সাপ দংশন করলেই কি মানুষ মারা যায়?
- প্রকাশের সময় : ০৫:৪৩:০৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
- / 31
মানুষের কাছে সাপ এক আতঙ্কের নাম। হাত-পা বিহীন এই সরীসৃপ প্রাণীকে ঘিরে যুগ যুগ ধরে প্রচলিত রয়েছে নানা মিথ, ভ্রান্ত ধারণা ও কুসংস্কার। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এখনও অনেকেই মনে করেন, সাপে কামড়ালেই মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, সাপ দংশন মানেই মৃত্যু নয়। জীবন-মৃত্যুর বিষয়টি নির্ভর করে সাপের প্রজাতি, বিষের ধরন ও মাত্রা, দংশনের স্থান এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।
বন্যপ্রাণী গবেষক আদনান আজাদ আসিফ জানান, বাংলাদেশে প্রায় ৮০ প্রজাতির সাপ রয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই নির্বিষ। বিষধর সাপের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। প্রতিবছর সাপের দংশনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এর সবগুলো বিষক্রিয়ার কারণে নয়। অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্ক, হৃদরোগ বা চিকিৎসা নিতে বিলম্ব করার কারণেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
বিষধর ও নির্বিষ সাপের পার্থক্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপকে সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—
নির্বিষ (Non-venomous)
ক্ষীণ বিষধর (Mildly venomous)
মারাত্মক বিষধর (Highly venomous)
নির্বিষ ও অধিকাংশ ক্ষীণ বিষধর সাপের দংশনে সাধারণত মানুষের মৃত্যু হয় না। তবে শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ বা গুরুতর হৃদরোগে আক্রান্ত কেউ ভয় ও আতঙ্কের কারণে জটিল অবস্থায় পড়তে পারেন।
কোন সাপ কতটা বিপজ্জনক?
আদনান আজাদ আসিফ বলেন, দেশে গোখরা বা কোবরা সাপের তিনটি প্রজাতি রয়েছে। এরা সবসময় দংশনের সময় বিষ প্রয়োগ করে না। অনেক ক্ষেত্রে আত্মরক্ষামূলক দংশনে বিষ ছাড়াই কামড় দিতে পারে। তবে নিজেদের জন্য বড় ধরনের হুমকি মনে করলে বিষ প্রয়োগ করে।
অন্যদিকে কমন ক্রেইট বা কালাচকে তিনি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ এ সাপের দংশন অনেক সময় ব্যথাহীন হয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না যে তিনি বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়েছেন। অথচ এর বিষ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে।
সাপের বিষ কীভাবে কাজ করে?
সাপে কাটা রোগীদের নিয়ে কাজ করা চিকিৎসক ডা. সাকিত মাহমুদ বলেন, সাপের বিষ মূলত রূপান্তরিত লালা, যা বিষথলিতে জমা থাকে এবং বিশেষ দাঁতের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। বিষধর সাপের দাঁত অনেকটা ইনজেকশনের সূঁচের মতো কাজ করে।
তার মতে, সাপের বিষ প্রধানত চার ধরনের বিষক্রিয়ার মাধ্যমে মানবদেহে প্রভাব ফেলে—
হেমোটক্সিন : রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি করে এবং বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। এটি সাধারণত ভাইপার জাতীয় সাপের বিষে থাকে।
নিউরোটক্সিন : স্নায়ুতন্ত্র ও মাংসপেশিকে অচল করে দেয়। শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি বিকল হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে। গোখরা, কেউটে ও কালাচের বিষে এ ধরনের টক্সিন থাকে।
কার্ডিওটক্সিন : হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে।
সাইটোটক্সিন : দংশনস্থলের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত করে, ফোলা সৃষ্টি করে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে কিডনির ক্ষতি করতে পারে।
কেন প্রয়োজন অ্যান্টিভেনম?
ডা. সাকিত মাহমুদ বলেন, মানবদেহে বিভিন্ন জীবাণু ও বিষাক্ত উপাদানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকলেও সাপের বিষ নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে নেই। এজন্য বিষধর সাপের দংশনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় অ্যান্টিস্নেক ভেনম বা অ্যান্টিভেনম।
এই বিশেষ সিরাম শরীরে প্রবেশ করানোর মাধ্যমে বিষের বিরুদ্ধে কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং বিষক্রিয়া নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে। তাই বিষধর সাপের দংশনের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিভেনম প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি।
নির্বিষ সাপের কামড়েও কেন মৃত্যু হয়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীতে নির্বিষ ও ক্ষীণ বিষধর সাপের সংখ্যাই বেশি। এদের দংশনে সাধারণত ক্ষতস্থানে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা সামান্য ফোলাভাব দেখা যায়।
তবে দুর্বলচিত্ত ব্যক্তি, গুরুতর হৃদরোগী, বয়স্ক মানুষ কিংবা অতিরিক্ত ভীতু কেউ আতঙ্কের কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারেন। অনেক সময় এই ধরনের মৃত্যু ভুলভাবে সাপের বিষক্রিয়াজনিত মৃত্যু হিসেবে প্রচারিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপ দংশন করলেই মৃত্যু অবধারিত—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। অধিকাংশ সাপই নির্বিষ, আর বিষধর সাপের কামড়েও দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা পেলে সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব। তাই সাপে কাটলে ওঝা, ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের আশ্রয় না নিয়ে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়াই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।






















