‘হাউ ডু ইউ ডু’ অভিবাসন শুধু পরিসংখ্যান নয় মানুষের গল্প
- প্রকাশের সময় : ০৭:২২:২৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
- / 0
বাংলাদেশের প্রথম অভিবাসন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বিষয়ক চলচ্চিত্র প্রতিযোগিতা ও উৎসব ‘মাইগ্রেশন ফিল্ম ফেস্ট ২০২৬’-এ জাতীয় বিভাগে সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে আবির ফেরদৌস মুখরের ‘হাউ ডু ইউ ডু’ এবং আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা হয়েছে তুরস্কের পরিচালক আদার বারান ডেগারের ‘দ্য কোল্ড’।
জাতীয় বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে সৈয়দ সাহিল ও রাকায়েত রাব্বী নির্মিত ‘মাটি’ এবং তৃতীয় হয়েছে ইফফাত রওনাক প্রমির ‘দ্য লাস্ট প্যাসেজ’। আন্তর্জাতিক বিভাগে দ্বিতীয় হয়েছে ইরানের পরিচালক মোসায়েব হানাইয়ের ‘ওভারলোড’ এবং তৃতীয় হয়েছে ভেনেজুয়েলার পরিচালক রিকার্দো মুনোজ সিনিয়রের ‘অ্যান আইল্যান্ড’।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। তিনি আরও বলেন, আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার যে পরিস্থিতি, তাতে অনেক সময় দিকবিদিকশূন্য হয়ে এবং আশপাশের হাতছানির কারণে আমাদের তরুণেরা বিদেশে পাড়ি জমায়। তারা যাওয়ার আগে ও পরে প্রতারিত হয়। এরপরও কোনো খরচ ছাড়াই রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা সরকারের হাতে আসে, তা অনেক মূল্যবান। কারণ আমরা অনেকটাই আমদানিনির্ভর। সেজন্য বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। আর সেই বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান আমাদের দেশের সেই মানুষগুলো, যারা বিদেশে যাচ্ছেন।
প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করতে না পারলে আমাদের বড় সমস্যার মধ্যে পড়তে হবে। যারা যেতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য সহজ পথ বাতলে দেওয়া, খরচ কমিয়ে আনা এসব নিশ্চিত করতে হবে। তবে দিনশেষে মনে রাখতে হবে অভিবাসন শুধু পরিসংখ্যান নয়, মানুষের গল্প। ভবিষ্যতে এই উদ্যোগে তথ্য মন্ত্রণালয় পাশে থাকতে চায়।
অনুষ্ঠানের বিশেষে অতিথি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালেয়র অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যায়, কিন্তু সেই যাওয়ার পথটা খুব সুখকর নয়। আশার গল্প যেমন আছে, তেমনি দুঃখ-বঞ্চনার গল্পও আছে। আপনারা যে গল্পগুলো তুলে এনেছেন, তা সবই সত্য ঘটনা। এখন সেগুলো সাধারণ মানুষের সামনে তুলে আনতে হবে।”
বাংলাদেশে ইতালি দূতাবাসের মাইগ্রেশন অ্যাটাশে জিওসেপ্পে দি জিওভান্নি বলেন, “আমি প্রায়ই শুনি যে ইতালি যেতে ১০ হাজার ১৫ হাজার ডলার লাগে। কিন্তু আসলে কত লাগে জানেন? ইতালির ভিসার জন্য সর্বনিম্ন ৬১ আর সর্বোচ্চ ১০০ ডলার নেয়। তাহলে এই ১০ হাজার ১৫ হাজার ডলার কে নেয়? দুই পাড়ের মাঝখানের কিছু লোক। বাংলাদেশ ও ইতালির অপরাধী চক্র যারা মানুষের অভিবাসনের মানুষের স্বপ্নকে পুঁজি করে শোষণ করে। আমরা এই চক্রগুলো ভেঙে দেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু সেজন্য বাংলাদেশের সরকারের সহায়তা আমাদের দরকার। আবার এটাও বলতে চাই, লিবিয়া হয়ে নৌকায় করে যারা আমাদের আমাদের সৈকতে ভিড়বে, আমরা তাদের ফিরিয়ে দেবো। আমাদের আইন এখন এতটাই কঠিন।”
চলচ্চিত্র নির্মাতা কামার আহমাদ সাইমন বলেন, “শিল্প ও গল্প বলার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে অভিবাসন নিয়ে আরও গভীর সামাজিক আলোচনা তৈরি করা সম্ভব। এ ধরনের উৎসব নতুন নির্মাতাদের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।”
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও জুরি বোর্ডের সদস্য রাহনুমা সালাম খান বলেন, “অভিবাসন ও মানবপাচারের মতো জটিল মানবিক সংকটকে চলচ্চিত্র অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ নিরাপদ অভিবাসন বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান এস এম আব্দুর রহমান এমন উদ্যোগের প্রশংসা করে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
গত ১ এপ্রিল গুগল ফর্ম ও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্ল্যাটফর্ম ফিল্মফ্রিওয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্র আহ্বান করা হয়। বিশ্বের ২৪টি দেশ থেকে এক হাজারেরও বেশি চলচ্চিত্র জমা পড়ে। তিন মাসব্যাপী এ আয়োজনে নির্মাতাদের জন্য ছয়টি মেন্টরশিপ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫৭টি চলচ্চিত্র বাছাই করা হয়। পরে জাতীয় বিভাগে ১৩টি এবং আন্তর্জাতিক বিভাগে ১০টিসহ মোট ২৩টি চলচ্চিত্র চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার জন্য নির্বাচিত হয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, ব্রাজিল, কানাডা, কোস্টারিকা, সাইপ্রাস, মিসর, ফ্রান্স, ভারত, ইরান, ইসরায়েল, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, স্পেন, তুরস্ক, ইউক্রেন, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভেনেজুয়েলা ও ভিয়েতনাম, এই দেশগুলো থেকে চলচ্চিত্র পাঠিয়েছেন নির্মাতারা।
চলচ্চিত্র নির্মাতা হিমেল আশরাফ, ইন্টারন্যাশনাল লেবার অর্গানাইজেশনের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার রাহনুমা সালাম খান এবং সিনেমাটোগ্রাফার ও চলচ্চিত্র পরিচালক সাহিল রনি জুরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চিত্রনাট্য, নির্মাণশৈলী, বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিকতা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে বিজয়ী নির্বাচন করা হয়।
জাতীয় বিভাগে সেরা পুরস্কার বিজয়ী আবির ফেরদৌস মুখর বলেন, “চলচ্চিত্র অনেক শক্তিশালী একটি মাধ্যম। আমার মনে হয়, যারা অভিবাসনের স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ যাওয়ার সময় ভয়াবহ অভিজ্ঞতার শিকার হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে শিকার হতে পারেন, তারা যখন এসব চলচ্চিত্র দেখবেন, তখন তাদের মধ্যে এই উপলব্ধিটা আসবে যে এভাবে আমার যাওয়া উচিত কি না। নিরাপদে যেতে হলে আমার করণীয় কী?”



















