Dhaka ১১:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
গ্রুপ পর্বে নেইমারকে পাচ্ছে না ব্রাজিল? যা বলছেন চিকিৎসকরা ঝিনাইদহে তিন দিনব্যাপী ফল মেলা শুরু দেশে ফেরানো ঠেকাতে দুবাইয়ে নিজের নামে মামলা করালেন বেনজীর! আর্জেন্টিনার রাজধানীতে বাংলাদেশের নামে সড়কের নামকরণের প্রস্তাব কাঁঠাল থেকে সিঙ্গারা-সমুচা-কাবাব, পুষ্টিগুণও অনেক বেশি : কৃষিমন্ত্রী এমপিরা ঋণখেলাপি নন, ‘ঋণগ্রস্ত’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কড়া জবাব দিলেন রুমিন শাহজালাল মাজারের দানবাক্স সিলগালা করলো প্রশাসন সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত শ্যোন অ্যারেস্ট মাকে সান্ত্বনা, শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চা খান হত্যাকারী চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চালু হচ্ছে দু’টি করে নতুন বিষয় : মাহদী আমিন

মাকে সান্ত্বনা, শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চা খান হত্যাকারী

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৮:১৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
  • / 7

দুই দিন ধরে একমাত্র সন্তানকে খুঁজে ফিরেছেন বাবা-মা। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি—কোথাও বাদ যায়নি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন তারা। সেই খোঁজাখুঁজির দলে ছিলেন এক প্রতিবেশীও। তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন, খোঁজ করেছেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার অভিনয় করেছেন। এমনকি সন্তানের শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চাও পান করেছেন। অথচ পরিবারের কেউ জানত না, যাকে তারা ভরসা করে পাশে পেয়েছেন, সেই মানুষটিই লুকিয়ে রেখেছেন তাদের বুকের ধনের মৃত্যুর রহস্য।

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্বপাড়ার পাঁচ বছরের শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেরিয়ে আসা এসব তথ্য শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারাও।

বৃহস্পতিবার সকালে জায়হানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। ছোট্ট শিশুটির বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও সহমর্মী মানুষের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিতে এসেছেন, কেউ এসেছেন পরিবারের কান্না ভাগ করে নিতে।

জায়হানের মা জোবাইদা আক্তার মুক্তা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটা আমাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারত না। ঘুমাতে গেলেও আমাকে পাশে লাগত। সেই ছেলেকে হত্যা করে দুই দিন বস্তার ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে।”

তিনি আরও বলেন, “১৫ বছর ধরে আমরা পাশাপাশি থাকি। কখনো ভাবিনি প্রতিবেশীরা এমন করতে পারে। আমি শুধু আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।”

মায়ের দাবি, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর খোঁজাখুঁজির সময় একবার তিনি একটি শিশুর কণ্ঠে ‘ও মা’ বলে ডাক শুনেছিলেন। তখন বিষয়টি গুরুত্ব না পেলেও এখন তার মনে হচ্ছে, হয়তো সেই ডাক ছিল তার সন্তানের শেষ আর্তনাদ।

পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার জায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর মুক্তিপণের দাবিতে একটি চিরকুট দেওয়া হয়েছিল। সেই চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়। তদন্তে উঠে আসে, পারিবারিক জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে।

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক জানান, অভিযুক্ত সাইফুদ্দিনের সঙ্গে তার চাচাতো ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে তিনি পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে হত্যা করে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, অভিযুক্তের মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহার হাতের লেখার সঙ্গে মুক্তিপণের চিরকুটের লেখার মিল পাওয়া যায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুরো এলাকায় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, পুকুরে জাল ফেলা হয়, ঝোপঝাড় তল্লাশি করা হয়। সেই খোঁজাখুঁজির সামনের সারিতেই ছিলেন অভিযুক্ত সাইফুদ্দিন।

স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, “তাকে দেখে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল তিনিও শিশুটির জন্য সমান উদ্বিগ্ন।”

প্রতিবেশী মামুনুর রশিদ বলেন, “আমরা সবাই মিলে খুঁজেছি। সাইফুদ্দিনও ছিল। সে যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।”

প্রায় ১৫ বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করছিল দুই পরিবার। সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে থেকেছে। সেই সম্পর্কের আড়ালেই যে এমন ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতা লুকিয়ে ছিল, তা কেউ ভাবতে পারেনি।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নুরুন্নবী নামের এক বৃদ্ধের কণ্ঠে তখনও বিস্ময়, “খুনি যদি অপরিচিত হতো, হয়তো এত কষ্ট লাগত না। কিন্তু যে মানুষ দুই দিন ধরে পরিবারের সঙ্গে ছিল, সেই মানুষই এমন কাজ করেছে—এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন।”

দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্বপাড়ার সরু গলিগুলোতে এখনো ভাসছে একটাই প্রশ্ন—শিশুটির অপরাধ কী ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় মিলবে। কিন্তু ছোট্ট জায়হানের শূন্যতা, মায়ের বুকফাটা কান্না আর বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াবে পটিয়ার মানুষ।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

মাকে সান্ত্বনা, শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চা খান হত্যাকারী

প্রকাশের সময় : ০৮:১৭:২৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬

দুই দিন ধরে একমাত্র সন্তানকে খুঁজে ফিরেছেন বাবা-মা। বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড়, ঝোপঝাড়, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি—কোথাও বাদ যায়নি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার আশায় মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন তারা। সেই খোঁজাখুঁজির দলে ছিলেন এক প্রতিবেশীও। তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন, খোঁজ করেছেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার অভিনয় করেছেন। এমনকি সন্তানের শোকে দিশেহারা বাবার পাশে বসে চাও পান করেছেন। অথচ পরিবারের কেউ জানত না, যাকে তারা ভরসা করে পাশে পেয়েছেন, সেই মানুষটিই লুকিয়ে রেখেছেন তাদের বুকের ধনের মৃত্যুর রহস্য।

চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভার দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্বপাড়ার পাঁচ বছরের শিশু জায়হান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেরিয়ে আসা এসব তথ্য শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকাকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিচিত প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগে হতবাক স্থানীয় বাসিন্দারাও।

বৃহস্পতিবার সকালে জায়হানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো পরিবেশ। ছোট্ট শিশুটির বাড়িতে স্বজন, প্রতিবেশী ও সহমর্মী মানুষের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিতে এসেছেন, কেউ এসেছেন পরিবারের কান্না ভাগ করে নিতে।

জায়হানের মা জোবাইদা আক্তার মুক্তা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলেটা আমাকে ছাড়া একদিনও থাকতে পারত না। ঘুমাতে গেলেও আমাকে পাশে লাগত। সেই ছেলেকে হত্যা করে দুই দিন বস্তার ভেতরে লুকিয়ে রেখেছে।”

তিনি আরও বলেন, “১৫ বছর ধরে আমরা পাশাপাশি থাকি। কখনো ভাবিনি প্রতিবেশীরা এমন করতে পারে। আমি শুধু আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।”

মায়ের দাবি, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর খোঁজাখুঁজির সময় একবার তিনি একটি শিশুর কণ্ঠে ‘ও মা’ বলে ডাক শুনেছিলেন। তখন বিষয়টি গুরুত্ব না পেলেও এখন তার মনে হচ্ছে, হয়তো সেই ডাক ছিল তার সন্তানের শেষ আর্তনাদ।

পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার জায়হান নিখোঁজ হওয়ার পর মুক্তিপণের দাবিতে একটি চিরকুট দেওয়া হয়েছিল। সেই চিরকুটের হাতের লেখার সূত্র ধরেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়। তদন্তে উঠে আসে, পারিবারিক জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রতিবেশী ও চাচাতো ভাইকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে শিশুটিকে হত্যা করা হয়েছে।

পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউল হক জানান, অভিযুক্ত সাইফুদ্দিনের সঙ্গে তার চাচাতো ভাইয়ের জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরে তিনি পরিকল্পিতভাবে শিশুটিকে হত্যা করে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেন।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, অভিযুক্তের মেয়ে সাদিয়া সুলতানা নিহার হাতের লেখার সঙ্গে মুক্তিপণের চিরকুটের লেখার মিল পাওয়া যায়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুরো এলাকায় ব্যাপক খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়, পুকুরে জাল ফেলা হয়, ঝোপঝাড় তল্লাশি করা হয়। সেই খোঁজাখুঁজির সামনের সারিতেই ছিলেন অভিযুক্ত সাইফুদ্দিন।

স্থানীয় বাসিন্দা মফিজুর রহমান বলেন, “তাকে দেখে সন্দেহ করার কোনো সুযোগ ছিল না। বরং মনে হচ্ছিল তিনিও শিশুটির জন্য সমান উদ্বিগ্ন।”

প্রতিবেশী মামুনুর রশিদ বলেন, “আমরা সবাই মিলে খুঁজেছি। সাইফুদ্দিনও ছিল। সে যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।”

প্রায় ১৫ বছর ধরে পাশাপাশি বসবাস করছিল দুই পরিবার। সুখ-দুঃখে একে অপরের পাশে থেকেছে। সেই সম্পর্কের আড়ালেই যে এমন ভয়ংকর বিশ্বাসঘাতকতা লুকিয়ে ছিল, তা কেউ ভাবতে পারেনি।

বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নুরুন্নবী নামের এক বৃদ্ধের কণ্ঠে তখনও বিস্ময়, “খুনি যদি অপরিচিত হতো, হয়তো এত কষ্ট লাগত না। কিন্তু যে মানুষ দুই দিন ধরে পরিবারের সঙ্গে ছিল, সেই মানুষই এমন কাজ করেছে—এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন।”

দক্ষিণ গোবিন্দারখীল পূর্বপাড়ার সরু গলিগুলোতে এখনো ভাসছে একটাই প্রশ্ন—শিশুটির অপরাধ কী ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় মিলবে। কিন্তু ছোট্ট জায়হানের শূন্যতা, মায়ের বুকফাটা কান্না আর বিশ্বাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের স্মৃতি দীর্ঘদিন বয়ে বেড়াবে পটিয়ার মানুষ।