রবিবার, ০৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সত্যানুসন্ধান মোদের অঙ্গীকার Jonotar Adalot
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
ভালো ব্যাটসম্যানরা কি অন্ধকারেও দেখতে পান ‘প্রবাসীরা আসায় স্থানীয়দেরও উন্নতির তাগিদ তৈরি হয়েছে’ কোল্লাপাথর: মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ সাত ব্যান্ডের মিলনমেলা, জেমস এলেন রাত ১০টায়… আট কারণে উদ্বোধনের আগেই ‘লেজেগোবরে’ সাফ জুলাই চেতনার মালিকানা দাবি করতে থাকলে নবীন বন্ধুরা নবীনই থেকে যাবেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আজ টিভিতে যা যা দেখবেন (৬ নভেম্বর, ২০২৬) একাত্তরের পরাজিত শক্তি ও ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদীরা এক হয়ে ষড়যন্ত্র করছে: শামা ওবায়েদ খাজা বই লিখে কত টাকা পাচ্ছেন, অভিযোগ অস্বীকার করে পাল্টা প্রশ্ন কোচের ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি’র সুর শাহরুখের সিনেমার গানে? মৌসুমীর ভিন্নমত

কোল্লাপাথর: মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ

অপু নাগ
  • প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
  • / 4
“তোমার যেখানে সাধ চলে যাও—আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব;
দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;”
জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে—তোমার যেখানে সাধ চলে যাও, আমি কোল্লাপাথর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সমাধিস্থল দেখে আসি। আমরা ঠিক ভোরে সেখানে পৌঁছাইনি। খালি পায়ে যখন এক এক করে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে সমাধিস্থলে উঠছিলাম, তখন পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো কিছুটা ম্লান হয়ে হেলে পড়ছে। সিঁড়ির উত্তর পাশে চোখে পড়ল একটি কাঁঠালগাছ, আর দক্ষিণ পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া এক ছাতিমগাছ।
“ওই যে ছাতিম গাছের মতোই আছি
সহজ প্রাণের আবেগ নিয়ে মাটির কাছাকাছি,”
সিঁড়ির ধাপগুলো পেরিয়ে ওপরে উঠে দেখলাম সারি সারি সমাধি। সেখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ৫১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যেন বাংলার চিরন্তন নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর ছাতিম ফুলের সুবাস মেখে পরম শান্তিতে নিদ্রা যাপন করছেন তাঁরা। হেলে পড়া হেমন্তের নরম রোদ যেন পরম স্নেহে ও ভালোবাসায় কবরগুলোকে উষ্ণতায় আগলে রেখেছে। সূর্য ঢলে পড়লেও এই পুণ্যভূমিতে শায়িত দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অসীম ও তেজোদ্দীপ্ত বীরত্বগাথা আকাশ ও সমুদ্রের মতো বিশালতা নিয়ে আমাদের সামনে ভাস্বর হয়ে ওঠে। বীরদের এই স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের হৃদয়কে, আমাদের নতুন প্রজন্মকে বারবার একাত্তরের রক্তঝরা ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে গড়ে তুলতে যারা মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অসীম সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগই আমাদের প্রেরণার মূল উৎস। তাঁদের সেই ত্যাগকে পাথেয় করে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং বিশ্বদরবারে দেশকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ; আর এটাই আমাদের আজীবনের আদর্শ।
কোল্লাপাথর ভারত সীমান্তঘেঁষা একটি নিভৃত ও শান্ত গ্রাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নে অবস্থিত এই স্থানটি উঁচু-নিচু পাহাড় ও টিলায় ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর এক প্রান্তর। শিক্ষক হিসেবে সবসময় চেষ্টা করি ছাত্রসমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে—যাতে তারা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দেশি-বিদেশি সব অপশক্তিকে রুখে দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের মাঝে সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়া, মাঠপর্যায়ে সরাসরি ইতিহাস প্রত্যক্ষ করা এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এ আমরা ‘সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’-এর কয়েকজন শিক্ষক কোল্লাপাথর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনে যাই। আমার সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক জনাব মুসা মিয়া, জাকির হোসেন সরকার এবং সহকারী শিক্ষক হাদিস মিয়া, রেজাউল হক ও মফিজুল ইসলাম। তাঁরা প্রত্যেকেই শিক্ষার্থীদের কাছে যেমন আদর্শস্থানীয়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
বিদ্যালয়ে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতা শেষে আমরা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে প্রায় ৫৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পড়ন্ত বিকেলে সেখানে পৌঁছাই।
সেখানে সারি সারি সাজানো কবর। মোট আটটি পূর্ণ সারি; প্রতিটি সারিতে ছয়টি করে কবর ইটের বেদি দিয়ে বাঁধানো। এরপর আরেকটি সারিতে রয়েছে তিনটি কবর। কবরের নামফলকে চোখ যেতেই হঠাৎ একটি জায়গায় দৃষ্টি আটকে গেল—লেখা রয়েছে ‘অজ্ঞাত’। হৃদয়ের গভীর থেকে যেন হাহাকার জেগে উঠল—হায়, কেউ জানে না এদের নাম-পরিচয়, বাবা-মা কিংবা জন্মভূমির ঠিকানা! হয়তো তাঁদের পরিবার আজও পথ চেয়ে বসে আছে, জানেই না তাঁদের নাড়িছেঁড়া ধন বাংলার কোন দূর প্রান্তরে চিরনিদ্রায় শায়িত। তবে কেউ না জানলেও, জীবনানন্দ দাশের সেই পঙ্‌ক্তির মতো—‘কেউ যাহা জানে না কো, আমি তাহা জানি’—আজ তাঁদের একটাই অবিসংবাদিত পরিচয়, তাঁরা আমাদের ‘শ্রেষ্ঠ সন্তান’। সূর্যের দীপ্তি ম্লান হয়ে এলেও তাঁদের এই মহিমান্বিত পরিচয় কখনো ম্লান হবে না। কালের পরিক্রমায় মহাকালের বুকে তাঁরা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের আদর্শ ও অনন্ত প্রেরণা হিসেবে।
এখানে পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন ল্যান্স নায়েক, সুবেদার, হাবিলদার, ছাত্র, সাধারণ মানুষ, হিন্দু কিংবা মুসলমান—পার্থিব সকল পরিচয় ছাপিয়ে আজ যাঁদের একটাই পরিচয়, “তাঁরা আমাদের সূর্যসন্তান।”
Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

কোল্লাপাথর: মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বগাথা ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ

প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
“তোমার যেখানে সাধ চলে যাও—আমি এই বাংলার পারে র’য়ে যাব;
দেখিব কাঁঠালপাতা ঝরিতেছে ভোরের বাতাসে;”
জীবনানন্দ দাশের কবিতার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করে—তোমার যেখানে সাধ চলে যাও, আমি কোল্লাপাথর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সমাধিস্থল দেখে আসি। আমরা ঠিক ভোরে সেখানে পৌঁছাইনি। খালি পায়ে যখন এক এক করে সিঁড়ির ধাপ বেয়ে সমাধিস্থলে উঠছিলাম, তখন পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো কিছুটা ম্লান হয়ে হেলে পড়ছে। সিঁড়ির উত্তর পাশে চোখে পড়ল একটি কাঁঠালগাছ, আর দক্ষিণ পাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আকাশছোঁয়া এক ছাতিমগাছ।
“ওই যে ছাতিম গাছের মতোই আছি
সহজ প্রাণের আবেগ নিয়ে মাটির কাছাকাছি,”
সিঁড়ির ধাপগুলো পেরিয়ে ওপরে উঠে দেখলাম সারি সারি সমাধি। সেখানে চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন স্বাধীন বাংলাদেশের ৫১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা। যেন বাংলার চিরন্তন নৈসর্গিক সৌন্দর্য আর ছাতিম ফুলের সুবাস মেখে পরম শান্তিতে নিদ্রা যাপন করছেন তাঁরা। হেলে পড়া হেমন্তের নরম রোদ যেন পরম স্নেহে ও ভালোবাসায় কবরগুলোকে উষ্ণতায় আগলে রেখেছে। সূর্য ঢলে পড়লেও এই পুণ্যভূমিতে শায়িত দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অসীম ও তেজোদ্দীপ্ত বীরত্বগাথা আকাশ ও সমুদ্রের মতো বিশালতা নিয়ে আমাদের সামনে ভাস্বর হয়ে ওঠে। বীরদের এই স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের হৃদয়কে, আমাদের নতুন প্রজন্মকে বারবার একাত্তরের রক্তঝরা ইতিহাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে গড়ে তুলতে যারা মৃত্যুকে তুচ্ছ জ্ঞান করে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অসীম সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তাঁদের আত্মত্যাগই আমাদের প্রেরণার মূল উৎস। তাঁদের সেই ত্যাগকে পাথেয় করে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং বিশ্বদরবারে দেশকে সম্মানের আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ; আর এটাই আমাদের আজীবনের আদর্শ।
কোল্লাপাথর ভারত সীমান্তঘেঁষা একটি নিভৃত ও শান্ত গ্রাম। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নে অবস্থিত এই স্থানটি উঁচু-নিচু পাহাড় ও টিলায় ঘেরা অনিন্দ্য সুন্দর এক প্রান্তর। শিক্ষক হিসেবে সবসময় চেষ্টা করি ছাত্রসমাজকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত করতে—যাতে তারা যেকোনো সংকট মোকাবিলায় বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে দেশি-বিদেশি সব অপশক্তিকে রুখে দিতে পারে। শিক্ষার্থীদের মাঝে সেই বার্তা পৌঁছে দেওয়া, মাঠপর্যায়ে সরাসরি ইতিহাস প্রত্যক্ষ করা এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর উদ্দেশ্যে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’-এ আমরা ‘সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’-এর কয়েকজন শিক্ষক কোল্লাপাথর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিসৌধ পরিদর্শনে যাই। আমার সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র শিক্ষক জনাব মুসা মিয়া, জাকির হোসেন সরকার এবং সহকারী শিক্ষক হাদিস মিয়া, রেজাউল হক ও মফিজুল ইসলাম। তাঁরা প্রত্যেকেই শিক্ষার্থীদের কাছে যেমন আদর্শস্থানীয়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে শ্রেণিকক্ষে ও শ্রেণিকক্ষের বাইরে নিরলসভাবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
বিদ্যালয়ে ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আলোচনা সভা ও রচনা প্রতিযোগিতা শেষে আমরা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে প্রায় ৫৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পড়ন্ত বিকেলে সেখানে পৌঁছাই।
সেখানে সারি সারি সাজানো কবর। মোট আটটি পূর্ণ সারি; প্রতিটি সারিতে ছয়টি করে কবর ইটের বেদি দিয়ে বাঁধানো। এরপর আরেকটি সারিতে রয়েছে তিনটি কবর। কবরের নামফলকে চোখ যেতেই হঠাৎ একটি জায়গায় দৃষ্টি আটকে গেল—লেখা রয়েছে ‘অজ্ঞাত’। হৃদয়ের গভীর থেকে যেন হাহাকার জেগে উঠল—হায়, কেউ জানে না এদের নাম-পরিচয়, বাবা-মা কিংবা জন্মভূমির ঠিকানা! হয়তো তাঁদের পরিবার আজও পথ চেয়ে বসে আছে, জানেই না তাঁদের নাড়িছেঁড়া ধন বাংলার কোন দূর প্রান্তরে চিরনিদ্রায় শায়িত। তবে কেউ না জানলেও, জীবনানন্দ দাশের সেই পঙ্‌ক্তির মতো—‘কেউ যাহা জানে না কো, আমি তাহা জানি’—আজ তাঁদের একটাই অবিসংবাদিত পরিচয়, তাঁরা আমাদের ‘শ্রেষ্ঠ সন্তান’। সূর্যের দীপ্তি ম্লান হয়ে এলেও তাঁদের এই মহিমান্বিত পরিচয় কখনো ম্লান হবে না। কালের পরিক্রমায় মহাকালের বুকে তাঁরা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের আদর্শ ও অনন্ত প্রেরণা হিসেবে।
এখানে পরম শান্তিতে শুয়ে আছেন ল্যান্স নায়েক, সুবেদার, হাবিলদার, ছাত্র, সাধারণ মানুষ, হিন্দু কিংবা মুসলমান—পার্থিব সকল পরিচয় ছাপিয়ে আজ যাঁদের একটাই পরিচয়, “তাঁরা আমাদের সূর্যসন্তান।”