Dhaka ০৮:৪৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয় ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো না ৮৫ বছরের মায়ের, আশ্রয় দিলেন মেয়ে

ডেস্ক নিউজ
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৫০:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
  • / 2

ছয় ছেলে থাকার পরও জীবনের শেষ বয়সে তাঁদের কারও ঘরে আশ্রয় পেলেন না ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানু। অসুস্থ শরীর নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। বারবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত অসহায় এই মায়ের আশ্রয় হয়েছে মেয়ে ঝর্ণা বেগমের বাড়িতে।

ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের। জয়নব ভানু ওই গ্রামের প্রয়াত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী। তাঁর ছয় ছেলের মধ্যে দুজন দেশে থাকেন, বাকি চারজন প্রবাসে।

জানা যায়, গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ছেলেদের কারও ঘরে আশ্রয় না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন বৃদ্ধা জয়নব ভানু। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও ঘরের দরজা না খোলায় স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি। জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত নিজের পরিচিত ভিটায় কাটাতে চান এই বৃদ্ধা।

জয়নব ভানুর অভিযোগ, কুমিল্লায় দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি। দরজায় বারবার ডাকাডাকি করলেও কেউ সাড়া দেননি। একপর্যায়ে ঘরের সামনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসেন। তাঁদের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে স্বামীর ভিটায় মাথা গোঁজার মতো একটি কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান জয়নব ভানু।

তবে বৃদ্ধার অভিযোগের বিষয়ে পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।

জয়নব ভানুর মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, গত এক বছর তাঁর মা কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তবে মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলে জানান তিনি।

বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, বৃদ্ধা তাঁদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী ঘটেছে, তা তাঁর জানা নেই। অন্যদিকে সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী দাবি করেন, জয়নব ভানু কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন।

মায়ের অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝর্ণা বেগম। তিনি বলেন, ‘মায়ের খবর শুনে আমি ছুটে আসি। ২০ বছর ধরে তারা আমার মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। তারা চায়, আমার মাকে আমার বাড়িতে তুলে দিতে।’

পরে ঝর্ণা বেগম মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন জয়নব ভানু।

এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের খান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বার্ধক্যে একজন মায়ের সঙ্গে এমন ঘটনা সত্যিই হৃদয়বিদারক। সামাজিকভাবে ছেলেদের বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

এদিকে ঘটনাটি জানার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যদের তাঁর কার্যালয়ে ডেকে খোঁজখবর নেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জয়নব ভানুর ছয় ছেলের মধ্যে শাহজাহান ও আবুল কাশেম বাড়িতে বসবাস করেন। অন্য চার ছেলে প্রবাসে রয়েছেন।

স্বামীকে হারিয়েছেন বহু বছর আগে। বয়সের ভার ও অসুস্থতায় এখন অন্যের সহায়তার প্রয়োজন জয়নব ভানুর। কিন্তু নিজের ভিটায় থাকার মতো একটি ঘরও মিলছে না বলে অভিযোগ তাঁর। তাই জীবনের শেষ সময়টুকু স্বামীর ভিটায় কাটানোর জন্য একটি ছোট কুঁড়েঘরই এখন এই বৃদ্ধার চাওয়া।

ছয় ছেলের ঘরে আশ্রয় না পেয়ে মেয়ের বাড়িতে ঠাঁই নেওয়া জয়নব ভানুর ঘটনা বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

ছয় ছেলের ঘরে ঠাঁই হলো না ৮৫ বছরের মায়ের, আশ্রয় দিলেন মেয়ে

প্রকাশের সময় : ০৭:৫০:২৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬

ছয় ছেলে থাকার পরও জীবনের শেষ বয়সে তাঁদের কারও ঘরে আশ্রয় পেলেন না ৮৫ বছর বয়সী জয়নব ভানু। অসুস্থ শরীর নিয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেছেন। বারবার ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। শেষ পর্যন্ত অসহায় এই মায়ের আশ্রয় হয়েছে মেয়ে ঝর্ণা বেগমের বাড়িতে।

ঘটনাটি চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের পূর্ব কাদরা গ্রামের। জয়নব ভানু ওই গ্রামের প্রয়াত সৈয়দ আহমেদের স্ত্রী। তাঁর ছয় ছেলের মধ্যে দুজন দেশে থাকেন, বাকি চারজন প্রবাসে।

জানা যায়, গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে ছেলেদের কারও ঘরে আশ্রয় না পেয়ে অসহায় হয়ে পড়েন বৃদ্ধা জয়নব ভানু। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও ঘরের দরজা না খোলায় স্বামীর ভিটায় একটি ছোট কুঁড়েঘর তৈরি করে দেওয়ার আকুতি জানান তিনি। জীবনের শেষ দিনগুলো অন্তত নিজের পরিচিত ভিটায় কাটাতে চান এই বৃদ্ধা।

জয়নব ভানুর অভিযোগ, কুমিল্লায় দীর্ঘ এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বাড়িতে ফিরে ছেলেদের ঘরে প্রবেশ করতে পারেননি তিনি। দরজায় বারবার ডাকাডাকি করলেও কেউ সাড়া দেননি। একপর্যায়ে ঘরের সামনে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

এ সময় স্থানীয় কয়েকজন যুবক তাঁকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে আসেন। তাঁদের কাছে নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে স্বামীর ভিটায় মাথা গোঁজার মতো একটি কুঁড়েঘর নির্মাণ করে দেওয়ার অনুরোধ জানান জয়নব ভানু।

তবে বৃদ্ধার অভিযোগের বিষয়ে পরিবারের সদস্যরা ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন।

জয়নব ভানুর মেজো ছেলে আবুল কাশেম দাবি করেন, গত এক বছর তাঁর মা কোথায় ছিলেন, তা তিনি জানেন না। তবে মাকে কয়েকবার ডেকেছেন বলে জানান তিনি।

বড় ছেলে শাহজাহানের স্ত্রী বলেন, বৃদ্ধা তাঁদের ঘরের দরজার সামনে কয়েক মিনিট বসেছিলেন। এরপর কী ঘটেছে, তা তাঁর জানা নেই। অন্যদিকে সেজো ছেলে আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী দাবি করেন, জয়নব ভানু কখন বাড়িতে এসেছেন, সে বিষয়ে তাঁরা অবগত নন।

মায়ের অসহায় অবস্থার খবর পেয়ে ছুটে আসেন মেয়ে ঝর্ণা বেগম। তিনি বলেন, ‘মায়ের খবর শুনে আমি ছুটে আসি। ২০ বছর ধরে তারা আমার মায়ের সঙ্গে এমন আচরণ করছে। তারা চায়, আমার মাকে আমার বাড়িতে তুলে দিতে।’

পরে ঝর্ণা বেগম মাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যান। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন জয়নব ভানু।

এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ ও সহানুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাদের খান ঘটনাটিকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে বলেন, বিষয়টি এলাকাবাসীর সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

চিতোষী পূর্ব ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলম বেলাল বলেন, ‘বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে বার্ধক্যে একজন মায়ের সঙ্গে এমন ঘটনা সত্যিই হৃদয়বিদারক। সামাজিকভাবে ছেলেদের বিচার হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’

এদিকে ঘটনাটি জানার পর মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সকালে শাহরাস্তি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুন বৃদ্ধার পরিবারের সদস্যদের তাঁর কার্যালয়ে ডেকে খোঁজখবর নেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জয়নব ভানুর ছয় ছেলের মধ্যে শাহজাহান ও আবুল কাশেম বাড়িতে বসবাস করেন। অন্য চার ছেলে প্রবাসে রয়েছেন।

স্বামীকে হারিয়েছেন বহু বছর আগে। বয়সের ভার ও অসুস্থতায় এখন অন্যের সহায়তার প্রয়োজন জয়নব ভানুর। কিন্তু নিজের ভিটায় থাকার মতো একটি ঘরও মিলছে না বলে অভিযোগ তাঁর। তাই জীবনের শেষ সময়টুকু স্বামীর ভিটায় কাটানোর জন্য একটি ছোট কুঁড়েঘরই এখন এই বৃদ্ধার চাওয়া।

ছয় ছেলের ঘরে আশ্রয় না পেয়ে মেয়ের বাড়িতে ঠাঁই নেওয়া জয়নব ভানুর ঘটনা বৃদ্ধ মা-বাবার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ব ও সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।