লিবিয়ার কারাগার ও হাসপাতালে খোঁজ নেই ৩৮ বাংলাদেশির
- প্রকাশের সময় : ০৫:১৭:৩০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৫
- / 118
লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রার ২৭ দিন পরও হবিগঞ্জের ৩৮ তরুণের কোনো খোঁজ মেলেনি।
লিবিয়ার কারাগার, হাসপাতালসহ সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজ নেওয়ার পরও তাদের সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে লিবিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাস।
নিখোঁজদের প্রতিটি পরিবার ইতালি পাঠানোর আশায় স্থানীয় ‘আদম বেপারি’ হাসান মোল্লার হাতে ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়েছেন। এখন প্রিয়জনের মৃত্যুর আশঙ্কায় পরিবারগুলো আতঙ্কগ্রস্ত। ভয় ও অনিশ্চয়তার কারণে কেউ মুখ খুলছেন না, আইনি পদক্ষেপেও যাচ্ছেন না।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর ইতালিগামী নৌকায় ত্রিপলি উপকূল থেকে যাত্রা শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় স্বজনদের। বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে ওই তরুণদের সন্ধান ও উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে লিবিয়ায় বাংলাদেশের দূতাবাসকে নির্দেশ দেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তারাও কোনো সন্ধান পায়নি।
বাংলাদেশ দূতাবাস, লিবিয়ার প্রথম সচিব মো. রাসেল মিয়া সোমবার (২৭ অক্টোবর) রাতে বাংলানিউজকে বলেন, তারা বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়ায় প্রবেশ করেছেন। তাদের সঠিক তথ্য আমাদের কাছে থাকে না। দেশ থেকে চিঠি পাওয়ার পর সম্ভাব্য কারাগার ও হাসপাতালগুলোতে খোঁজ নিয়েছি, কিন্তু সেখানে তাদের পাওয়া যায়নি। রেড ক্রিসেন্টসহ অন্যান্য মানবিক সংস্থাও কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, যদি তারা মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি থাকতেন, তবে নিশ্চয়ই মুক্তিপণের জন্য বাড়িতে খবর দিত। আবার হাসপাতালে বা জেলে থাকলেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করত। এখন একমাত্র সংশ্লিষ্ট দালাল বা আদম বেপারিই আসল তথ্যটা জানে।
প্রথম সচিব আরও জানান, এর আগেও গত মার্চ মাসে ১৫ জন বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হয়েছিলেন। এতদিনেও তাদের খোঁজ মেলেনি। সব দিক বিবেচনা করে বলা যায়- দুই দফায় ৩৮ জন ও ১৫ জন নিখোঁজ হয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে তারা সাগরে ডুবে মারা গেছেন।
নিখোঁজ দুজনের আত্মীয়, ইতালি ও ফ্রান্স প্রবাসী দুই যুবক পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বাংলানিউজকে বলেন, যদি নিখোঁজরা সত্যিই বেঁচে থাকত, তাহলে হাসান মোল্লা এতদিনে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাতেন। প্রতিটি পরিবার এখন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। আমাদের ধারণা, হাসান মোল্লা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য প্রচার করে সবাইকে বিভ্রান্ত রাখছেন।
ইতালি প্রবাসী এসকে নোমান বলেন, হাসান মোল্লা আমার এক রুমমেটকে ভয়েজ মেসেজে জানিয়েছেন, নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তিনিও ৩৮ জন যুবকের বিষয়ে কোনো তথ্য জানেন না। অথচ ইতালি পাঠানোর জন্য সাগরে পাঠানোর পর তিনি যেসব অসামঞ্জস্য তথ্য দিচ্ছেন, তা এলাকায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এ ঘটনা নিয়ে লোকজন তাদের মতো করে ব্যাখ্যা ও প্রচারণা চালাচ্ছে। তথ্যের ভিন্নতা নিখোঁজ যুবকদের পরিবারেও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আরও বাড়াচ্ছে। কিন্তু হাসান মোল্লার ভয়ে তারা গণমাধ্যম বা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছেন না।
নিখোঁজ যুবকদের মধ্যে ১৪ জনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন- হবিগঞ্জ শহরে উমেদনগর এলাকার লকুছ মিয়া, আরমান আহমেদ ও বাবলু মিয়া, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পশ্চিমভাগের মানু শাহ, পারভেজ মিয়া, পবলু মিয়া, বানিয়াচং উপজেলার যাত্রাপাশা মহল্লার আলফাজ মিয়া রনি, মোজাক্কির আহমেদ, সিয়াম জমাদার, মিজান হাসান, মজলিসপুরের সায়েম খান, আদমখানীর রবিন মিয়া, এড়ালিয়াপাড়ার জসিম মিয়া ও আলফাজ আহমেদ রনি। বাকিরা আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ, জলসুখা ও বানিয়াচং উপজেলার তারাসই গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ইতালির উদ্দেশ্যে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে চারটি নৌকা ছেড়ে যায়। এর মধ্যে একটি নৌকায় হবিগঞ্জের ৩৮ জনসহ প্রায় ৯০ জন ছিলেন, সেই নৌকাটিই নিখোঁজ হয়েছে। বাকি তিনটি নৌকা ইতালিতে পৌঁছেছে।
আজমিরীগঞ্জের পশ্চিমভাগ গ্রামের লিবিয়া প্রবাসী হাসান আশরাফ ওরফে হাসান মোল্লার মাধ্যমে ওই ৩৮ জন ১৭ থেকে ২০ লাখ টাকা করে দিয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্যোগ নেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন দেশ থেকে লিবিয়ায় নিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের ইতালিতে পাঠানোর মধ্যস্থতা করতে হাসান মোল্লা একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছেন। মাত্র ছয় মাসে প্রায় এক হাজার মানুষকে ইতালিতে পাঠিয়ে তার নাম আন্তর্জাতিক মহলেও ছড়িয়ে পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ত্রিপলির উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগরের ১০ ঘণ্টার নৌপথে মানুষকে ইতালিতে পৌঁছে দিতেন হাসান। ছয় মাসের এই কর্মকাণ্ড থেকে তিনি শতকোটি টাকা আয় করেছেন। ৩৮ বাংলাদেশিসহ মোট ৯০ জন নিখোঁজ হওয়ার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে হাসানের এ ‘মানবপাচার ব্যবসা’।





















