Dhaka ০২:১১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
জাবিতে রাজবাড়ী জেলা ছাত্রকল্যাণ সমিতির নেতৃত্বে শ্রাবণী-রাফি কালীগঞ্জে রাশেদ খানের আগমন উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা “মেয়েটি প্রথম যেদিন এখানে আসে, বিশ্বাস করিনি ওর বাচ্চা আছে…সে নিজেও একটা বাচ্চা।” ভারতের জেল থেকে মুক্ত ৫ বাংলাদেশি নারী, বেনাপোল দিয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন NEWS24 টেলিভিশনের ১১ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে পাংশায় কেক কাটা ও আলোচনা সভা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬.৪৫ বিলিয়ন ডলার ৫ হাজার কোটি টাকা আয়, নোলানের ‘দ্য অডিসি’তে মুগ্ধ সিনেমাপ্রেমীরা সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্ভুল অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনা বেনাপোল সীমান্তে বিজিবির অভিযানে ৫৩ বোতল বিদেশি মদ জব্দ সিরাজদিখানে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের মোবাইল নিষিদ্ধ

একটি জাতিকে নিঃশব্দে হত্যা করার নীলনকশা

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৭:২২:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 279

নিশ্ছিদ্র রাত। নিস্তব্ধ একটি দরজা। হঠাৎ ভেঙে পড়া নীরবতা—“ঠক! ঠক!! ঠক!!! স্যার, একটু বাইরে আসুন—কথা আছে।”
এই কয়েকটি শব্দ কোনো সাধারণ ডাক ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত গুলোর একটি—একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ডাক। সেই রাতেই শব্দগুলো রূপ নিয়েছিল বন্দুকের নীরব আওয়াজে, আর একের পর এক নিভে গিয়েছিল আলোর প্রদীপ। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল মৃত্যু, আর ভেতরে ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের চিন্তা, বিবেক ও সম্ভাবনা।
এই ডাকের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশা—অস্ত্র দিয়ে নয়, চিন্তা হত্যার মাধ্যমে একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। এমন এক ক্ষত, যার রক্তক্ষরণ থামেনি আজও—পাঁচ দশক পেরিয়েও।
ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শহর আবার গড়ে ওঠে। ভাঙা সেতু, পোড়া ঘর, লুট হওয়া সম্পদ—সবকিছুই একসময় পুনর্গঠন সম্ভব। কিন্তু একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড একবার ভেঙে গেলে, তা আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর, বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের মুখে দাঁড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, সেটি ছিল কেবল কিছু মানুষের প্রাণনাশ নয়—এটি ছিল একটি জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা, বিবেক ও নেতৃত্বকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।
১৪ ডিসেম্বর, আলবদরুরাজাকারদের হাতে শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসক, গবেষক, চিন্তাবিদ—৯৯১ জন শিক্ষাবিদকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: জন্মের আগেই বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেওয়া। নির্মম সত্য হলো—এই ষড়যন্ত্র অনেকাংশেই সফল হয়েছিল। আর যে সামান্য অংশ অসম্পূর্ণ ছিল, স্বাধীনতার পর আমরা নিজেরাই সেটি ধীরে ধীরে “সম্পন্ন” করেছি—উদাসীনতা, অবমূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার মাধ্যমে।
স্বাধীনতার পর এই শূন্যতা পূরণের জন্য কোনো আন্তরিক, সুদূরপ্রসারী জাতীয় উদ্যোগ ছিল—এ কথা জোর দিয়ে বলা কঠিন। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্যাপ আরও প্রশস্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর যে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশের বয়স যত বেড়েছে, সেই শূন্যতাও তত গভীর হয়েছে। আজ ১৮ কোটির জনসংখ্যার দেশে বুদ্ধিজীবীর ঘনত্ব হিসাব করলে তা দাঁড়ায় প্রায় শূন্যের কোঠায়—একটি ভয়াবহ, লজ্জাজনক বাস্তবতা।
এর প্রমাণ খুঁজতে খুব দূরে তাকাতে হয় না। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সূচকে বাংলাদেশ শুধু বিশ্ব পরিসরেই নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও তলানির দিকে অবস্থান করছে। কোন ধরনের বই এই দেশে বেস্টসেলার হয়? কোন ধরনের মানুষ রাতারাতি “ইনফ্লুয়েন্সার” হয়ে ওঠে? চিন্তা, গবেষণা ও মননচর্চার বদলে আমরা উৎসাহ দিচ্ছি চটকদারতা, ফাঁপা জনপ্রিয়তা আর তাৎক্ষণিক বাহবা পাওয়ার সংস্কৃতিকে।
অর্থ পাচারের কথা আমরা প্রায়ই বলি—লক্ষ হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আরও ভয়ংকর একটি পাচার আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়: মেধা পাচার। এই দেশের মানুষের করের টাকায় গড়ে ওঠা কত অসাধারণ মেধা প্রতিনিয়ত দেশ ছেড়ে যাচ্ছে—সেই হিসাব কি আমরা কখনো করি? গবেষক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদরা টিকে থাকার পরিবেশ না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল।
সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যেন এই দেশে কোনো শক্তিশালী বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গড়ে উঠতে না পারে। প্রশ্নকারী মানুষ এখানে অস্বস্তিকর, চিন্তাশীল মানুষ সন্দেহজনক, আর স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান প্রায়শই শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। ফলে বুদ্ধিজীবী তৈরি হওয়ার আগেই তারা হয় নীরব হয়ে যায়, নয়তো দেশ ছেড়ে চলে যায়।
১৪ ডিসেম্বর তাই কেবল একটি শোকের দিন নয়; এটি একটি আত্ম সমালোচনার দিন। প্রশ্ন করার দিন—আমরা কি সত্যিই সেই অপূরণীয় ক্ষতির শিক্ষা নিয়েছি? নাকি এখনো নিঃশব্দে একটি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শূন্য করে দেওয়ার সেই পুরোনো নীলনকশাকেই বহন করে চলেছি?
যতদিন না আমরা চিন্তাকে মর্যাদা দিই, প্রশ্নকে নিরাপদ করি, আর বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিই—ততদিন এই জাতির দরজায় সেই ভয়ংকর “ঠক! ঠক!! ঠক!!!” শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। শুধু দরজার বাইরে নয়—আমাদের ইতিহাস, বর্তমান আর ভবিষ্যতের বুকের ভেতর।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফরিদপুর সিটি কলেজ

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

একটি জাতিকে নিঃশব্দে হত্যা করার নীলনকশা

প্রকাশের সময় : ০৭:২২:২৪ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫

নিশ্ছিদ্র রাত। নিস্তব্ধ একটি দরজা। হঠাৎ ভেঙে পড়া নীরবতা—“ঠক! ঠক!! ঠক!!! স্যার, একটু বাইরে আসুন—কথা আছে।”
এই কয়েকটি শব্দ কোনো সাধারণ ডাক ছিল না। এটি ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত গুলোর একটি—একটি জাতির ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ডাক। সেই রাতেই শব্দগুলো রূপ নিয়েছিল বন্দুকের নীরব আওয়াজে, আর একের পর এক নিভে গিয়েছিল আলোর প্রদীপ। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল মৃত্যু, আর ভেতরে ছিল একটি নবজাত রাষ্ট্রের চিন্তা, বিবেক ও সম্ভাবনা।
এই ডাকের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল একটি সুপরিকল্পিত নীলনকশা—অস্ত্র দিয়ে নয়, চিন্তা হত্যার মাধ্যমে একটি জাতিকে দীর্ঘমেয়াদে পঙ্গু করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র। এমন এক ক্ষত, যার রক্তক্ষরণ থামেনি আজও—পাঁচ দশক পেরিয়েও।
ইতিহাস আমাদের বারবার দেখিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শহর আবার গড়ে ওঠে। ভাঙা সেতু, পোড়া ঘর, লুট হওয়া সম্পদ—সবকিছুই একসময় পুনর্গঠন সম্ভব। কিন্তু একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড একবার ভেঙে গেলে, তা আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর, বিজয়ের ঠিক প্রাক্কালে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্মের মুখে দাঁড়িয়ে পরিকল্পিতভাবে যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, সেটি ছিল কেবল কিছু মানুষের প্রাণনাশ নয়—এটি ছিল একটি জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা, বিবেক ও নেতৃত্বকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।
১৪ ডিসেম্বর, আলবদরুরাজাকারদের হাতে শিক্ষক, লেখক, চিকিৎসক, গবেষক, চিন্তাবিদ—৯৯১ জন শিক্ষাবিদকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: জন্মের আগেই বাংলাদেশকে বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেওয়া। নির্মম সত্য হলো—এই ষড়যন্ত্র অনেকাংশেই সফল হয়েছিল। আর যে সামান্য অংশ অসম্পূর্ণ ছিল, স্বাধীনতার পর আমরা নিজেরাই সেটি ধীরে ধীরে “সম্পন্ন” করেছি—উদাসীনতা, অবমূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার মাধ্যমে।
স্বাধীনতার পর এই শূন্যতা পূরণের জন্য কোনো আন্তরিক, সুদূরপ্রসারী জাতীয় উদ্যোগ ছিল—এ কথা জোর দিয়ে বলা কঠিন। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই গ্যাপ আরও প্রশস্ত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর যে বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, বাংলাদেশের বয়স যত বেড়েছে, সেই শূন্যতাও তত গভীর হয়েছে। আজ ১৮ কোটির জনসংখ্যার দেশে বুদ্ধিজীবীর ঘনত্ব হিসাব করলে তা দাঁড়ায় প্রায় শূন্যের কোঠায়—একটি ভয়াবহ, লজ্জাজনক বাস্তবতা।
এর প্রমাণ খুঁজতে খুব দূরে তাকাতে হয় না। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও শিক্ষা, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সূচকে বাংলাদেশ শুধু বিশ্ব পরিসরেই নয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও তলানির দিকে অবস্থান করছে। কোন ধরনের বই এই দেশে বেস্টসেলার হয়? কোন ধরনের মানুষ রাতারাতি “ইনফ্লুয়েন্সার” হয়ে ওঠে? চিন্তা, গবেষণা ও মননচর্চার বদলে আমরা উৎসাহ দিচ্ছি চটকদারতা, ফাঁপা জনপ্রিয়তা আর তাৎক্ষণিক বাহবা পাওয়ার সংস্কৃতিকে।
অর্থ পাচারের কথা আমরা প্রায়ই বলি—লক্ষ হাজার কোটি টাকা প্রতিবছর দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আরও ভয়ংকর একটি পাচার আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়: মেধা পাচার। এই দেশের মানুষের করের টাকায় গড়ে ওঠা কত অসাধারণ মেধা প্রতিনিয়ত দেশ ছেড়ে যাচ্ছে—সেই হিসাব কি আমরা কখনো করি? গবেষক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদরা টিকে থাকার পরিবেশ না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ব্যর্থতার ফল।
সবচেয়ে ভয়ংকর সত্য হলো—গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থাই এমনভাবে নির্মিত হয়েছে যেন এই দেশে কোনো শক্তিশালী বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গড়ে উঠতে না পারে। প্রশ্নকারী মানুষ এখানে অস্বস্তিকর, চিন্তাশীল মানুষ সন্দেহজনক, আর স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান প্রায়শই শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত হয়। ফলে বুদ্ধিজীবী তৈরি হওয়ার আগেই তারা হয় নীরব হয়ে যায়, নয়তো দেশ ছেড়ে চলে যায়।
১৪ ডিসেম্বর তাই কেবল একটি শোকের দিন নয়; এটি একটি আত্ম সমালোচনার দিন। প্রশ্ন করার দিন—আমরা কি সত্যিই সেই অপূরণীয় ক্ষতির শিক্ষা নিয়েছি? নাকি এখনো নিঃশব্দে একটি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শূন্য করে দেওয়ার সেই পুরোনো নীলনকশাকেই বহন করে চলেছি?
যতদিন না আমরা চিন্তাকে মর্যাদা দিই, প্রশ্নকে নিরাপদ করি, আর বুদ্ধিবৃত্তিক সাহসকে রাষ্ট্রের সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দিই—ততদিন এই জাতির দরজায় সেই ভয়ংকর “ঠক! ঠক!! ঠক!!!” শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। শুধু দরজার বাইরে নয়—আমাদের ইতিহাস, বর্তমান আর ভবিষ্যতের বুকের ভেতর।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফরিদপুর সিটি কলেজ