সংকট নিরসনে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ঘোষণাসহ ১৫ দাবি জামায়াতের

- প্রকাশের সময় : ০২:৩১:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬
- / 6

দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক সংকট নিরসনে এবং শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ ১৫ দফা দাবি বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের পক্ষ থেকে এই দাবি তুলে ধরেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, একের পর এক কারখানা বন্ধ এবং লাখ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মিয়া পরওয়ার। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল শ্রমিক-মালিক বিরোধের বিষয় নয়; এটি দেশের শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট।
তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের পোশাকশিল্পের শ্রমিকেরা অত্যন্ত কঠিন জীবনযাপন করছেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় শ্রমিকদের আয় ও জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। একজন শ্রমিকের মাসিক আয়ে নিজের ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় পোশাকশিল্পের শ্রমিকরা ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন করছেন।
মিয়া পরওয়ার বলেন, আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি তার শ্রমের ন্যায্য অধিকার। শ্রমিকের শ্রম ও উৎপাদনের ওপর দাঁড়িয়ে যে শিল্প ও অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, সেই শ্রমিকের জীবনমান উপেক্ষা করে শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ডের গতকালের প্রথম সভার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা আশা করি, এই বোর্ড শ্রমিকদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয়, বর্তমান বাজারদর, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সুপারিশ প্রদান করবে। আমাদের দাবি, শ্রমিকদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে দ্রুত ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করতে হবে এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করতে হবে।
শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যানবাহনে হামলা এবং উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করার মতো কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, কোনো কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বরং এর ফলে শ্রমিকরা তাদের কর্মসংস্থান হারান, মালিকেরা বিনিয়োগ হারান এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় জাতীয় অর্থনীতি।
তিনি দাবি জানান, চলমান শ্রমিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিকলীগসহ রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহল কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী উসকানি ও নাশকতার চেষ্টা করছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের যৌক্তিক আন্দোলনকে দমন করার নামে হয়রানি, নির্যাতন ও গণগ্রেপ্তারের পথ পরিহার করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, গাজীপুরে পোষাক শিল্প শ্রমিক তৌফিক শেখের কেন প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, কারা এর জন্য দায়ী এবং কী পরিস্থিতিতে এই ঘটনা ঘটেছে- তা নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে এবং নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দিতে হবে।
বর্তমানে শ্রম অসন্তোষ, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং কারখানা বন্ধের ঘটনায় শিল্প খাতে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও জানান গোলাম পরওয়ার।
বিজিএমইএ ও সংশ্লিষ্ট শিল্প সূত্রে প্রকাশিত তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, চলমান পরিস্থিতিতে সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মীরপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে সহস্রাধিক কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। শতশত কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেনি।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শতাধিক গার্মেন্টস কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে এবং প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ বাতিল, সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চলমান সংকট নিরসন এবং শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকারের কাছে ১৫ দফ দাবিগুলো তুলে ধরেন।
১. নবগঠিত মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করতে হবে।
২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।
৫. চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. পোষাক শিল্পের চলমান সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ এই সেক্টরের স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।
৯. শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ বা স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অপচেষ্টা থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে হবে।
১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে।
১১. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।
১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।
১৩. পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
১৪. নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ নিরাপত্তাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৫. দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আমরা সরকারকে আহ্বান জানাচ্ছি, শ্রমিকের ন্যায্য দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন করুন, শ্রমিক হত্যার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করুন, নিরপরাধ শ্রমিকদের মুক্তি দিন এবং বন্ধ কারখানাগুলো চালুর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুন। পোশাকশিল্পের মালিকদের প্রতি আমাদের আহ্বান, শ্রমিকদের প্রতিপক্ষ নয়, শিল্পের অপরিহার্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করুন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন- নায়েবে আমির মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রমুখ।
























