Dhaka ০৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আদালতে একজনের স্বীকারোক্তী

পাম্প কর্মচারী রিপনকে গাড়িচাপায় হত্যার অভিযোগে সুজনসহ ২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৫৬:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 108

 রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় করিম ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী রিপন সাহাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মারার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক যুবদল নেতা আবুল হাসেম সুজনসহ দুইজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। সুজন রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামের জনাব আলীর ছেলে। মামলার অপর আসামি সুজনের সহযোগী কামাল হোসেন। সে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণিবহ ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামের আক্তার সরদারের ছেলে। গত শুক্রবার রাতে নিহতের ছোট ভাই প্রতাপ সাহা বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

নিহত রিপন রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর ইউনিয়নের চর খানখানাপুর গ্রামের পবিত্র সাহার ছেলে। সিসিটিভি ফুটেজে যাকে দেখা গেছে তিনি রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম সুজন। ঘটনার পরই পুলিশ সুজন ও তার সহযোগী কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস পাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে সুজন করিম ফিলিং স্টেশন থেকে পাঁচ হাজার টাকার অকটেন নেন। সে টাকা না দিয়ে কালক্ষেপন করতে থাকে। একপর্যায়ে টাকা না দিয়েই সুজনের নির্দেশে গাড়ির চালক কামাল গাড়ি চালানো শুরু করে। ওই সময় রিপন বাধা দিতে গেলে তার উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। এতে রিপনের মাথা থেতলে যায় এবং ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই একটি এজাহার দায়ের করলে সে হত্যা মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। শনিবার গ্রেপ্তার সুজন ও কামালকে আদালতে হাজির করা হয়। কামাল আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দীতে তার দোষ স্বীকার করেছে। সুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ পাঁচটি মামলা রয়েছে বলেও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী করিম ফিলিং স্টেশনের অপর কর্মচারী নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় তিনি ও রিপন দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভোর সোয়া চারটার দিকে কালো রংয়ের একটি পাজেরো জিপ এসে তাদের ফিলিং স্টেশনে দাঁড়ায়। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩-৩৪৭৬। গাড়ি থেকে একজন নেমে পাঁচ হাজার টাকার তেল দিতে বলেন। তেল দেওয়ার পর টাকা না দিয়ে ওই ব্যক্তি গাড়িতে ওঠেন। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে রিপন তার কাছে তেলের টাকা চান। টাকা না দিয়ে গাড়ি চালানো শুরু করে চালক। রিপন দৌড়ে গাড়িটির পিছু নেয়। তিনি নিজেও দৌড়ে গিয়েছিলেন। ফিলিং স্টেশনের একশ গজ দূরে গিয়ে দেখেন রিপনের মাথার ঘিলু বের হয়ে নিথর পড়ে আছে। রিপনকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে গেছে চালক।

সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৪টা ১৫মিনিটে একটি কালো জিপ এসে থামে ফিলিং স্টেশনে। আবুল হাসেম সুজন গাড়ি থেকে নামেন। রিপন গাড়িটিতে তেল দেয়। রিপনের সাথে সুজনকে বেশ কিছুক্ষণ কথাও বলতে দেখা গেছে। এরপর সুজন চালকের পাশের আসনে গিয়ে বসে। রিপন টাকার জন্য তার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ গাড়ি চালানো শুরু করে চালক। রিপনও দৌড়ে গাড়িটির পিছু নেয়।

জানা গেছে, ওই সময় গাড়িটি চালাচ্ছিল সুজনের সহযোগী কামাল হোসেন। সুজনের বিষয়ে জানা গেছে, একসময় তিনি জেলা যুবদলের সভাপতি ছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি যুবদল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপর তাকে রাজনীতিতে দেখা যায়নি। ঠিকাদারী ও ব্যবসা বাণিজ্য করতেন।

শুক্রবার দুপুরে রিপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রিপনের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে বাতাস।  মা শিল্পী সাহা বুক চাপড়ে শুধুই বাবা..বাবা করে বিলাপ করে চলেছেন। বাবা পবিত্র সরকার শোকে মুহ্যমান। এখানে ওখানে পায়চারী করছিলেন। গলা জড়িয়ে কাঁদছিলেন বোনেরা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবারই রিপনের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিল।

রিপনের বাবা পবিত্র সাহা ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেটিকে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি সহ্য করতে পারছি না। কষ্টে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। আমি এ নির্মম হত্যার বিচার চাই।

করিম গ্রুপের ম্যানেজার ইমরান হোসেন জীবন জানান, তাদের কর্মচারী রিপনকে গাড়িচাপায় হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ঘটনায় তারা আইনী পদক্ষেপ নেবেন। নিহতের সহোদর ভাই বাদী হয়ে হত্যা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোম্পানীর বিধি অনুসারে নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আহ্লাদিপুর হাইওয়ে থানার ওসি মোহম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তেলের টাকা না দিয়ে পালানোর সময় ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী রিপন গাড়ি চাপায় নিহত হয়েছে। এব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাশাপাশি জেলা পুলিশও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

রাজবাড়ী সদর থানার ওসি খোন্দকার জিয়াউর রহমান জানান, ঘটনার সাথে জড়িত অভিযোগে শুক্রবার দুপুর দুইটার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণিবহ এলাকা থেকে সুজন ও কামালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের গাড়িটিও জব্দ করা হয়েছে। একটি মারামারি মামলায় কয়েকদিন আগে সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে আসে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

আদালতে একজনের স্বীকারোক্তী

পাম্প কর্মচারী রিপনকে গাড়িচাপায় হত্যার অভিযোগে সুজনসহ ২ জনের বিরুদ্ধে মামলা

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৬:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

 রাজবাড়ী সদর উপজেলার গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় করিম ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী রিপন সাহাকে গাড়ি চাপা দিয়ে মারার ঘটনায় অভিযুক্ত সাবেক যুবদল নেতা আবুল হাসেম সুজনসহ দুইজনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে। সুজন রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর গ্রামের জনাব আলীর ছেলে। মামলার অপর আসামি সুজনের সহযোগী কামাল হোসেন। সে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণিবহ ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামের আক্তার সরদারের ছেলে। গত শুক্রবার রাতে নিহতের ছোট ভাই প্রতাপ সাহা বাদী হয়ে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

নিহত রিপন রাজবাড়ী সদর উপজেলার খানখানাপুর ইউনিয়নের চর খানখানাপুর গ্রামের পবিত্র সাহার ছেলে। সিসিটিভি ফুটেজে যাকে দেখা গেছে তিনি রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম সুজন। ঘটনার পরই পুলিশ সুজন ও তার সহযোগী কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করে।

শনিবার সন্ধ্যায় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তাপস পাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, শুক্রবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে সুজন করিম ফিলিং স্টেশন থেকে পাঁচ হাজার টাকার অকটেন নেন। সে টাকা না দিয়ে কালক্ষেপন করতে থাকে। একপর্যায়ে টাকা না দিয়েই সুজনের নির্দেশে গাড়ির চালক কামাল গাড়ি চালানো শুরু করে। ওই সময় রিপন বাধা দিতে গেলে তার উপর দিয়ে গাড়ি চালিয়ে দেওয়া হয়। এতে রিপনের মাথা থেতলে যায় এবং ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। এ ঘটনায় নিহতের ছোট ভাই একটি এজাহার দায়ের করলে সে হত্যা মামলা হিসেবে রুজু করা হয়। শনিবার গ্রেপ্তার সুজন ও কামালকে আদালতে হাজির করা হয়। কামাল আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দীতে তার দোষ স্বীকার করেছে। সুজনের বিরুদ্ধে অস্ত্রসহ পাঁচটি মামলা রয়েছে বলেও প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী করিম ফিলিং স্টেশনের অপর কর্মচারী নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার সময় তিনি ও রিপন দায়িত্ব পালন করছিলেন। ভোর সোয়া চারটার দিকে কালো রংয়ের একটি পাজেরো জিপ এসে তাদের ফিলিং স্টেশনে দাঁড়ায়। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩-৩৪৭৬। গাড়ি থেকে একজন নেমে পাঁচ হাজার টাকার তেল দিতে বলেন। তেল দেওয়ার পর টাকা না দিয়ে ওই ব্যক্তি গাড়িতে ওঠেন। গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার আগে রিপন তার কাছে তেলের টাকা চান। টাকা না দিয়ে গাড়ি চালানো শুরু করে চালক। রিপন দৌড়ে গাড়িটির পিছু নেয়। তিনি নিজেও দৌড়ে গিয়েছিলেন। ফিলিং স্টেশনের একশ গজ দূরে গিয়ে দেখেন রিপনের মাথার ঘিলু বের হয়ে নিথর পড়ে আছে। রিপনকে গাড়ি চাপা দিয়ে হত্যা করে পালিয়ে গেছে চালক।

সিসিটিভির ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৪টা ১৫মিনিটে একটি কালো জিপ এসে থামে ফিলিং স্টেশনে। আবুল হাসেম সুজন গাড়ি থেকে নামেন। রিপন গাড়িটিতে তেল দেয়। রিপনের সাথে সুজনকে বেশ কিছুক্ষণ কথাও বলতে দেখা গেছে। এরপর সুজন চালকের পাশের আসনে গিয়ে বসে। রিপন টাকার জন্য তার কাছে দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ গাড়ি চালানো শুরু করে চালক। রিপনও দৌড়ে গাড়িটির পিছু নেয়।

জানা গেছে, ওই সময় গাড়িটি চালাচ্ছিল সুজনের সহযোগী কামাল হোসেন। সুজনের বিষয়ে জানা গেছে, একসময় তিনি জেলা যুবদলের সভাপতি ছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি যুবদল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপর তাকে রাজনীতিতে দেখা যায়নি। ঠিকাদারী ও ব্যবসা বাণিজ্য করতেন।

শুক্রবার দুপুরে রিপনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, রিপনের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে বাতাস।  মা শিল্পী সাহা বুক চাপড়ে শুধুই বাবা..বাবা করে বিলাপ করে চলেছেন। বাবা পবিত্র সরকার শোকে মুহ্যমান। এখানে ওখানে পায়চারী করছিলেন। গলা জড়িয়ে কাঁদছিলেন বোনেরা। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গতকাল শুক্রবারই রিপনের বিয়ের জন্য পাত্রী দেখতে যাওয়ার কথা ছিল।

রিপনের বাবা পবিত্র সাহা ক্রন্দনরত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলেটিকে নির্মমভাবে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি সহ্য করতে পারছি না। কষ্টে আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। আমি এ নির্মম হত্যার বিচার চাই।

করিম গ্রুপের ম্যানেজার ইমরান হোসেন জীবন জানান, তাদের কর্মচারী রিপনকে গাড়িচাপায় হত্যা করা হয়েছে। বিষয়টি অত্যন্ত মর্মান্তিক। এ ঘটনায় তারা আইনী পদক্ষেপ নেবেন। নিহতের সহোদর ভাই বাদী হয়ে হত্যা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কোম্পানীর বিধি অনুসারে নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

আহ্লাদিপুর হাইওয়ে থানার ওসি মোহম্মদ মিজানুর রহমান জানান, তেলের টাকা না দিয়ে পালানোর সময় ফিলিং স্টেশনের কর্মচারী রিপন গাড়ি চাপায় নিহত হয়েছে। এব্যাপারে মামলার প্রস্তুতি চলছে। নিহতের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তাদের পাশাপাশি জেলা পুলিশও বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।

রাজবাড়ী সদর থানার ওসি খোন্দকার জিয়াউর রহমান জানান, ঘটনার সাথে জড়িত অভিযোগে শুক্রবার দুপুর দুইটার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার বাণিবহ এলাকা থেকে সুজন ও কামালকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের গাড়িটিও জব্দ করা হয়েছে। একটি মারামারি মামলায় কয়েকদিন আগে সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে বাইরে আসে।