গণধর্ষণের ৪৩ দিন পর মৃত্যু, ভিডিওতে অভিযুক্তদের নাম বলে গেছেন কিশোরী

- প্রকাশের সময় : ০৫:০৫:৫৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / 33

বাঁ থেকে লাল বৃত্তে অভিযুক্ত দুই কিশোর, ডানে মারা যাওয়া কিশোরী
ফরিদপুরের মধুখালীতে স্কুলে যাওয়ার পথে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে চার যুবকের বিরুদ্ধে। ঘটনার পর গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়া ওই কিশোরী ৪৩ দিন পর নিজ বাড়িতে মারা গেছে। মৃত্যুর আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে ঘটনার বর্ণনা দিয়ে অভিযুক্তদের নাম প্রকাশ করেছে সে। ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ধর্ষণের অভিযোগ অস্বীকার করেছে পুলিশ।
নিহত মিথিলা আক্তার (১৭) মধুখালী উপজেলার আড়পাড়া ইউনিয়নের রাজধরপুর গ্রামের হান্নান শেখের মেয়ে। সে আড়পাড়া কাজী সিরাজুল ইসলাম স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। গত ২৬ অক্টোবর দিবাগত রাত ১টার দিকে নিজ বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা না নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয় মিথিলা। ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের রাজধরপুর এলাকায় পৌঁছালে মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন যুবক তাকে জোর করে তুলে নিয়ে যায় বলে পরিবারের অভিযোগ। পরে মাগুরার শ্রীপুর থানার নাকোল গ্রামের গড়াই নদীর নির্জন মাটিকাটা ঘাট এলাকায় নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয় বলে দাবি পরিবারের। এ ঘটনায় রাফি শেখ (২১), রাহুল শেখ (২০), সায়মন বিশ্বাস (২০) ও সোহাগ শেখ (২০) জড়িত বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবারের ভাষ্য, প্রথম তিনজন ধর্ষণে অংশ নেয় এবং সোহাগ সহযোগিতা করে।
পরিবারের দাবি, একপর্যায়ে ওই যুবকদের কাছ থেকে ছুটে গিয়ে মিথিলা নদীতে ঝাঁপ দেয়। স্থানীয় বাসিন্দারা ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নাকোল পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা সেখানে পৌঁছান। ওই সময় ফাঁড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশি সহযোগিতায় তাকে মাগুরা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরদিন উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে ১১ দিন চিকিৎসার পর পরিবারের সদস্যরা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর বাড়িতেই তার চিকিৎসা চলছিল। ২৬ অক্টোবর রাতে তার মৃত্যু হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মৃত্যুর আগে ধারণ করা ভিডিওতে মিথিলা ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সোহাগ শেখ, রাফি শেখ, রাহুল শেখ ও সায়মন বিশ্বাসের নাম উল্লেখ করেছে। পরিবারের দাবি, ঘটনার পর তারা থানায় গেলেও মামলা নেওয়া হয়নি।
গত ১ নভেম্বর বিকেলে মিথিলাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পরিবারের সদস্যরা শোকে স্তব্ধ। মেয়ের মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ বাবা হান্নান শেখ। অসুস্থ মা জেসমিন খাতুনও শয্যাশায়ী।
মিথিলার মা জেসমিন খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা কম ঘুরি নাই। একটা সন্তান যখন হারায় যায়, তারা কি বইস্যা থাকে? কিন্তু পুলিশ-দারোগা অপরাধীদের শাস্তি দেয় না। দুই থানায় মামলা নিল না কেন? আমার মেয়েকে এভাবে মেরে ফেলল, বিচার কি কোথাও পাব না?’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ঘটনার পর মধুখালী থানা-পুলিশ পরিবারের সদস্যদের ডেকে শ্রীপুর থানায় পাঠায়। সেখানে মামলা না নিয়ে একটি সাদা কাগজে স্বাক্ষর রেখে তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
মিথিলার ভগ্নিপতি বিপ্লব শেখ বলেন, ‘আমার শ্যালিকাকে তুলে নেওয়ার তিন মাস আগে অন্য জায়গায় তার বিয়ের কাবিন হয়েছিল। এতে তার এক মামাতো ভাই ক্ষিপ্ত হয়, কারণ সে মিথিলাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। এরপর পরিকল্পনা করে রাফির সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটানো হয়।’ তিনি আরও বলেন, মিথিলা সুস্থ হওয়ার পর তাদের কাছে ঘটনার কথা জানিয়েছিল। তবে তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে পরিবার বিষয়টি প্রকাশ করেনি। অভিযুক্ত চারজনের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন তিনি।
মিথিলার বাবা হান্নান শেখ বলেন, ‘সরকারের কাছে দাবি, আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে মামলা নেওয়া হোক। আমার মেয়ের হত্যাকারীদের বিচার চাই।’
পুলিশের বক্তব্য
শ্রীপুর থানা-পুলিশের দাবি, রাফি শেখের সঙ্গে মিথিলার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এর মধ্যে অন্যত্র তার বিয়ে হয়। এর জেরে গত ১৪ সেপ্টেম্বর মধুমতি নদীর মাটিকাটা ঘাট এলাকায় তারা দুজন দীর্ঘ সময় গল্প করে এবং একপর্যায়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়। ঘাটে থাকা রফিকুল মাঝি বিষয়টি দেখে স্থানীয়দের জানান। পরে পুলিশ মিথিলাকে উদ্ধার করে ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলি মিয়া বলেন, এ ঘটনায় পুলিশ একটি তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছে। তদন্তে ওই ঘাট এলাকায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ঘাটের আশপাশে ঝোপঝাড় নেই, জায়গাটি ফাঁকা এবং সেখানে মানুষের যাতায়াত ও মাঝিদের উপস্থিতি থাকে। তবে অন্য কোথাও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, উদ্ধারের সময় মিথিলা ধর্ষণের অভিযোগ করেনি। দেড় মাসেও কেউ বিষয়টি পুলিশকে জানায়নি। তার মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যা তাঁর কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে। মিথিলাকে উদ্ধারের পর পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছিল। পরে ফাঁড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়। যেহেতু মধুখালীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে, সে কারণে মধুখালী থানা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, ঘটনাটি জানার পর তিনি শ্রীপুর থানায় যোগাযোগ করেন। শ্রীপুর থানার ওসি পরিবারের সদস্যদের সেখানে পাঠাতে বলেন। পরে তারা শ্রীপুরে গেলে একটি অপমৃত্যুর মামলা নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি জানতে পারেন, মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তবে দেড় মাস আগের ঘটনা সম্পর্কে তাদের কেউ জানায়নি।
ওসি আরও জানান, গত ২ নভেম্বর মিথিলার বাবা হান্নান শেখ চারজনকে আসামি করে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
























