আতঙ্ক আর দীর্ঘশ্বাস ক্রমশঃ বাড়ছে
- প্রকাশের সময় : ০৭:৫৮:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩ অক্টোবর ২০২১
- / 222
জনতার আদালত অনলাইন ॥ ভাঙন থামছেই না পদ্মা নদীর। ভাঙন ঠেকাতে ৩৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মার ডান তীর সংরক্ষণ বাঁধ দেওয়া হয়েছিল তা কোনো কাজেই আসলো না। শুক্রবার বিকেল থেকে গোদারবাজারের পশ্চিমে রাজবাড়ী পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডের ধুঞ্চি গ্রামে শুরু হওয়া ভাঙনে সিসি ব্লক ধসে লম্বায় প্রায় দুশ মিটার এলাকা বিলীন হয়েছে। নদীগর্ভে চলে গেছে তিনটি পরিবারের বসতঘর, গাছপালা। নদীর একটি অংশ স্পর্শ করেছে বেরিবাঁধ। মিজানপুর ইউনিয়ন পেরিয়ে নদী এখন পৌরসভার ৯ নং ওয়ার্ডে। ভাঙন হুমকিতে রয়েছে অর্ধ শতাধিক ঘর-বাড়ি, মসজিদ, গাছাপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে বেরিবাঁধ। যা নিয়ে উদ্বিগ্ন শহরবাসীও। আতঙ্ক, উদ্বেগ আর দীর্ঘশ^াস ক্রমশঃ বাড়ছে মানুষের। পানি উন্নয়ন বোর্ড বরাবরের মতই বলছে, ভাঙন নিয়ে আতঙ্কের কিছু নেই।
শনিবার বেলা ১১টার দিকে ভাঙনস্থলে গিয়ে দেখা যায়, অনেক মানুষ সেখানে ভিড় জমিয়েছে। ভাঙন দেখতে আসা মানুষগুলোর চোখে মুখে আতঙ্ক। কারো কারো চোখে জল। নদীতে একটি বাঁশঝাড় ভাসছে। যেটি শুক্রবার বিলীন হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে অবস্থান করছেন। রয়েছেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লোকেরাও। শ্রমিকরা বালুর বস্তা ফেলার কাজ করছেন। ভাঙন আতঙ্কে থাকা নদীপাড়ের কয়েকটি পরিবার বাড়িঘর সরিয়ে নিচ্ছে। কেটে ফেলছে গাছপালা। আবালবৃদ্ধ বনিতা কারো মনেই শান্তির রেশটুকু নেই। কোথায় ঘর বাঁধবেন, কোথায় ঠাঁই নেবেন এই দুশ্চিন্তা সবার মাঝে। বেরিবাঁধের সাথেই ভিটেমাটি আছে। ঘরটি মাত্রই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে। সেখানেই এক নারীকে দেখা যায় এদিক ওদিক ঘুরতে। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন। কখনও গুল্মলতা সরাচ্ছেন কখনও নদীর দিকে যাচ্ছেন। এসময় কথা হয় তার সাথে। নাম জানালেন তুলা বেগম। স্বামী আয়নাল হোসেন মাছ ধরে জীবীকা নির্বাহ করেন। ছেলেমেয়ে নিয়ে চারজনের সংসার। অশ্রুসজল নয়নে জানান, বছর চারেক আগে এখানে বাড়ি করেিেছলেন। তাদের বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরেই ছিল নদী। পাড় বাঁধানো থাকায় কিছুটা চিন্তামুক্তও ছিলেন। কিন্তু শুক্রবার আসরের আজানের পর থেকে পদ্মার ভাঙন শুরু হয়। ভাঙতে ভাঙতে ঘরের কাছে চলে আসে। উপায় না পেয়ে সন্ধ্যা থেকেই ঘর ভেঙে সরাতে শুরু করেন। বেরিবাঁধের ওই পাশে একটি খোলা জায়গায় রেখেছেন সরিয়ে নেওয়া ঘর। রাতে রান্না করতে না পারায় মিলাদের খিচুরি খেয়েছেন সবাই। রাত কাটিয়েছেন দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় বাড়িতে। সেখানে জড়োসরো হয়ে ঘুমিয়েছিলেন সবাই। সকালে রান্নাও হয়নি খাওয়াও হয়নি। এখন পরিবার নিয়ে তারা কোথায় যাবেন কী করবেন? এই চিন্তায় কিছু ভালো লাগছে না। দুপুরে খাওয়া হবে কীনা তাও তিনি জানেন না।
ভাঙনে বসতঘর বিলীন হয়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত লিপি বেগম জানালেন, তাদের বসত ঘর থেকে নদী অন্ততঃ ৩০ ফুট দূরে ছিল। পদ্মার ভাঙনের তীব্রতা এতোটাই ছিল যে, দেখতে দেখতে নদীতে তার ঘরটি বিলীন হয়ে যায়। পরিবার পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে আছেন তারা।
রফিক ব্যাপারী নামে এক ব্যক্তি জানান, মাত্রই কদিন আগে শখ করে নতুন বাড়ি করেছিলেন। যেভাবে নদী ভাঙছে তাতে তার শখের বাড়ি আর ঠেকাতে পারবেন না।
বেরিবাঁধের ওপাড়ে বসবাসকারী আজিজ সরদার, দুলাল কাজী বলেন, নদী ভাঙতে ভাঙতে রেরি বাঁধ ধরে ফেলেছে। যে কোনো সময় বেরি বাঁধ ভেঙে যেতে পারে। তখন আমরাও আর নিরাপদে থাকতে পারবোনা। আমরা খুবই ভয়ে আছি। যে কোনো মূল্যে বেরি বাঁধ রক্ষার দাবি জানান তারা।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ বলেন, শুক্রবার বিকেল থেকে পদ্মার ভাঙন শুরু হয়। আমাদের কর্মকর্তা কর্মচারীরা সাইটে উপস্থিত ছিলেন। ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় ঠিকাদারকে দিয়ে জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করি। আমাদের বেরি বাঁধ এখনও নিরাপদে আছে। শুক্রবার বিকেল থেকে প্রায় সাতশ বস্তা বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। শনিবার সকাল থেকেও একাজ চলমান আছে। এছাড়া জিও টিউব দিয়ে ভাঙন ঠেকাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি এবং ভাঙন প্রতিরোধে যা যা করার দরকার তা করবো। সর্বশেষ আমরা এই এলাকাটা সার্ভে করে ডিজাইন ডাটা প্রণয়ন করেছি। ডিজাইনের যে ভলিউম এবং ডিজাইন যুগোপোযোগী এবং টেকসই করার জন্য ডিজাইন ডিরেক্টরের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। ভাঙন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাঙন এলাকা পরিদর্শনে আসার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, পদ্মা নদীর ভাঙন ঠেকাতে ৩৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার কিলোমিটার জুড়ে ডান তীর সংরক্ষণ কাজ করা হয়। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া কাজ সম্পন্ন হয়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান থেকে তারা এখনও কাজ বুঝে নেয়নি। চলমান কাজের মধ্যেই গত ১৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্ততঃ ১৪ দফা ভাঙনে দেড় হাজার মিটার এলাকার সিসি ব্লক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। রক্ষা করা যায়নি চরসিলিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনটিও।
























