বিশ্ব শিক্ষক দিবস ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
- প্রকাশের সময় : ০২:২৯:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ অক্টোবর ২০২৫
- / 436
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ১৯৬৬ সালের এই দিনে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর উদ্যোগে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তঃদেশীয় সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে শিক্ষকদের অধিকার, কর্তব্য ও মর্যাদা সম্পর্কিত একটি আন্তর্জাতিক দলিল স্বাক্ষরিত হয়। দলিলটি শিক্ষকদের পেশাগত মর্যাদা, দায়িত্ব, সামাজিক নিরাপত্তা ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার বৈশ্বিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে। ১৯৯৪ সাল থেকে ইউনেস্কোর উদ্যোগে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশেও দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়। কারণ শিক্ষক কেবল পাঠ্যক্রমের জ্ঞান প্রদান করেন না—তিনি শিক্ষার্থীর জীবনদর্শন গঠনে, নৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চারে এবং সামাজিক দায়বোধ জাগ্রত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একজন শিক্ষকই শিক্ষার্থীর মধ্যে আগামী দিনের বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, রাষ্ট্রনায়ক ও সমাজের আলোকিত মানুষ হয়ে ওঠার ভিত্তি স্থাপন করেন।
ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষকতা পেশাকে সম্মানজনক মর্যাদায় উন্নীত করা, প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা, নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, শিক্ষকের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এবং পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কার্যকর শিক্ষাদান ও শেখার পরিবেশ, শিক্ষক মূল্যায়ন, পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এরই অংশ। শিক্ষকের নৈতিক ও পেশাগত প্রভাব শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন ও দক্ষতা বিকাশে অপরিসীম ভূমিকা রাখে। এ কারণেই বিশ্ব শিক্ষক দিবসের মূল তাৎপর্য শিক্ষকের মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া।
প্রাথমিক শিক্ষার সংকট :
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বর্তমানে ১১তম গ্রেডে এবং সহকারী শিক্ষক ১৩তম গ্রেডে কর্মরত। ১৩তম গ্রেড অনেক ক্ষেত্রেই সরকারি অফিসের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর নিচে, যা শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। কিছু বিদ্যালয়ে মাত্র তিনজন শিক্ষক নিয়ে পুরো বছর ক্লাস পরিচালিত হচ্ছে। প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এখনও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান এখন সময়ের দাবি।
মাধ্যমিক শিক্ষার সমস্যা :
মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরাও নানা দিক থেকে ভোগান্তিতে আছেন। একজন শিক্ষককে প্রায়শই একাধিক বিষয় পড়াতে হয়, দিনে পাঁচ থেকে ছয়টি ক্লাস নিতে হয়—কখনও একটানা। এর সঙ্গে খাতা দেখা ও বিদ্যালয় পরিচালনার নানা দায়িত্বও যুক্ত থাকে। বিদ্যমান বেতন কাঠামো আরও হতাশাজনক—মূল বেতন মাত্র ১২,৫০০ টাকা, বাড়িভাড়া ১,০০০ টাকা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা—যা সরকারি ড্রাইভারের বেতনের চেয়েও কম। এমন সীমিত সুযোগ-সুবিধার কারণে যোগ্য তরুণরা শিক্ষকতা পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। শিক্ষার মান তলানিতে পৌঁছে গেছে—এটি জাতির জন্য এক অশনি সংকেত।
কলেজ শিক্ষকদের হতাশা :
বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা সাধারণত একটি মাত্র পদোন্নতির সুযোগ পান—প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক। সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক পদ সৃষ্টি না থাকায় দীর্ঘদিন চাকরিতে থেকেও অনেকেই প্রভাষক হিসেবেই থেকে যান। কেউ কেউ ২০–২৫ বছরেও পদোন্নতি পান না, আবার কেউ মাত্র আট বছর পরেই উন্নীত হন।পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক অনুপাত প্রথা প্রচলিত থাকায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক ‘অনুপাত প্রথা’ বাতিল করে চাকরির মেয়াদ অনুযায়ী পদোন্নতির ব্যবস্থা করা জরুরি।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী ডিগ্রি পাস কোর্স ও অনার্স কোর্সে নিয়োগপ্রাপ্ত অনেক শিক্ষক এখনও এমপিওভুক্ত হতে পারছেন না। পাশাপাশি বহু নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানও টিকে আছে। তাদের দ্রুত এমপিওভুক্ত করা প্রয়োজন। বেসরকারি মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কলেজের শিক্ষকগণ এনটিআরসির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হলেও সর্বজনীন বদলির সুযোগ না থাকায় ভোগান্তিতে রয়েছেন। বর্তমানে প্রায় ৫৮ হাজার শূন্যপদ বিদ্যমান, যা প্রমাণ করে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ দিন দিন কমছে।
শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী, বিদ্যমান তিনটি নীতিমালা বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। তাই একটি সর্বজনীন নীতিমালা প্রণয়ন করে সবাইকে এর আওতায় আনা জরুরি।
অবসর সুবিধা ও সামাজিক নিরাপত্তা :
দেশের প্রায় ৯৫-৯৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। সেই হিসেবে জাতি গঠনের মূল দায়িত্বও তাদের শিক্ষকদের কাঁধে। কিন্তু অবসর সুবিধার টাকা পেতে তাদের তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়—অনেকে জীবদ্দশায়ও তা পান না। অবসর গ্রহণের এক বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় সংস্কার :
কলেজের গভর্নিং বডি বা বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে একই ব্যক্তিকে দুইবারের বেশি নিয়োগ বন্ধ করা জরুরি। এসব কমিটিতে দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখেন এমন যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। বিশেষ করে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সভাপতি পদে নিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাচনী স্বার্থে ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই এ ধরনের নিয়োগ বন্ধ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদ্যোৎসাহী ও হিতৈষী সদস্য নির্বাচনেও শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিকভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শিক্ষা ক্যাডারের শিক্ষকগণ অন্যান্য ক্যাডারের তুলনায় এখনও অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাই তাদের বেতন, ভাতা ও মর্যাদা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় আনুগত্য নয়, বরং নির্মোহ, ত্যাগী, জ্ঞানী ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন শিক্ষকদের প্রাধান্য দিতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো শিক্ষাক্ষেত্রও দলীয় প্রভাবমুক্ত না হলে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।
শিক্ষা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা
শিক্ষা সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া—এর কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিক ও বাস্তবসম্মত ধারায় আনতে হলে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। শিক্ষক জাতির আলোকবর্তিকা; তাদের হাতেই গড়ে ওঠে আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্র। কিন্তু যদি শিক্ষক সামাজিক ও পেশাগতভাবে বঞ্চিত থাকেন, তবে জাতির অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হবে।
সমাধানের পথ :
শিক্ষক দিবস পালনই যথেষ্ট নয়; শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। দেশে প্রায় ৯৫–৯৭% শিক্ষা কার্যক্রম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তাই তাদের বর্তমান করুণ অবস্থাকে সামনে রেখে সরকারকে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
বিশেষভাবে, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে বাড়িভাড়া কমপক্ষে ২০% বৃদ্ধি করা উচিত, যাতে তাদের সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা যথাযথভাবে স্বীকৃত হয়। ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী, জিডিপির অন্তত ৬% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, ন্যায্য বেতন, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করলেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব। কারণ—
“শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, আর শিক্ষা বাঁচলেই বাঁচবে বাংলাদেশ।”
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ
ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর
Email: mmrrajbari71@gmail.com

























