সাপ দংশন করলেই কি মানুষ মারা যায়?
- প্রকাশের সময় : ০৯:৪৯:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
- / 188
মানুষের কাছে সাপ এক আতঙ্কের নাম। হাত-পা বিহীন সরীসৃপ এই প্রাণী নিয়ে প্রচলিত রয়েছে নানা মিথ ও কুসংস্কার। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে এখনও অনেকে বিশ্বাস করেন, সাপে কামড়ালেই মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, সাপ দংশন মানেই মৃত্যু নয়। এটি নির্ভর করে সাপের প্রকারভেদ, বিষের মাত্রা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর।
বাংলাদেশে সাপের প্রজাতি
বন্যপ্রাণী গবেষক আদনান আজাদ আসিফ জানান, দেশে প্রায় ৮০ প্রজাতির সাপ রয়েছে, এর মধ্যে অধিকাংশই নির্বিষ। বিষধর সাপের সংখ্যা ১০ শতাংশেরও কম। প্রতিবছর সাপের দংশনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও তার বড় অংশই আতঙ্কে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে ঘটে, নির্বিষ সাপের কামড়ে নয়।
বিষধর ও নির্বিষ সাপের পার্থক্য
সাপকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়—
-নির্বিষ বা বিষহীন সাপ
-ক্ষীণ বিষধর সাপ
-মারাত্মক বিষধর সাপ
ক্ষীণ বিষধর সাপের কামড়ে সাধারণত জীবনহানি হয় না। তবে দুর্বল দেহগঠন বা বারবার দংশনের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। নির্বিষ বা ক্ষীণ বিষধর সাপের দংশনে আতঙ্কিত হয়ে কেউ কেউ হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতে পারেন।
কোন সাপ কতটা বিপজ্জনক
বিষধর সাপের দংশনের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিষ প্রতিষেধক প্রয়োজন। তবে ক্ষীণ বিষধর সাপ যদি বারবার দংশন করে এবং রোগীর শারীরিক গঠন যদি দুর্বল হয় সেক্ষেত্রে তার কিছুটা সমস্যা হতে পারে। নির্বিষ বা ক্ষীণ বিষধর সাপের দংশনে মানুষের মৃত্যু হয় না। সুতরাং কেউ যদি বিষধর সাপের কামড়ে আক্রান্ত হন তাহলে তাকে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকরে পরামর্শ অনুযায়ী বিষ প্রতিষেধক নিতে হবে।
তিনি জানান, দেশে কোবরা বা গোখরা সাপের তিন প্রজাতি রয়েছে। এরা সাধারণত দংশন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিষ অপচয় করতে পছন্দ করে না। এদের প্রায় ৫০ শতাংশ দংশন বিষহীন হয়। এরা নিজেদের জন্য ক্ষতিকর মনে করলে দংশন দেওয়ার সময় পুরো বিষ ঢেলে দেয়। তবে এক্ষেত্রে একদম উল্টো হলো কমন ক্রেইট বা কালাচ। এরা নীরব ঘাতক। এরা প্রতিটি দংশনে ১০০ শতাংশ বিষ ঢেলে থাকে।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ডা. সাকিত মাহমুদ জানান, সাপের বিষ মূলত রূপান্তরিত লালা, যা মুখের ভেতরের বিষথলিতে জমা থাকে এবং দাঁতের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। বিষধর সাপের একজোড়া দাঁত অনেকটা ইঞ্জেকশন সিরিঞ্জের মতো যা দিয়ে তারা বিষ ঢেলে দেয়। বিষ প্রয়োগ করার পুরো প্রক্রিয়ায় কখনো কখনো এক সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে।
তিনি জানান, সাপের বিষ চার ধরনের টক্সিনের মাধ্যমে দেহে প্রভাব ফেলে—
হেমোটক্সিন্স: রক্তে অস্বাভাবিক জমাট বাঁধিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নষ্ট করে (ভাইপার শ্রেণির সাপ)।
নিউরোটক্সিন্স: স্নায়ুতন্ত্র ও মাংসপেশি অবশ করে, শ্বাসযন্ত্র বিকল করে মৃত্যু ঘটাতে পারে (গোখরা, কেউটে, ক্রেইট)।
কার্ডিওটক্সিন্স: সরাসরি হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ করে দিতে সক্ষম।
সাইটোটক্সিন: দংশনস্থলে ফোলা, মাংসপেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা বা কিডনি বিকল করতে পারে।
ডা. সাকিত মাহমুদ বলেন, সব প্রাণীরই বাইরে থেকে আসা বিভিন্ন জীবাণু/টক্সিন/এন্টিজেন- যা প্রাণীর শরীরে অনুপ্রবেশ করে, তার থেকে মুক্তির জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইমিউনো সিস্টেম রয়েছে। আমাদের শরীরে বাইরে থেকে কোনো রোগ জীবাণু প্রবেশ করলে শরীর নিজে থেকেই তার অ্যান্টিবডি তৈরি করে নেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য; সাপের বিষ শরীরে প্রবেশ করলে তা নিষ্ক্রিয় করার ক্ষমতা মানব শরীরে নেই। তখন প্রয়োজন হয় বাইরে থেকে টক্সিন নিউট্রিলাইজার এন্টিবডি সমৃদ্ধ সিরাম মানব শরীরে প্রবেশ করানো। এই এন্টিস্নেক ভেনম সিরাম মানব শরীরে প্রবেশ করালে রক্তে বিদ্যমান এন্টিবডির মাত্রা অতিমাত্রায় বেড়ে সাপের বিষকে নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়।
এদিকে নির্বিষ বা ক্ষীণ বিষধর সাপের দংশনের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, পৃথিবীতে নির্বিষ বা ক্ষীণবিষধর সাপের পরিমাণই বেশি। এদের বেশির ভাগ কলুব্রিড পরিবারের। এদের দংশনে ক্ষতস্থানে জ্বালাপোড়া, ফুলে যাওয়া ছাড়া তেমন বিশেষ সমস্যা হয় না। তবে নির্বিষ বা ক্ষীণ বিষধর সাপের দংশনেও দুর্বল চিত্তের মানুষের কিংবা আগে হৃদরোগ রয়েছে, অতি বৃদ্ধ, এমন লোকদের আতঙ্কজনিত কারণে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া হঠাৎ বন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে।
তাই সাপ দংশন করলেই যে মৃত্যু অবধারিত, তা নয়। অধিকাংশ সাপ নির্বিষ, আবার বিষধর সাপও সবসময় প্রাণঘাতী হয় না। সঠিক চিকিৎসা, দ্রুত প্রতিষেধক প্রয়োগ এবং আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠাই জীবন রক্ষার মূল উপায়।





















