‘মানুষের শ্রম, মানুষের জয়’ —মে দিবসে তূর্যশিকড়ের নান্দনিক আয়োজনে সংস্কৃতি ও চেতনার দীপ্ত সমাবেশ
- প্রকাশের সময় : ০২:২৬:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মে ২০২৬
- / 27
রাজধানী ঢাকায় মহান মে দিবস উপলক্ষে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তূর্যশিকড় আয়োজন করে এক মনোজ্ঞ ও বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান| ‘মানুষের শ্রম, মানুষের জয়’—এই তাৎপর্যপূর্ণ স্লোগানকে ধারণ করে শুক্রবার বিকেলে ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা, আবৃত্তি, সঙ্গীত, নৃত্য ও নাটকে সমৃদ্ধ এই আয়োজন| শিল্প ও সমাজচেতনার এক অনন্য সংলাপ যেন প্রাণ পায় পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে|
অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মফিদুল হক| সংগঠনের সভাপতি সুমনা শিল্পীর সভাপতিত্বে আয়োজিত এই সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজবাড়ী একাডেমির সভাপতি ˆসয়দ সিদ্দিকুর রহমান, অংকুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক গোলাম সরোয়ার এবং আবুল হোসেন কলেজের শিক্ষক মীরুনা বানু মুন| ¯^াগত বক্তব্য প্রদান করেন সংগঠনের উপদেষ্টা মাহফুজুর রহমান|
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে মে দিবসের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং বর্তমান সমাজে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন| তারা বলেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত না হলে একটি সমাজ কখনোই ন্যায়ভিত্তিক হতে পারে না| সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার মধ্য দিয়েও এই চেতনা জাগ্রত করা সম্ভব—এমন বিশ্বাসই তূর্যশিকড়ের মতো সংগঠনগুলোকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে|
আলোচনা শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে অতিথিদের শুভেচ্ছা স্মারক, উত্তরীয়, বই এবং ফুল দিয়ে সম্মাননা জানানো হয়| এ পর্বটি ছিল সম্মান ও কৃতজ্ঞতার এক উজ্জ্বল প্রকাশ|
দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় নান্দনিক সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে আবৃত্তি, গান, নৃত্য ও নাট্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে| আবৃত্তি পরিবেশন করেন আশরাফুল আলম, ডালিয়া আহমেদ, মাসকুরে সাত্তার কল্লোল, রবি শংকর ˆমত্রী এবং মজুমদার বিপ্লব| তাঁদের কণ্ঠে কবিতার উচ্চারণ যেন শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম ও ¯^প্নকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে|
এরপর একে একে জলতরঙ্গ, ¯^নন, তূর্যশিকড়, নৃত্য নিকেতন, ঢাকা ডান্স অ্যান্ড আর্ট সেন্টার এবং মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায় তাদের পরিবেশনার মাধ্যমে দর্শকদের হৃদয় জয় করে| প্রতিটি দলই নিজ¯^ ˆবশিষ্ট্যে অনন্য, আর তাদের সম্মিলিত উপস্থাপনা অনুষ্ঠানে এনে দেয় এক ˆবচিত্র্যময় রঙিন আবহ|
তূর্যশিকড়ের দলীয় আবৃত্তি ছিল বিশেষ আকর্ষণ| নীরম ও সুমনা শিল্পীর গ্রন্থনায় এবং সুমনা শিল্পীর নির্দেশনায় পরিবেশিত এই আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করেন আদ্রীতা, অংকন, সামান্তা, তুলি, তৃষা, চাদনী, মূর্ছনা, শ্বাশত শীলন, আলভী, সাবিত, ইকরা, মধুরিমা ফাল্গুনী, সামিন, মেহেরিমা ও জয়ী| তাঁদের সম্মিলিত কণ্ঠে আবৃত্তি যেন এক সুরেলা প্রতিবাদ ও আশার বাণী হয়ে ওঠে|
ওয়ার্দা আশরাফের গ্রন্থণা ও নির্দেশনায় সঙ্গীত পরিবেশন করেন অংকন, সুমেধা, সুধা, পূর্বা, মূর্ছনা ও চাঁদনী| গানের প্রতিটি সুরে ছিল আবেগ, ভালোবাসা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার ছোঁয়া|
জলতরঙ্গের পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন আলপনা ব্যানার্জি, ¯^প্না নন্দী, শান্তনু সাহা রায়, এনা রায়, জাকির হোসেন তপন, তানভীরা আশরাফ শ্যামা, শেফতা আলম অদিতি, মহুয়া সমাদ্দার, হিমেল বড়ুয়া, মনজুর রশিদ, ফারজানা ইয়াসমিন ও রামিসা চৌধুরী| তাদের পরিবেশনায় ছিল সুর ও ছন্দের মায়াবী মেলবন্ধন|
নৃত্য নিকেতন, জুয়েল কুমার সরকারের পরিচালনায়, উপস্থাপন করে প্রাণবন্ত নৃত্য পরিবেশনা| এতে অংশ নেন জুয়েল, আলিয়া মিথিলা, অথৈই, সুপ্তি, নিধি, যুথি, ˆবশাখী, শ্রীনিতি, অদ্রি, সংযুক্তা, প্রজাপতি, ইকবাল ও ফাইম| তাঁদের নৃত্যে উঠে আসে সংস্কৃতির ˆবচিত্র্য ও জীবনের উচ্ছ্বাস|
ঢাকা ড্যান্স অ্যান্ড আর্ট সেন্টারের পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন আফরিনা হক রিদি, আফিয়া আঞ্জুম, হৃদিতা সরকার, তানজিদার রহমান সুজলা, সুহাবা ইসলাম, মৃন্ময়ী ধর, ইউসরা এলাহি প্রিয়তি, সৌমিতা বণিক সূচী, মৌমিতা বণিক রিচি ও তাহিরা তাসিন| তাদের পরিবেশনা ছিল দৃষ্টিনন্দন ও আবেগঘন|
গানের তরী বাংলাদেশ দলের পরিবেশনায় অংশগ্রহণ করেন সুস্মিত সাইফ আহমেদ, পাপড়ি দাস, অদ্রি বর্মন, সায়মা সুমাইয়া, নাজমুল হোসেন পল্লব, ¯^প্নীল সরকার উৎস, রথীন বিশ্বাস, বিপাশা গুহ ও আবিদা রওশন প্রমা| তাঁদের সুরেলা পরিবেশনা অনুষ্ঠানে এনে দেয় সঙ্গীতের অনন্য আবহ|
মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায় পরিবেশন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের “ছাত্রের পরীক্ষা” নাটক, যেখানে অভিনয় করেন হাসান মাহমুদ সনেট ও সুশান্ত দেবনাথ শান্ত| নাটকটি দর্শকদের মাঝে হাস্যরসের পাশাপাশি শিক্ষামূলক বার্তাও পৌঁছে দেয়|
এছাড়া একক গান পরিবেশন করেন সোহানা আহমেদ এবং একক নৃত্য পরিবেশন করেন সরাতন তহুরা|
সবমিলিয়ে প্রতিটি সংগঠনের নান্দনিক ও ˆশল্পিক পরিবেশনায় অনুষ্ঠানটি হয়ে ওঠে এক প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক উৎসব| দর্শকরা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেন প্রতিটি মুহূর্ত|
তূর্যশিকড় নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এর দর্শন—‘তূর্য’ মানে জাগরণ, আহ্বান ও সূচনা; আর ‘শিকড়’ মানে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত্তি| এই দুইয়ের সম্মিলনেই তূর্যশিকড়—যেখানে ঐতিহ্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে নতুন বোধের জাগরণ ঘটে| এটি একটি নিরন্তর সৃজনশীল যাত্রা, যেখানে শিল্প হয়ে ওঠে সমাজ পরিবর্তনের ভাষা|
সংগঠনটি বিশ্বাস করে, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি একটি শক্তিশালী সামাজিক হাতিয়ার| ঐতিহ্যের শিকড়ে দাঁড়িয়ে নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে সৃজনশীলতা, সচেতনতা ও মানবিকতার পথে এগিয়ে যাওয়াই তাদের লক্ষ্য|
বিশিষ্ট আবৃত্তি শিল্পী এবং রাজবাড়ীর কৃতি সন্তান সুমনা শিল্পীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা তূর্যশিকড় ইতোমধ্যেই তার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে| এই আয়োজনও তারই আরেকটি উজ্জ্বল প্রমাণ, যা ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে সংস্কৃতিচর্চার পথ প্রশস্ত করবে বলে আশা করা যায়|

















