রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মেডিসিন ও কার্ডিলজি বিভাগে ডাক্তার নেই | জরুরি বিভাগ চলছে স্যাকমো দিয়ে
- প্রকাশের সময় : ০৫:১৮:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
- / 161
মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগের ডাক্তার ছাড়াই চলছে রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল। হাসপাতালে ভর্তি বেশির ভাগ রোগীই মেডিসিন অথবা কার্ডিওলজি বিভাগের হয়ে থাকে। অন্যদিকে মেডিকেল অফিসার সংকট থাকায় জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করছেন স্যাকমো। একের পর ডাক্তার বদলি হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বিরাজ করছে এ অবস্থা। অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ দুটির ডাক্তার না থাকায় সার্জারী, অ্যানেসথিসিয়াসহ অন্য বিভাগের ডাক্তাররা চিকিৎসা দিচ্ছেন রোগীদের।
জানা গেছে, হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, অ্যাজমা, লিভার, পরিপাকতন্ত্রের রোগ, ডায়াবেটিকস ও অন্যান্য ক্রনিক ডিজিজের জন্য মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগের চিকিৎসক একান্তভাবে প্রয়োজন। রাজবাড়ী জেলায় এসব রোগের সংখ্যাও বেশি।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল সূত্র জানায়, জেলার ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসার ভরসাস্থল একশ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে দেড়শ জন রোগী ভর্তি থাকে। যাদের বেশির ভাগই মেডিসিন ও কার্ডিলজি সংক্রান্ত। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন সহ¯্রাধিক রোগী চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। হাসপাতালটিতে লোকবলের সংকট চলছে বহুদিন ধরেই। গত এক বছরে তা প্রকট আকার ধারণ করেছে। বদলি হতে হতে সর্বশেষ কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট মোয়াজ্জেম হোসেন এবং একই বিভাগের শাওন কুমার দেব ছিলেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর তারিখে মোয়াজ্জেম হোসেন এবং ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে শাওন দেব বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান। কিন্তু তাদের শূন্যস্থান পূরণে কাউকে পদায়ন করা হয়নি। বর্তমানে হাসপাতালটিতে মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগের কেউ নেই। সিনিয়র কনসালটেন্ট ১০ জন থাকার কথা। রয়েছেন মাত্র একজন। যিনি অর্থো-সার্জারী বিভাগের। জুনিয়র কনসালটেন্ট ১২ জনের মধ্যে গাইনী, ইএনটি, অ্যানেসথিসিয়া, শিশু, সার্জারী, অর্থোপেডিক্স, শারীরিক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন বিভাগে একজন করে আছেন। অর্থ্যাৎ পাঁচটি পদই শূন্য। সহকারী সার্জন ১১ জনের মধ্যে আছেন ছয়জন এবং মেডিকেল অফিসার রয়েছেন তিনজন। হাসপাতালে জটিল কোনো রোগী এলেই তাকে ঢাকা অথবা ফরিদপুর রেফার্ড করে দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আশঙ্কাজনক রোগীরা পড়েন মহাবিপদে। সময় মত গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। একটি সূত্রে জানা গেছে, আগে প্রতি মাসে গড়ে একশ থেকে দেড়শ জন রোগীকে রেফার্ড করা হতো। মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগের ডাক্তার না থাকায় সম্প্রতি এ সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে।
শনিবার সকালে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের শয্যা পরিপূর্ণ। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগী মেঝেতে আশ্রয় নিয়েছেন। একশ শয্যার হাসপাতালটিতে শনিবার ভর্তি ছিল ২২৩ জন রোগী। যাদের মধ্যে মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ৭৭ জন। শনিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত তিনজন রোগীকে রেফার্ড করা হয়। গত সাতদিনে রেফার্ড করা রোগীর সংখ্যা ৪০ জন।
মেডিসিন নারী ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী খালেদা বেগম (৭০) জানান, তিনি টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে চারদিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হন। এখনও সুস্থ হতে পারেননি। ডাক্তার আসছেন, দেখে যাচ্ছেন। কোন বিভাগের ডাক্তার তাকে দেখছেন তা তিনি জানেন না বলে জানান।
একই ওয়ার্ডে ভর্তি মনোয়ারা বেগমের বোন জাহানারা বেগম জানান, তার বোন রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। গত বৃহস্পতিবার ভর্তি হয়েছেন। এখনও তার বোন সুস্থ হননি।
হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার সেলিনা সুলতানা জানান, একটা জেলা হাসপাতালে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের দুজন ডাক্তার না থাকা হতাশাজনক।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত এক বছরে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে চিকিৎসক বদলির হিড়িক পড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় হাসপাতালে বিদ্যমান মেডিকেল অফিসার এবং কনসালটেন্ট কী পরিমাণ বা কী সংখ্যায় আছেন তা তদারকি না করেই একের পর এক চিকিৎসক বদলি করে চলেছেন। তাদের এমন সিদ্ধান্তের বলি হচ্ছে রাজবাড়ী জেলার ১২ লাখ মানুষ। কারণ, মেডিসিন বিভাগের মত একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ এই হাসপাতালে চলছে মেডিসিনের কোনো ডাক্তার ছাড়াই। মেডিসিনের চারজন বিশেষজ্ঞ একের পর এক বদলি হয়ে চলে গেছেন। মেডিসিন বিভাগ এখন চালাচ্ছেন সার্জারি চিকিৎসকরা। তিনি বলেন, সার্জারীর চিকিৎসকরা তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রের বাইরে মেডিসিনের গুরুত্বপূর্ণ রোগ যেমন হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক, অ্যাজমা, লিভারের রোগ, পরিপাকতন্ত্রের রোগসহ ডায়াবেটিকস অন্যান্য ক্রনিক ডিজিজের সেবা দিতে অভ্যস্ত নন। এ বিষয়ে তাদের কোনো বিশেষজ্ঞ ডিগ্রীও নেই। কারণ তারা সার্জারী বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। ফলে মেডিসিন বিভাগে প্রতিদিন ভর্তি হওয়া শত শত রোগী সার্জারী বিশেষজ্ঞের তত্ত¡াবধানে থেকে যাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন রোগীদের রোগ সারতে বিলম্ব হচ্ছে অন্যদিকে এই হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে রেফার্ডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রাম থেকে আসা একজন রোগী ভর্তি হওয়ার পর জানেন না তাকে সার্জারীর ডাক্তার দেখছেন। এক বিভাগের চিকিৎসক অন্য বিভাগের রোগের চিকিৎসা দিলে রোগীরা বেনিফিটেড হবেনা।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (ইএনটি) ডা. তাপস চন্দ্র মন্ডল বলেন, যতটুকু পারি ততটুকু রোগীদের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। ক্রিটিক্যাল রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সাধারণ রোগে আক্রান্তরা ভর্তি থাকে। মেডিসিন বিভাগের রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া আমাদের জন্য একটু কঠিনই। রাউন্ড দেওয়ার পর আউটডোরেও রোগী দেখতে হয়। যে পর্যন্ত ডাক্তার না আসে এটা একটা সমস্যা। যতটুকু বুঝি ততটুকু চিকিৎসা দেই। রোগীদের সেবা দিতেই হবে। কিছু করণীয় নেই।
রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক ডা. এসএমএ হান্নান বলেন, রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে মেডিসিন, কার্ডিওলজি ও চক্ষু বিভাগের কোনো ডাক্তার নেই। অন্যান্য বিভাগের ডাক্তারদের দিয়ে রোটেশন করে কোনোমতে চালানো হয়েছে। এর আগে যারা বদলি হয়ে চলে গেছেন তাদের জায়গায় কেউ আসেনি। মেডিকেল অফিসার সংকট থাকায় দুজন স্যাকমোকে দিয়ে জরুরি বিভাগ চালানো হচ্ছে। জরুরি বিভাগ তো খালি রাখার সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে তিনি মন্ত্রণালয়ে কথা বলেছেন। তারা (মন্ত্রণালয়) আপাতত কোনো ডাক্তার পদায়ন করবে না বলে জানিয়েছে।
রাজবাড়ীর সিভিল সার্জন ডা. এসএম মাসুদ বলেন, একটা জেলা হাসপাতালে মেডিসিন ও কার্ডিওলজি ডাক্তার থাকা অপরিহার্য। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে এখন মেডিসিন ও কার্ডিওলজি বিভাগে কেউ নেই। এটা নিয়ে আমরাও সাফার করছি। জরুরি প্রয়োজনে মেডিকেল বোর্ড করতে গিয়ে সেটা করা যাচ্ছে না। আমরা খুবই খারাপ অবস্থায় আছি। এটা নিয়ে সবাই আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলছি। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না।






















