ইসরাইলকে ৬০ হাজার ভারী বোমা দেওয়ার প্রস্তুতি যুক্তরাষ্ট্রের
- প্রকাশের সময় : ১২:৩৪:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 9
ইসরাইলের কাছে ২ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৯০৭ কেজি ওজনের ৬০ হাজার ভারী বোমা বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রস্তাবিত এ অস্ত্র চুক্তির মূল্য প্রায় ২৮০ কোটি ডলার। এর বড় অংশের অর্থ আসবে মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত বৈদেশিক সামরিক অর্থায়ন কর্মসূচি থেকে।
প্রস্তাবিত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার এমকে-৮৪, ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ এবং ২০ হাজার আই-২০০০ পেনিট্রেটর। এগুলোর কিছু বড় ভবন ও সুরক্ষিত স্থাপনা ধ্বংসের জন্য এবং কিছু মাটির নিচে থাকা শক্ত কাঠামো ভেদ করে বিস্ফোরণের জন্য তৈরি।
ট্রাম্প প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তিটি ঘোষণা করেনি। তবে মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং বিষয়টি অনানুষ্ঠানিকভাবে কংগ্রেসকে জানানো হয়েছে।
গাজা ও লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতে ইসরাইলের বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ব্যবহারের খবরের মধ্যে নতুন করে এই অস্ত্র সরবরাহের বিষয়টি সামনে এসেছে। একই সময়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের গোলাবারুদের মজুতেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে পেন্টাগনের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যে ধরনের বোমা দেওয়ার কথা
প্রস্তাবিত চুক্তিতে থাকা এমকে-৮৪ মার্ক ৮০ সিরিজের সবচেয়ে বড় বোমা। প্রায় ৯০৭ কেজি ওজনের এ বোমা বড় ভবন ও মাঝারি মাত্রায় সুরক্ষিত লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম।
বিএলইউ-১১৭-এর ওজনও প্রায় ৯০৭ কেজি। এটি দেখতে এমকে-৮৪-এর মতো হলেও এর ভেতরে ভিন্ন ধরনের বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এতে নির্দেশনাব্যবস্থা যুক্ত করা যায়।
আই-২০০০ পেনিট্রেটরকে সাধারণভাবে ‘বাংকার বাস্টার’ বলা হয়। এটি মাটি, পাথর বা কংক্রিটের মতো শক্ত কাঠামো ভেদ করে এরপর বিস্ফোরণের জন্য তৈরি। এ কারণে এর বাইরের আবরণ অন্য ধরনের বোমার তুলনায় বেশি পুরু ও শক্ত।
গাজায় ভারী বোমা ব্যবহারের অভিযোগ
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইল কয়েক দশক ধরে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও লেবাননে ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির বোমা ব্যবহার করে আসছে।
২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর গাজা নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ইসরাইলের একটি ২ হাজার পাউন্ডের বোমা হামলার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হামলায় বড় গর্ত তৈরি হয় এবং বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে আলজাজিরা জানিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় সে সময় জানিয়েছিল, হামলাটি যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আলজাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় বোমা হামলার পর ২ হাজার ৮৪২ জন ফিলিস্তিনির পূর্ণাঙ্গ মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি। প্রতিবেদনে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে তাপীয় ও থার্মোবারিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট এসব বোমার কারণেই ওই ব্যক্তিদের মরদেহ পাওয়া যায়নি—এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
৬০ হাজার বোমার মোট ওজন
প্রতিটি বোমার ওজন প্রায় ৯০৭ কেজি হিসাবে ৬০ হাজার বোমার মোট ওজন দাঁড়ায় প্রায় ৫৪ হাজার ৪০০ টন।
আলজাজিরা এই ওজনের তুলনা করেছে নিউইয়র্কের এম্পায়ার স্টেট ভবনের ইস্পাত কাঠামো এবং প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের লোহার কাঠামোর সঙ্গে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫৪ হাজার ৪০০ টন ওজন এম্পায়ার স্টেট ভবনের ইস্পাত কাঠামোর মোট ওজনের কাছাকাছি এবং আইফেল টাওয়ারের লোহার কাঠামোর ওজনের প্রায় সাত গুণ।
এর আগে সরবরাহ স্থগিত করেছিল যুক্তরাষ্ট্র
২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইসরাইলের কাছে ২ হাজার পাউন্ড শ্রেণির কিছু বোমা সরবরাহ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনার মধ্যে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ওই স্থগিতাদেশ তুলে দেন। একই সময়ে কংগ্রেসের স্বাভাবিক পর্যালোচনা প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে ইসরাইলের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়। ওই প্যাকেজে ৩৫ হাজার ৫০০টির বেশি শক্তিশালী বোমা ছিল।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ওয়াশিংটন ইসরাইলের কাছে আরও ৬৬৭ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের গোলাবারুদেও চাপ
পেন্টাগনের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে সংকটের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া সহজ করা, উৎপাদনের সময় কমানো এবং গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ও গোলাবারুদ মজুতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে পেন্টাগন জানিয়েছে।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে তার ইতিহাসের যেকোনো সময়ের তুলনায় অত্যাধুনিক অস্ত্র তৈরি করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক বাহিনীর কাছে এসব অস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচনা
ইসরাইলের কাছে বিপুলসংখ্যক বোমা বিক্রির সম্ভাব্য খবর নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনেও সমালোচনা হয়েছে।
রক্ষণশীল রাজনৈতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং দাবি করেছেন, নতুন করে পাঠানো বোমা লেবানন ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও ব্যবহার করা হতে পারে।
মার্কিন ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেনও প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রি ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি মার্কিন করদাতাদের অর্থে কেনা বোমা ইসরাইলের কাছে পাঠানোর সমালোচনা করেন।
সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য মার্জোরি টেলর গ্রিনও অস্ত্র বিক্রির সমালোচনা করেছেন।
তবে প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত ঘোষণা দেয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার আগে প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রি নিয়ে তারা নিশ্চিত বা মন্তব্য করে না।
সূত্র: আলজাজিরা






















