টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই বদলে যায় মাহিমের পরিচয়
- প্রকাশের সময় : ০৫:২৮:৩৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
- / 33
স্কুলের টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই বদলে যায় আট বছরের মাহিমের পরিচয়। অন্য শিক্ষার্থীরা যখন মাঠে খেলায় মেতে ওঠে, তখন দ্বিতীয় শ্রেণির এই শিক্ষার্থী হাতে তুলে নেয় বাদামের প্যাকেট। পরিবারের হাল ধরতে স্কুল প্রাঙ্গণ ও আশপাশে বাদাম বিক্রি করেই চলছে তার জীবনসংগ্রাম।
মাহিম মেহেরপুর সদর উপজেলার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। দেড় বছর আগে স্ট্রোকে তার বাবা মান্নান আলীর মৃত্যু হলে মা শিল্পী খাতুন, এক বোন ও মাহিমকে নিয়ে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়ে মাহিমকেও উপার্জনের দায়িত্ব নিতে হয়।
প্রতিদিন সকালে স্কুলে এসে নিয়মিত ক্লাস করে মাহিম। টিফিনের সময় শুরু হয় তার বাদাম বিক্রি। স্কুল ছুটির পরও বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত চলে এই কাজ। এরপর বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়েই বসতে হয় পড়ার টেবিলে।
মাহিম বলে, ‘লেখাপড়া করে বড় মানুষ হতে চাই। বাবার মতো কষ্ট করতে চাই না। বাদাম বিক্রি করি, কারণ বাসায় টাকা লাগে। সবাই খেলাধুলা করে, আমারও খেলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আগে বাদাম বিক্রি করতে হয়।’
মা শিল্পী খাতুন বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় কাজ খুঁজেও নিয়মিত কোনো কাজ পাননি। বাধ্য হয়েই ছেলের হাতে বাদাম তুলে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘একজন মা হিসেবে এটা খুব কষ্টের। আমি চাই ছেলে শুধু লেখাপড়া করুক। কিন্তু না খেয়ে তো থাকা যায় না। সরকার বা কোনো সহৃদয় ব্যক্তি পাশে দাঁড়ালে ছেলেটাকে আর বাদাম বিক্রি করতে হবে না।’
মাহিমের সহপাঠী লাবিব হাসান বলে, ‘টিফিনের সময় আমরা খেলি। মাহিম তখন বাদাম বিক্রি করে। আমরা চাই, ও আমাদের সঙ্গে খেলুক।’
সহপাঠী রাসেল হোসেন জানায়, মাহিম পড়াশোনায় ভালো। আরেক সহপাঠী রাজ বলে, মাঝে মাঝে সে মাহিমের কাছ থেকে বাদাম কেনে এবং সবসময় তাকে হাসিমুখেই দেখে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলেক হোসেন বলেন, মাহিম শুধু একজন শিশু নয়, সে সমাজের অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুর প্রতিচ্ছবি। সময়মতো সরকারি ও সামাজিক সহায়তা পেলে এসব শিশুও স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে।
আরেক বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, মাহিমের ছোট্ট হাত আজ বাদাম বিক্রি করছে, কিন্তু যথাযথ সহযোগিতা পেলে সেই হাতই একদিন সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে।
ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানান, মাহিম নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তাকে পড়াশোনার পাশাপাশি বাদাম বিক্রি করতে হচ্ছে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে শিশুটির জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন।
মেহেরপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, মাহিমের বিষয়ে তারা অবগত হয়েছেন। পরিবারটিকে যাচাই-বাছাই করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি শিশুটির শিক্ষা যাতে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।




















