Dhaka ০২:২৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:

নজর কাড়ছে কসাই রিপনের পশুর মাথার শোপিস

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৮:৫৫:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • / 21

পেশায় তিনি একজন কসাই। তবে গবাদিপশুর মাথাকে শৈল্পিক শোপিসে রূপ দিয়ে এলাকায় তৈরি করেছেন ভিন্ন এক পরিচয়। রাজশাহীর ৪০ বছর বয়সী রিপন আলী গত প্রায় এক দশক ধরে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাথা সংগ্রহ করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করছেন দৃষ্টিনন্দন শোপিস। বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে শতাধিক এমন শিল্পকর্ম, যা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা।

রোববার (৮ জুন) বিকেলে রিপন আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন গবাদিপশুর শিংসহ মাথা। বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা এসব শোপিস অনেকটা জীবন্ত বলে মনে হয়। প্রচলিত মাটি কিংবা কাঠের শোপিসের বাইরে গিয়ে পশুর মাথাকে শিল্পকর্মে রূপ দেওয়ার এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

রিপন আলী জানান, কসাইয়ের কাজ করতে গিয়ে রাজশাহীর শালবাগান কসাইপট্টিতে একদিন বড় শিংওয়ালা একটি মহিষের মাথা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখানে শিং আলাদা করে ফেলে দেওয়া হলেও তিনি সেটি সংগ্রহ করেন। পরে বন্ধুদের উৎসাহে প্রাণীর মাথা সংরক্ষণ করে শোপিস তৈরির ভাবনা মাথায় আসে। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা।

তিনি বলেন, “শুরুর দিকে অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। পরিবারের সদস্যরাও পশুর হাড়ের দুর্গন্ধ ও এই কাজে অর্থ ব্যয়ের কারণে বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু এখন সবাই আমার কাজের প্রশংসা করেন।”

রিপনের ভাষ্য, এই শিল্পকর্ম তৈরির সঠিক পদ্ধতি জানতে তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছেন। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিজের প্রচেষ্টায় তিনি পশুর মাথা সংরক্ষণ ও শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনের একটি কার্যকর পদ্ধতি আয়ত্ত করেছেন।

তিনি আরও জানান, তার ব্যবহৃত সব উপকরণই দেশীয় গৃহপালিত পশুর। বাজার থেকে সংগ্রহ করা গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাথা দিয়েই তিনি এসব শোপিস তৈরি করেন। কোনোভাবেই বাঘ, হরিণসহ নিষিদ্ধ বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করা হয় না।

রিপনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা থেকে আসা মোকসেদ আলী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই জানি রিপন এসব তৈরি করে। এগুলো খুবই মূল্যবান এবং যত্নের কাজ। পছন্দ হলে একটি সংগ্রহ করব।”

দর্শনার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “অনেক ধরনের শোপিস দেখেছি, কিন্তু পশুর মাথা ও শিং দিয়ে তৈরি শোপিস এই প্রথম দেখলাম। আইডিয়াটা সত্যিই ব্যতিক্রমী।”

চারঘাট থেকে আসা রাম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “বড়লোকদের বাসায় হরিণের মাথা বা চামড়া দিয়ে তৈরি শোপিস দেখা যায়। কিন্তু গৃহপালিত পশুর মাথাকে এভাবে সংরক্ষণ করে শৈল্পিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”

নিজের এই উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখছেন রিপন আলী। তার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর হাড় ও মাথা দিয়ে তৈরি শোপিস সহজলভ্য হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের প্রবণতা কমবে এবং অবৈধ শিকার নিরুৎসাহিত হবে। পাশাপাশি এ খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

রিপনের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলে তার এই উদ্যোগ একদিন নতুন সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হবে। বর্তমানে উপহাসের সেই দিন পেরিয়ে তার সংগ্রহশালা হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

নজর কাড়ছে কসাই রিপনের পশুর মাথার শোপিস

প্রকাশের সময় : ০৮:৫৫:০২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

পেশায় তিনি একজন কসাই। তবে গবাদিপশুর মাথাকে শৈল্পিক শোপিসে রূপ দিয়ে এলাকায় তৈরি করেছেন ভিন্ন এক পরিচয়। রাজশাহীর ৪০ বছর বয়সী রিপন আলী গত প্রায় এক দশক ধরে গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাথা সংগ্রহ করে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করছেন দৃষ্টিনন্দন শোপিস। বর্তমানে তার সংগ্রহে রয়েছে শতাধিক এমন শিল্পকর্ম, যা দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা।

রোববার (৮ জুন) বিকেলে রিপন আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি কক্ষে থরে থরে সাজানো রয়েছে বিভিন্ন গবাদিপশুর শিংসহ মাথা। বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা এসব শোপিস অনেকটা জীবন্ত বলে মনে হয়। প্রচলিত মাটি কিংবা কাঠের শোপিসের বাইরে গিয়ে পশুর মাথাকে শিল্পকর্মে রূপ দেওয়ার এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে।

রিপন আলী জানান, কসাইয়ের কাজ করতে গিয়ে রাজশাহীর শালবাগান কসাইপট্টিতে একদিন বড় শিংওয়ালা একটি মহিষের মাথা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখানে শিং আলাদা করে ফেলে দেওয়া হলেও তিনি সেটি সংগ্রহ করেন। পরে বন্ধুদের উৎসাহে প্রাণীর মাথা সংরক্ষণ করে শোপিস তৈরির ভাবনা মাথায় আসে। সেই ভাবনা থেকেই ২০১৭ সালে শুরু হয় তার নতুন যাত্রা।

তিনি বলেন, “শুরুর দিকে অনেকেই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করত। পরিবারের সদস্যরাও পশুর হাড়ের দুর্গন্ধ ও এই কাজে অর্থ ব্যয়ের কারণে বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু এখন সবাই আমার কাজের প্রশংসা করেন।”

রিপনের ভাষ্য, এই শিল্পকর্ম তৈরির সঠিক পদ্ধতি জানতে তিনি দীর্ঘদিন বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়েছেন। বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিজের প্রচেষ্টায় তিনি পশুর মাথা সংরক্ষণ ও শৈল্পিকভাবে উপস্থাপনের একটি কার্যকর পদ্ধতি আয়ত্ত করেছেন।

তিনি আরও জানান, তার ব্যবহৃত সব উপকরণই দেশীয় গৃহপালিত পশুর। বাজার থেকে সংগ্রহ করা গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়ার মাথা দিয়েই তিনি এসব শোপিস তৈরি করেন। কোনোভাবেই বাঘ, হরিণসহ নিষিদ্ধ বন্যপ্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করা হয় না।

রিপনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন। রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা থেকে আসা মোকসেদ আলী বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই জানি রিপন এসব তৈরি করে। এগুলো খুবই মূল্যবান এবং যত্নের কাজ। পছন্দ হলে একটি সংগ্রহ করব।”

দর্শনার্থী সুমাইয়া আক্তার বলেন, “অনেক ধরনের শোপিস দেখেছি, কিন্তু পশুর মাথা ও শিং দিয়ে তৈরি শোপিস এই প্রথম দেখলাম। আইডিয়াটা সত্যিই ব্যতিক্রমী।”

চারঘাট থেকে আসা রাম নামের এক দর্শনার্থী বলেন, “বড়লোকদের বাসায় হরিণের মাথা বা চামড়া দিয়ে তৈরি শোপিস দেখা যায়। কিন্তু গৃহপালিত পশুর মাথাকে এভাবে সংরক্ষণ করে শৈল্পিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।”

নিজের এই উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখছেন রিপন আলী। তার বিশ্বাস, গৃহপালিত পশুর হাড় ও মাথা দিয়ে তৈরি শোপিস সহজলভ্য হলে বন্যপ্রাণীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগ্রহের প্রবণতা কমবে এবং অবৈধ শিকার নিরুৎসাহিত হবে। পাশাপাশি এ খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে।

রিপনের প্রত্যাশা, সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেলে তার এই উদ্যোগ একদিন নতুন সম্ভাবনাময় শিল্পে পরিণত হবে। বর্তমানে উপহাসের সেই দিন পেরিয়ে তার সংগ্রহশালা হয়ে উঠেছে দর্শনার্থীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।