Dhaka ১১:৩৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরুষ প্রমাণিত হওয়ায় দুই নারী অ্যাথলেট আজীবন নিষিদ্ধ

স্টাফ রিপোর্টার
  • প্রকাশের সময় : ০৯:৪১:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / 3

শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কত হলে একজন অ্যাথলেট নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার যোগ্যতা হারাবেন এ নিয়ে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এবার বাংলাদেশেও এমন একটি সিদ্ধান্ত এসেছে। অ্যাথলেট জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে নারীদের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন।

ফেডারেশন সূত্রের দাবি, পরীক্ষায় দুজনের শরীরে সাধারণত নারীদের মধ্যে পাওয়া মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি টেস্টোস্টেরন শনাক্ত হয়েছে। মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন এবং বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের বিধিমালা পর্যালোচনার পর তাঁদের নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের অর্জিত পদক ও রেকর্ড বাতিলের সিদ্ধান্তও নিয়েছে ফেডারেশন।

জান্নাত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এবং কবিতা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হয়ে প্রতিযোগিতা করতেন। তাঁদের প্রতিযোগিতার যোগ্যতা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বিতর্ক চলছিল। অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ফেডারেশন।

বিষয়টি তদন্তে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ড ১১ মে কাজ শেষ করে এবং ১৬ মে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সভায় দুই অ্যাথলেটকে নারী বিভাগে প্রতিযোগিতা থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

জ্যাভলিন ও ডিসকাস থ্রোতে জাতীয় রেকর্ড গড়েছিলেন জান্নাত। তাঁর ঝুলিতে ছিল আটটি স্বর্ণ, একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ পদক। অন্যদিকে কবিতা ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪×১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে একটি স্বর্ণ, একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। ফেডারেশনের সিদ্ধান্তে তাঁদের পদক ও রেকর্ড বাতিল করা হয়েছে।

তবে শুধু টেস্টোস্টেরনের মাত্রা দিয়ে কারও সামগ্রিক লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করা যায় না। নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট মেডিকেল ও প্রতিযোগিতামূলক মানদণ্ড অনুসরণ করে। এসব বিধির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, প্রয়োগপদ্ধতি ও মানবিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্র বিতর্ক রয়েছে।

এই বিতর্কের অন্যতম আলোচিত নাম দক্ষিণ আফ্রিকার দৌড়বিদ ক্যাস্টার সেমেনিয়া। ২০১৯ সালে ক্রীড়া সালিশি আদালতে হেরে যাওয়ার পর তিনি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০২৩ সালে আদালতের একটি চেম্বার তাঁর পক্ষে রায় দিলেও সুইজারল্যান্ড সরকার সেটি গ্র্যান্ড চেম্বারে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে।

২০২৫ সালের ১০ জুলাই দেওয়া রায়ে গ্র্যান্ড চেম্বার জানায়, সুইস ফেডারেল ট্রাইব্যুনাল সেমেনিয়ার আপত্তি যথেষ্ট কঠোরভাবে পর্যালোচনা না করায় ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে। তবে আদালত বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের ডিএসডি-সংক্রান্ত বিধিমালার বৈধতা নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেননি।

বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন বলছে, তাদের সিদ্ধান্ত চিকিৎসা প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক বিধিমালার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। তারপরও মানবিক প্রশ্নটি থেকে যায়। জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন অ্যাথলেট বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার পর হঠাৎ নিজের বিভাগে অংশগ্রহণের অধিকার হারালে সেটি কতটা ন্যায্য, আর কতটা অনিবার্য জীববৈজ্ঞানিক বাস্তবতার নির্মম পরিণতি সে উত্তর কেবল মেডিকেল রিপোর্টের সংখ্যায় পাওয়া সম্ভব নয়।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

পুরুষ প্রমাণিত হওয়ায় দুই নারী অ্যাথলেট আজীবন নিষিদ্ধ

প্রকাশের সময় : ০৯:৪১:০৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

শরীরে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কত হলে একজন অ্যাথলেট নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার যোগ্যতা হারাবেন এ নিয়ে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এবার বাংলাদেশেও এমন একটি সিদ্ধান্ত এসেছে। অ্যাথলেট জান্নাত বেগম ও কবিতা রায়কে নারীদের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন।

ফেডারেশন সূত্রের দাবি, পরীক্ষায় দুজনের শরীরে সাধারণত নারীদের মধ্যে পাওয়া মাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি টেস্টোস্টেরন শনাক্ত হয়েছে। মেডিকেল বোর্ডের প্রতিবেদন এবং বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের বিধিমালা পর্যালোচনার পর তাঁদের নারী বিভাগে প্রতিযোগিতার অযোগ্য ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি তাঁদের অর্জিত পদক ও রেকর্ড বাতিলের সিদ্ধান্তও নিয়েছে ফেডারেশন।

জান্নাত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এবং কবিতা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হয়ে প্রতিযোগিতা করতেন। তাঁদের প্রতিযোগিতার যোগ্যতা নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই বিতর্ক চলছিল। অভিযোগ ওঠার পর বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরীক্ষার ফল পাওয়ার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় ফেডারেশন।

বিষয়টি তদন্তে গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। বোর্ড ১১ মে কাজ শেষ করে এবং ১৬ মে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সভায় দুই অ্যাথলেটকে নারী বিভাগে প্রতিযোগিতা থেকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

জ্যাভলিন ও ডিসকাস থ্রোতে জাতীয় রেকর্ড গড়েছিলেন জান্নাত। তাঁর ঝুলিতে ছিল আটটি স্বর্ণ, একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ পদক। অন্যদিকে কবিতা ১০০ মিটার, ২০০ মিটার ও ৪×১০০ মিটার রিলে ইভেন্টে একটি স্বর্ণ, একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন। ফেডারেশনের সিদ্ধান্তে তাঁদের পদক ও রেকর্ড বাতিল করা হয়েছে।

তবে শুধু টেস্টোস্টেরনের মাত্রা দিয়ে কারও সামগ্রিক লিঙ্গপরিচয় নির্ধারণ করা যায় না। নারী বিভাগে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট মেডিকেল ও প্রতিযোগিতামূলক মানদণ্ড অনুসরণ করে। এসব বিধির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, প্রয়োগপদ্ধতি ও মানবিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে তীব্র বিতর্ক রয়েছে।

এই বিতর্কের অন্যতম আলোচিত নাম দক্ষিণ আফ্রিকার দৌড়বিদ ক্যাস্টার সেমেনিয়া। ২০১৯ সালে ক্রীড়া সালিশি আদালতে হেরে যাওয়ার পর তিনি ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের দ্বারস্থ হন। ২০২৩ সালে আদালতের একটি চেম্বার তাঁর পক্ষে রায় দিলেও সুইজারল্যান্ড সরকার সেটি গ্র্যান্ড চেম্বারে পুনর্বিবেচনার আবেদন করে।

২০২৫ সালের ১০ জুলাই দেওয়া রায়ে গ্র্যান্ড চেম্বার জানায়, সুইস ফেডারেল ট্রাইব্যুনাল সেমেনিয়ার আপত্তি যথেষ্ট কঠোরভাবে পর্যালোচনা না করায় ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ লঙ্ঘিত হয়েছে। তবে আদালত বিশ্ব অ্যাথলেটিকসের ডিএসডি-সংক্রান্ত বিধিমালার বৈধতা নিয়ে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেননি।

বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকস ফেডারেশন বলছে, তাদের সিদ্ধান্ত চিকিৎসা প্রতিবেদন ও আন্তর্জাতিক বিধিমালার ভিত্তিতেই নেওয়া হয়েছে। তারপরও মানবিক প্রশ্নটি থেকে যায়। জন্মগত শারীরিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে বেড়ে ওঠা একজন অ্যাথলেট বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার পর হঠাৎ নিজের বিভাগে অংশগ্রহণের অধিকার হারালে সেটি কতটা ন্যায্য, আর কতটা অনিবার্য জীববৈজ্ঞানিক বাস্তবতার নির্মম পরিণতি সে উত্তর কেবল মেডিকেল রিপোর্টের সংখ্যায় পাওয়া সম্ভব নয়।