ভারতের নিষেধাজ্ঞায় বেনাপোল বন্দরে রপ্তানিতে বড় ধস, ঘাটতি প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার টন
- প্রকাশের সময় : ০৬:৪২:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
- / 10
ভারতের আরোপিত বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও শর্তের কারণে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সর্বশেষ অর্থবছরে রপ্তানি কমেছে প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। এর প্রভাবে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য, রাজস্ব আয় ও বন্দরনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বন্ধ হয়ে গেছে কয়েকটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম, কর্মহীন হয়ে পড়েছেন অনেক কর্মচারী ও শ্রমিক।
বেনাপোল স্থলবন্দরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১ থেকে ১৫ জুলাই পর্যন্ত ১৩ কর্মদিবসে ভারত থেকে তিন হাজার ৩৮টি ট্রাক বিভিন্ন পণ্য নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৭৫৩ ট্রাক পণ্য।
সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ভারত থেকে ৪৫০ থেকে ৫০০ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হতো। বর্তমানে আমদানি কমে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাকে এবং রপ্তানি ২০ থেকে ১০০ ট্রাকের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
বন্দরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭২ মেট্রিক টন বাংলাদেশি পণ্য ভারতে রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮১ হাজার ৪৪০ মেট্রিক টনে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭৫ হাজার ২৩২ মেট্রিক টন কম। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানির পরিমাণ আরও কমে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৮২ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে বলে বন্দর-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি হওয়া পণ্যের মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য, তৈরি পোশাক, রাসায়নিক পণ্য, টিস্যু, মেলামাইন ও মাছ উল্লেখযোগ্য। তবে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব পণ্যের অনেকগুলোর স্থলপথে রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দরে বাণিজ্যিক সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন খাত, গুদাম, হ্যান্ডলিং শ্রমিকসহ বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাণিজ্য-সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল থেকে ভারত স্থলপথ ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশি পণ্য পাঠানোর সুযোগ বন্ধ করে দেয়। পরে ১৭ মে গার্মেন্টস, তৈরি পোশাক, তুলা, প্লাস্টিক, কাঠের আসবাবপত্র ও ফলসহ বিভিন্ন পণ্যের স্থলপথে রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ২৬ জুন পাট ও পাটজাত পণ্যের স্থলপথে রপ্তানিও বন্ধ করা হয়। সর্বশেষ ১১ জুলাই ভারত বস্ত্র ও পাটজাত আরও চার ধরনের পণ্য স্থলবন্দর ব্যবহার করে আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। অন্যদিকে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তিতে বাংলাদেশ সরকারও স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করেছে।
বেনাপোল আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহ-সভাপতি আমিনুল হক বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও ভারত পূর্বের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি। এতে বেনাপোল বন্দর দিয়ে রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক মোস্তাফিজ্জোহা সেলিম বলেন, ভারতীয় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের পাশাপাশি বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খুঁজে বের করতে হবে।
বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইমপোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মতিয়ার রহমান বলেন, ভারত-বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান ট্রানজিট সুবিধা কার্যকরভাবে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানো গেলে বর্তমান সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। পাশাপাশি স্থলপথে নিষিদ্ধ পণ্যগুলোর আমদানি-রপ্তানি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বেনাপোল স্থলবন্দরের পরিচালক (ট্রাফিক) শামিম হোসেন বলেন, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল কমে গেছে। এর ফলে বাণিজ্যের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও কমেছে। তিনি বলেন, দুই দেশের আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধই এ পরিস্থিতির প্রধান কারণ। রপ্তানি বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে সরকারি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।





















