কারাগারেই কাটছে ‘বাকের ভাই’র জন্মদিন

- প্রকাশের সময় : ০৬:৫৬:১৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
- / 6

বাংলা নাটকের জনপ্রিয় চরিত্র ‘বাকের ভাই’ হিসেবে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পাওয়া সেই জনপ্রিয়তা আজও অমলিন। তবে জীবনের ৮০তম জন্মদিনে মঞ্চের আলো কিংবা সহকর্মীদের সঙ্গে উদ্যাপনের সুযোগ নেই তাঁর। কারাগারেই কাটছে কিংবদন্তি এই অভিনেতার জন্মদিন।
আজ শনিবার (৩১ অক্টোবর) আসাদুজ্জামান নূরের ৮০তম জন্মদিন। ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের পর কারাগারে এটি তাঁর তৃতীয় জন্মদিন। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি রয়েছেন তিনি। কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো ও আইনি জটিলতার কারণে এখনো মুক্তি পাননি এই অভিনেতা।
জন্মদিন উপলক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন সহকর্মী, অনুরাগী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। এদিন নূরের পুত্রবধূ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজলী শেহরিন ইসলাম ২০২৪ সালে শ্বশুরের জন্মদিনে দেওয়া একটি পোস্ট আবারও শেয়ার করেছেন। সেখানে জন্মদিনের শুভেচ্ছার পাশাপাশি ন্যায়বিচার, রাজনীতি ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের ঊর্ধ্বে নৈতিক অবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন তিনি।
কাজলী লিখেছেন, ‘শুভ ৮০তম জন্মদিন, বাবা। কারাগারে আপনার তৃতীয় জন্মদিনে আমাদের প্রত্যাশা, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে উঠুক, যেখানে ১৯৭১ সালের ন্যায়বিচার, জুলাইয়ের ন্যায়বিচার এবং আপনার জন্য ন্যায়বিচার চাওয়া যাবে এবং পাওয়া যাবে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘কারণ, এই বিচারগুলো একে অপরের বিরোধী নয়। বিচার হওয়া উচিত সবার জন্য সমান, সেখানে কোনো পক্ষপাত থাকবে না।’
একই পোস্টে কাজলী এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানিয়েছেন, যেখানে সংস্কৃতিমনা হওয়া ও ধর্মবিশ্বাসী হওয়াকে পরস্পরের বিপরীত হিসেবে দেখা হবে না। রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে কেউ যেন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াতে বা সঠিক কাজ করতে পিছপা না হন, সেই আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর আসাদুজ্জামান নূর গ্রেপ্তার হওয়ার পরও এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছিলেন কাজলী। সে সময় তিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের অংশ হিসেবে নূরের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকার সমালোচনা করার অধিকার সবার রয়েছে। তবে সমালোচনার অর্থ প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত করা নয়। নিরপেক্ষ আদালতে দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত শ্বশুরের পাশে থাকার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে কাজলী তখন বলেছিলেন, পরিবর্তনের প্রয়োজন ছিল, এখনো আছে। তবে সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যেন ন্যায়বিচারের প্রশ্নে কাউকে বঞ্চিত করার কারণ না হয়। দুই বছর পরও তাঁর বক্তব্যে একই ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা উঠে এসেছে।
১৯৪৬ সালের ৩১ অক্টোবর নীলফামারীতে জন্মগ্রহণ করেন আসাদুজ্জামান নূর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। পরে অভিনয় ও আবৃত্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে তাঁর সাংস্কৃতিক জীবন। নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন মঞ্চে অভিনয় করেছেন তিনি।
মঞ্চে তাঁর উল্লেখযোগ্য নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘নূরলদীনের সারাজীবন’, ‘দেওয়ান গাজীর কিসসা’ ও ‘গ্যালিলিও’। সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি, কণ্ঠের নিয়ন্ত্রণ এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশের ক্ষমতা তাঁকে মঞ্চের শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে টেলিভিশন নাটকই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সাধারণ দর্শকের ঘরে ঘরে। হুমায়ূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ ধারাবাহিকে বাকের ভাই চরিত্রে অভিনয় করে অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পান তিনি। ১৯৯০ সালে প্রচারিত নাটকটির শেষ পর্ব ঘিরে দর্শকের আবেগ ও প্রতিবাদ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। কাল্পনিক চরিত্র হয়েও বাকের ভাই যেন দর্শকের কাছে বাস্তবের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। আজও অনেকের কাছে আসাদুজ্জামান নূরের নামের আগে উচ্চারিত হয় ‘বাকের ভাই’।
‘অয়োময়’ নাটকে মীর্জা চরিত্রেও তাঁর অভিনয় দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়। এ ছাড়া ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘বহুব্রীহি’ ও ‘আজ রবিবার’-এর মতো জনপ্রিয় নাটকে অভিনয় করেছেন তিনি। ‘মাটির পিঞ্জির’ নাটকে নান্দাইলের ইউনুস চরিত্রেও প্রশংসা পেয়েছেন এই অভিনেতা।
অভিনয়জীবনে নিজেকে নির্দিষ্ট কোনো ধরনের চরিত্রে সীমাবদ্ধ রাখেননি নূর। পরিবারের দায়িত্বশীল মানুষ থেকে শুরু করে বেকার যুবক, মাস্তান, চোর কিংবা ভাড়াটে খুনি—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে সাবলীল অভিনয় করেছেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি আবৃত্তিশিল্পী হিসেবেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা।
অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ২০০১ সালে নীলফামারী-২ আসন থেকে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনেও একই আসন থেকে জয়ী হন। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগপর্যন্ত সংসদ সদস্য ছিলেন এই অভিনেতা।
২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর বেইলি রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন আসাদুজ্জামান নূর। জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনও মামলা করে। ২০২৫ সালে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে করা মামলাতেও তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
চলতি বছরের ১০ মে জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক দুটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান তিনি। এর আগে মে মাসের শুরুতেও আরেকটি মামলায় জামিনের খবর আসে। তবে নীলফামারীর একটি হত্যা মামলাসহ অন্যান্য মামলার জটিলতায় তাঁর মুক্তি মেলেনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলাতেও জামিন পাননি তিনি। ফলে এক মামলায় জামিন পাওয়ার পরও অন্য মামলায় কারাগারে থাকতে হচ্ছে তাঁকে।





















