Dhaka ১০:৩৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

গাইড বই: বাণিজ্যের ফাঁদে বন্দী শিক্ষা

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৪৭:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 307

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট উচ্চস্বরে চিৎকার করে না; কিন্তু চলমান প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেকড় থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ—সবকিছুই নিয়মমাফিক চলছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: এই শিক্ষার ভেতর দিয়ে কি সত্যিই জ্ঞান জন্ম নিচ্ছে, নাকি আমরা কেবল মুখস্থ-নির্ভর এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে চালিয়ে দিচ্ছি? জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশায় প্রবর্তিত সৃজনশীল শিক্ষাক্রমের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান আজ স্পষ্ট ও বেদনাদায়ক। কারণ, এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নীরবে কিন্তু শক্তভাবে আসন গেড়ে বসেছে একটি বাণিজ্যিক পণ্য—‘গাইড বই’। যেখানে শিক্ষা হওয়ার কথা মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের মাধ্যম, সেখানে আজ তা পরিণত হয়েছে মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়ে।

এই সুযোগকে ঘিরে প্রায় সব প্রকাশক, কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, একশ্রেণির শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি বাণিজ্যিক চক্র; যেখানে শিক্ষা হয়ে পড়েছে আয়-উপার্জনের মাধ্যম। এই প্রেক্ষাপটে তথাকথিত ‘ডোনেশন সংস্কৃতি’ কেবল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা হ্রাসই করছে না, এটি শিক্ষার নৈতিক ভিত্তিকেও ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ মেধা ও মননের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলা একটি কাঠামোগত সমস্যা।

এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে, সৃজনশীল মেধা বিকাশ নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক আদেশে নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইড বইও নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আদেশ অনুযায়ী আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশে দীর্ঘদিন ধরে নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলছে। ডোনেশন বা কমিশনের বিনিময়ে শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট গাইড বই প্রবর্তনের চিত্র আজ আর গোপন নয়। এই ব্যবস্থায় বইয়ের শিক্ষাগত মান বা গুণাগুণ প্রায়ই গৌণ হয়ে পড়ে। মুখ্য বিবেচ্য হয়ে ওঠে—কে কতটুকু আর্থিক সুবিধা দিতে পারছে।

পাঠ্যবই বিলম্বে ছাপা হওয়াও এই অনৈতিক ব্যবসার একটি অংশ। অসাধু প্রকাশকগণ এনসিটিবির কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সমন্বয় করে অনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে প্রকাশনার বিলম্ব সৃষ্টি করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য সময়ে মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী পায় না, এবং শিক্ষার প্রক্রিয়ায় আরও আর্থিক ও নৈতিক চাপ তৈরি হয়।

ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এই বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েন। প্রকাশকগণ শিক্ষকদের প্রদত্ত এই ‘বিনিয়োগ’ পরবর্তীতে বইয়ের অতিরিক্ত মূল্য ধার্য করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকেই আদায় করে নেন। অর্থাৎ, যে বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীর কোনো ভূমিকা নেই, তার আর্থিক বোঝা বহন করতে হয় তাকেই।

এই প্রক্রিয়ার ফলাফল বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী:

১. সৃজনশীল চিন্তার অনুপস্থিতি: শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের গভীরে না গিয়ে গাইড বইয়ের প্রস্তুত ও মুখস্থযোগ্য উত্তরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে পরীক্ষায় সাময়িক সাফল্য এলেও প্রকৃত জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতা গড়ে ওঠে না।

২. দুর্বল শিক্ষার ভিত্তি: বাজারে প্রচলিত বহু গাইড বইয়ে ভুল তথ্য, বানান ও ধারণাগত ত্রুটি লক্ষণীয়, যা শিক্ষার্থীদের মনে ভুল জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে। এই ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত জীবনে অগ্রসর হওয়া বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হতে পারে।

৩. অভিভাবকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ: একই বিষয়ের একাধিক গাইড বই, কোচিং ফি ও অন্যান্য সহায়ক উপকরণের খরচ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে।

৪. শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব: যাঁর কাছ থেকে সততা ও মূল্যবোধ শেখার কথা, তাঁর কাছ থেকেই শিক্ষার্থীরা আপস ও সুবিধাবাদের পাঠ শিখে ফেলে—যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর।

৫. জাতীয় শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ব্যাহত হওয়া: গাইড বইয়ের আধিপত্য সরকার কর্তৃক প্রণীত পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রমকে কার্যত অকার্যকর করে তুলছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগের কথা বলেন, বাস্তব প্রয়োগে তার প্রতিফলন সীমিত।

এখানে এই স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি যে এখনও বহু শিক্ষক আছেন যারা এই বাণিজ্যিক চাপের বাইরে থেকে পাঠ্যবইভিত্তিক ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষাদান করছেন। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে অনেক শিক্ষার্থী সহজ ও শর্টকাট পদ্ধতিতে ভালো ফলাফলের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপের কারণে অনেক সৎ শিক্ষকও অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যবস্থার একটি অংশ হয়ে পড়তে বাধ্য হন, যা সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশকে একটি বিকৃত সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে কয়েকটি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি:

১. গাইড বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা: নৈতিকভাবে সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে এনসিটিবি গঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনবিহীন কোনো সহায়ক বই বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বইয়ের মান যাচাই ও অনুমোদন প্রদান করা যেতে পারে। অনুমোদিত বইয়ে স্বীকৃতি চিহ্ন থাকতে হবে। প্রকাশকদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে মানসম্মত ও স্বল্পমূল্যে সহায়ক বই সরবরাহে উৎসাহিত করতে হবে।

২. নজরদারি ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করে মাঠপর্যায়ে তদারকি কার্যকর করা জরুরি। ডোনেশনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. শিক্ষকদের পেশাগত নৈতিকতা জোরদারকরণ: শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণে নৈতিকতা বিষয়ক কোর্স বাধ্যতামূলক করা এবং সততা ও আদর্শের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।

৪. মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার: সকল পাবলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষার প্রশ্ন এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী দক্ষতা ও গভীর বোঝাপড়া যাচাই হয় এবং গাইড বইয়ের প্রস্তুত উত্তর বা শর্টকাট পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

৫. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: অভিভাবক, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্দিষ্ট গাইড বই চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানানোর সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, গাইড বইকেন্দ্রিক এই বাণিজ্যিকীকরণ কোনো সাধারণ প্রকাশনা সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, মনন ও নৈতিকতাকে বাজারমূল্যে পরিণত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। আজ সচেতন না হলে আমরা পেতে পারি সার্টিফিকেট-সর্বস্ব কিন্তু জ্ঞান ও মূল্যবোধশূন্য এক প্রজন্ম, যারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। শিক্ষাকে বাণিজ্যের কবল থেকে মুক্ত করে—“শিক্ষা হোক বাণিজ্যের ঊর্ধ্বে”—এই অঙ্গীকারে সমাজের সকল স্তরকে এখনই এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: মো. মাহবুবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর

ইমেইল: mmrrajbari71@gmail.com

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

গাইড বই: বাণিজ্যের ফাঁদে বন্দী শিক্ষা

প্রকাশের সময় : ০৭:৪৭:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক গভীর নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট উচ্চস্বরে চিৎকার করে না; কিন্তু চলমান প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেকড় থেকে দুর্বল করে দিচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ—সবকিছুই নিয়মমাফিক চলছে। তবু প্রশ্ন থেকে যায়: এই শিক্ষার ভেতর দিয়ে কি সত্যিই জ্ঞান জন্ম নিচ্ছে, নাকি আমরা কেবল মুখস্থ-নির্ভর এক যান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শিক্ষা বলে চালিয়ে দিচ্ছি? জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের প্রত্যাশায় প্রবর্তিত সৃজনশীল শিক্ষাক্রমের সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান আজ স্পষ্ট ও বেদনাদায়ক। কারণ, এই ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে নীরবে কিন্তু শক্তভাবে আসন গেড়ে বসেছে একটি বাণিজ্যিক পণ্য—‘গাইড বই’। যেখানে শিক্ষা হওয়ার কথা মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনের মাধ্যম, সেখানে আজ তা পরিণত হয়েছে মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়ে।

এই সুযোগকে ঘিরে প্রায় সব প্রকাশক, কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, একশ্রেণির শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টারের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি বাণিজ্যিক চক্র; যেখানে শিক্ষা হয়ে পড়েছে আয়-উপার্জনের মাধ্যম। এই প্রেক্ষাপটে তথাকথিত ‘ডোনেশন সংস্কৃতি’ কেবল শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা হ্রাসই করছে না, এটি শিক্ষার নৈতিক ভিত্তিকেও ক্রমশ দুর্বল করে দিচ্ছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অনিয়ম নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ মেধা ও মননের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলা একটি কাঠামোগত সমস্যা।

এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে, সৃজনশীল মেধা বিকাশ নিশ্চিত করতে ২০০৮ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক আদেশে নোট বইয়ের পাশাপাশি গাইড বইও নিষিদ্ধ করা হয়। ওই আদেশ অনুযায়ী আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, অথবা ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দেশে দীর্ঘদিন ধরে নোট ও গাইড বইয়ের ব্যবসা নির্বিঘ্নে চলছে। ডোনেশন বা কমিশনের বিনিময়ে শ্রেণিকক্ষে নির্দিষ্ট গাইড বই প্রবর্তনের চিত্র আজ আর গোপন নয়। এই ব্যবস্থায় বইয়ের শিক্ষাগত মান বা গুণাগুণ প্রায়ই গৌণ হয়ে পড়ে। মুখ্য বিবেচ্য হয়ে ওঠে—কে কতটুকু আর্থিক সুবিধা দিতে পারছে।

পাঠ্যবই বিলম্বে ছাপা হওয়াও এই অনৈতিক ব্যবসার একটি অংশ। অসাধু প্রকাশকগণ এনসিটিবির কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে সমন্বয় করে অনৈতিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে প্রকাশনার বিলম্ব সৃষ্টি করেন। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ন্যায্য সময়ে মানসম্মত শিক্ষাসামগ্রী পায় না, এবং শিক্ষার প্রক্রিয়ায় আরও আর্থিক ও নৈতিক চাপ তৈরি হয়।

ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টার কর্তৃপক্ষ প্রায়ই এই বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েন। প্রকাশকগণ শিক্ষকদের প্রদত্ত এই ‘বিনিয়োগ’ পরবর্তীতে বইয়ের অতিরিক্ত মূল্য ধার্য করে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকেই আদায় করে নেন। অর্থাৎ, যে বাণিজ্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণে শিক্ষার্থীর কোনো ভূমিকা নেই, তার আর্থিক বোঝা বহন করতে হয় তাকেই।

এই প্রক্রিয়ার ফলাফল বহুমাত্রিক ও সুদূরপ্রসারী:

১. সৃজনশীল চিন্তার অনুপস্থিতি: শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের গভীরে না গিয়ে গাইড বইয়ের প্রস্তুত ও মুখস্থযোগ্য উত্তরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে পরীক্ষায় সাময়িক সাফল্য এলেও প্রকৃত জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতা গড়ে ওঠে না।

২. দুর্বল শিক্ষার ভিত্তি: বাজারে প্রচলিত বহু গাইড বইয়ে ভুল তথ্য, বানান ও ধারণাগত ত্রুটি লক্ষণীয়, যা শিক্ষার্থীদের মনে ভুল জ্ঞানের ভিত্তি তৈরি করে। এই ভুল ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা বা পেশাগত জীবনে অগ্রসর হওয়া বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হতে পারে।

৩. অভিভাবকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ: একই বিষয়ের একাধিক গাইড বই, কোচিং ফি ও অন্যান্য সহায়ক উপকরণের খরচ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে।

৪. শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব: যাঁর কাছ থেকে সততা ও মূল্যবোধ শেখার কথা, তাঁর কাছ থেকেই শিক্ষার্থীরা আপস ও সুবিধাবাদের পাঠ শিখে ফেলে—যা দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও জাতির জন্য ক্ষতিকর।

৫. জাতীয় শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ব্যাহত হওয়া: গাইড বইয়ের আধিপত্য সরকার কর্তৃক প্রণীত পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষাক্রমকে কার্যত অকার্যকর করে তুলছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগের কথা বলেন, বাস্তব প্রয়োগে তার প্রতিফলন সীমিত।

এখানে এই স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি যে এখনও বহু শিক্ষক আছেন যারা এই বাণিজ্যিক চাপের বাইরে থেকে পাঠ্যবইভিত্তিক ও নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষাদান করছেন। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে অনেক শিক্ষার্থী সহজ ও শর্টকাট পদ্ধতিতে ভালো ফলাফলের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপের কারণে অনেক সৎ শিক্ষকও অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যবস্থার একটি অংশ হয়ে পড়তে বাধ্য হন, যা সামগ্রিক শিক্ষা পরিবেশকে একটি বিকৃত সংস্কৃতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এই সংকট থেকে উত্তরণে কয়েকটি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি:

১. গাইড বইয়ের মান নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা: নৈতিকভাবে সৎ ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে এনসিটিবি গঠন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনবিহীন কোনো সহায়ক বই বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। একটি স্বাধীন ও গ্রহণযোগ্য বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে বইয়ের মান যাচাই ও অনুমোদন প্রদান করা যেতে পারে। অনুমোদিত বইয়ে স্বীকৃতি চিহ্ন থাকতে হবে। প্রকাশকদের জবাবদিহিতার আওতায় এনে মানসম্মত ও স্বল্পমূল্যে সহায়ক বই সরবরাহে উৎসাহিত করতে হবে।

২. নজরদারি ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন করে মাঠপর্যায়ে তদারকি কার্যকর করা জরুরি। ডোনেশনের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি অনুসরণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. শিক্ষকদের পেশাগত নৈতিকতা জোরদারকরণ: শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণে নৈতিকতা বিষয়ক কোর্স বাধ্যতামূলক করা এবং সততা ও আদর্শের সঙ্গে দায়িত্ব পালনকারী শিক্ষকদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া যেতে পারে।

৪. মূল্যায়ন পদ্ধতি সংস্কার: সকল পাবলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষার প্রশ্ন এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীর বিশ্লেষণী দক্ষতা ও গভীর বোঝাপড়া যাচাই হয় এবং গাইড বইয়ের প্রস্তুত উত্তর বা শর্টকাট পদ্ধতি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

৫. সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি: অভিভাবক, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্দিষ্ট গাইড বই চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনা কর্তৃপক্ষকে জানানোর সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, গাইড বইকেন্দ্রিক এই বাণিজ্যিকীকরণ কোনো সাধারণ প্রকাশনা সমস্যা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, মনন ও নৈতিকতাকে বাজারমূল্যে পরিণত করার একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া। আজ সচেতন না হলে আমরা পেতে পারি সার্টিফিকেট-সর্বস্ব কিন্তু জ্ঞান ও মূল্যবোধশূন্য এক প্রজন্ম, যারা রাষ্ট্র ও সমাজকে নেতৃত্ব দিতে পারবে না। শিক্ষাকে বাণিজ্যের কবল থেকে মুক্ত করে—“শিক্ষা হোক বাণিজ্যের ঊর্ধ্বে”—এই অঙ্গীকারে সমাজের সকল স্তরকে এখনই এক কাতারে দাঁড়াতে হবে।

লেখক: মো. মাহবুবুর রহমান, সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর

ইমেইল: mmrrajbari71@gmail.com