দেশে কিংবা সংখ্যালঘু মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নেই। তবু সেখানে কোটি কোটি মুসলমান ঈমান ও ইবাদতের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মুসলমান সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা স্বাধীনভাবেই পালন করেন। সেখানে জান্নাত লাভের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া শর্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয় না।

এই যুক্তির ধারাবাহিকতায় ভারত ভূখণ্ডের প্রসঙ্গও সামনে আসে। বিরূপ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও সেখানে কোটি কোটি মুসলমান ঈমান নিয়ে টিকে আছেন। তারা নামাজ আদায় করেন, রোজা রাখেন, যাকাত দেন এবং সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় বড় করেন। অথচ সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নেই কিংবা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় রাজনীতি প্রকাশ্যে পরিচালনার সুযোগও সীমিত। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এই মুসলমানদের ঈমান ও ধর্মীয় মুক্তি কীভাবে মূল্যায়িত হবে? কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের অভাবে কি তারা জান্নাতের আশা থেকে বঞ্চিত হবেন?

এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ালেই স্পষ্ট হয়—ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট দল, রাষ্ট্র বা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম ব্যক্তি ও তার স্রষ্টার সম্পর্কের বিষয়। আল্লাহর রহমত অসীম, এবং তা মানুষের তৈরি কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা যায় না—এটাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।

এই আলোচনার সঙ্গে আরেকটি প্রসঙ্গ যুক্ত হয়েছে। একটি নির্বাচনী বক্তব্যে রোজা ও পূজাকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় একই প্রসঙ্গে আনা হয়। আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির ভাষ্য হিসেবে এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যা থাকলেও মনে রাখতে হবে—ইসলাম তাওহিদভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র ধর্ম, যার বিশ্বাস ও উপাসনা-পদ্ধতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য অস্পষ্ট হলে আকিদাগত বিভ্রান্তির ঝুঁকি তৈরি হয়।
একদিকে জান্নাতকে দলীয় শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা, অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে অস্পষ্টতা তৈরি—দুটিই ধর্মকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বানানোর ভিন্ন রূপ। উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকিটি এক—ধর্ম তার নৈতিক ও আত্মিক অবস্থান হারিয়ে ক্ষমতার ভাষায় রূপ নিতে পারে।
জান্নাত কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যপদে নির্ধারিত হয় না। ইসলাম কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার নয়। এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই আজ সময়ের দাবি। প্রশ্ন তোলা বিভ্রান্তি তৈরির জন্য নয়; বরং ঈমানি সচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্বের অংশ। কারণ ইসলাম নিজেই মানুষকে চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানায়। ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার অর্থই হলো—কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে এর অপব্যবহার না হতে দেওয়া। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কাউকেই দেয় না।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফরিদপুর সিটি কলেজ

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার: নৈতিক দায়িত্ব ও সতর্কতার প্রশ্ন

প্রকাশের সময় : ০৭:২৯:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

ধর্ম মানুষের নৈতিক জীবনবোধ ও আত্মিক অনুশাসনের পথপ্রদর্শক। আর রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা, ক্ষমতার কাঠামো ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়—এই দুই ক্ষেত্র যখন নিজ নিজ সীমারেখা অতিক্রম করে একে অপরের ভেতরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্রবেশ করে, তখন বিভ্রান্তি ও অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ঝুঁকি এক সময় ব্যক্তি, সমাজ এবং ধর্মীয় বিশ্বাস—তিনটির জন্যই সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় বক্তব্যের একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিশ্বাসকে নৈতিক অনুশাসনের পরিসর ছাড়িয়ে সরাসরি রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে জান্নাত ও জাহান্নামের মতো পরকালের ধারণাকে দলীয় বক্তব্যের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জনমনোযোগ আকর্ষণ করেছে। এতে একদিকে রাজনৈতিক শালীনতার প্রশ্ন ওঠে, অন্যদিকে ইসলামের সার্বজনীন শিক্ষা নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।

এই প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে একজন আইনজীবীর প্রকাশ্য বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। তিনি বলেন—“জান্নাতে যেতে চাইলে আমার আপনার একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।”
এই বক্তব্যকে নিছক আবেগের প্রকাশ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ এতে জান্নাতের মতো ধর্মীয় মুক্তির ধারণাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার ইঙ্গিত রয়েছে। এখানেই কিছু মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—ধর্মীয় মুক্তি কি কোনো দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভরশীল? আল্লাহর রহমত কি মানুষের তৈরি কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর শর্তে সীমাবদ্ধ হতে পারে? একজন নাগরিকের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত কি পরকালীন ভয় বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়া উচিত?

ভোটের রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগের ব্যবহার নতুন নয়। তবে প্রকাশ্যে জান্নাত ও জাহান্নামের ফয়সালাকে রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ করে তোলা ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের একটি চরম রূপ হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে। এতে নাগরিকের স্বাধীন বিবেচনা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয় এবং ব্যক্তি ধীরে ধীরে যুক্তি ও বিবেচনার জায়গা থেকে সরে গিয়ে কেবল ভোটের অঙ্কে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। এর ফলে ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিকতা ও রাজনীতি—তিনটি ক্ষেত্রই এক ধরনের জটিলতার মুখে পড়ে।

এই ধরনের বক্তব্যকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখাও কঠিন। কারণ বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের ধারণার পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করা গেছে। এতে বোঝা যায়, এটি কেবল ব্যক্তিগত মত নয়; বরং একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মানসিকতার প্রতিফলনও হতে পারে। এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—ধর্মের নামে কিছু বলা হলেই তা কি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে চলে যাচ্ছে? নাকি সমাজে যুক্তিনির্ভর প্রশ্ন ও আত্মসমালোচনার সংস্কৃতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে? ধর্মপ্রাণ মানুষের একাংশের নীরবতাও এখানে ভাবনার বিষয়, কারণ নীরবতা অনেক সময় অনিচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তিকে প্রশ্রয় দেয়।

একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা স্মরণ করা প্রয়োজন। এই ভূখণ্ডে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের জন্মের আগেও মুসলমান সমাজ ধর্মচর্চা করত। তারা নামাজ আদায় করত, রোজা রাখত, যাকাত দিত, হজ পালন করত এবং ন্যায়-অন্যায়ের বোধ নিয়ে জীবন পরিচালনা করত। তখন কি তাদের ঈমান প্রশ্নবিদ্ধ ছিল? তারা কি ধর্মীয় মুক্তি থেকে বঞ্চিত ছিলেন?
এই প্রশ্ন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বহু মুসলিম-প্রধান দেশে কিংবা সংখ্যালঘু মুসলমান অধ্যুষিত রাষ্ট্রগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নেই। তবু সেখানে কোটি কোটি মুসলমান ঈমান ও ইবাদতের সঙ্গে জীবনযাপন করছেন। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে মুসলমান সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা স্বাধীনভাবেই পালন করেন। সেখানে জান্নাত লাভের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া শর্ত হিসেবে উপস্থাপিত হয় না।

এই যুক্তির ধারাবাহিকতায় ভারত ভূখণ্ডের প্রসঙ্গও সামনে আসে। বিরূপ রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেও সেখানে কোটি কোটি মুসলমান ঈমান নিয়ে টিকে আছেন। তারা নামাজ আদায় করেন, রোজা রাখেন, যাকাত দেন এবং সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষায় বড় করেন। অথচ সেখানে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল নেই কিংবা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় রাজনীতি প্রকাশ্যে পরিচালনার সুযোগও সীমিত। তাহলে প্রশ্ন ওঠে—এই মুসলমানদের ঈমান ও ধর্মীয় মুক্তি কীভাবে মূল্যায়িত হবে? কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের অভাবে কি তারা জান্নাতের আশা থেকে বঞ্চিত হবেন?

এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়ালেই স্পষ্ট হয়—ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট দল, রাষ্ট্র বা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম ব্যক্তি ও তার স্রষ্টার সম্পর্কের বিষয়। আল্লাহর রহমত অসীম, এবং তা মানুষের তৈরি কোনো রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করা যায় না—এটাই ইসলামের মৌলিক শিক্ষা।

এই আলোচনার সঙ্গে আরেকটি প্রসঙ্গ যুক্ত হয়েছে। একটি নির্বাচনী বক্তব্যে রোজা ও পূজাকে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় একই প্রসঙ্গে আনা হয়। আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির ভাষ্য হিসেবে এমন বক্তব্যের ব্যাখ্যা থাকলেও মনে রাখতে হবে—ইসলাম তাওহিদভিত্তিক একটি স্বতন্ত্র ধর্ম, যার বিশ্বাস ও উপাসনা-পদ্ধতির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য অস্পষ্ট হলে আকিদাগত বিভ্রান্তির ঝুঁকি তৈরি হয়।
একদিকে জান্নাতকে দলীয় শর্তের সঙ্গে যুক্ত করা, অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে অস্পষ্টতা তৈরি—দুটিই ধর্মকে রাজনৈতিক কৌশলের অংশ বানানোর ভিন্ন রূপ। উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকিটি এক—ধর্ম তার নৈতিক ও আত্মিক অবস্থান হারিয়ে ক্ষমতার ভাষায় রূপ নিতে পারে।
জান্নাত কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্যপদে নির্ধারিত হয় না। ইসলাম কোনো রাজনৈতিক ইশতেহার নয়। এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেওয়াই আজ সময়ের দাবি। প্রশ্ন তোলা বিভ্রান্তি তৈরির জন্য নয়; বরং ঈমানি সচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্বের অংশ। কারণ ইসলাম নিজেই মানুষকে চিন্তা-ভাবনা ও জ্ঞান অর্জনের আহ্বান জানায়। ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার অর্থই হলো—কোনো রাজনৈতিক স্বার্থে এর অপব্যবহার না হতে দেওয়া। এই দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কাউকেই দেয় না।

 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফরিদপুর সিটি কলেজ