Dhaka ০১:২৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যশোরের শার্শায় মুখি কচুর হাটে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

মনির হোসেন, বেনাপোল
  • প্রকাশের সময় : ১১:৫৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬
  • / 4

যশোরের শার্শা উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি বাজার এখন মুখি কচুর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি হাটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট এই হাটকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে এলাকার হাজারো কৃষকের অর্থনৈতিক চিত্র। সরাসরি পাইকারদের কাছে কচু বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় কৃষকেরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, তেমনি কমেছে সময় ও পরিবহন খরচও।

দুপুর গড়াতেই হাটে ভিড় বাড়তে শুরু করে। বিকেলের পর শত শত বস্তাভর্তি মুখি কচু নিয়ে হাজির হন কৃষকেরা। একদিকে দরদাম, অন্যদিকে ট্রাকে কচু তোলার ব্যস্ততায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা রূপ নেয় এক বিশাল কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকেন্দ্রে।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বাসাবাড়ি এখন মুখি কচুর অন্যতম নির্ভরযোগ্য পাইকারি বাজার। প্রতিদিন শার্শার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পাশের ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে কৃষকেরা কচু নিয়ে আসেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পাইকাররা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কচু কিনে নিয়ে যাওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য ছাড়াই তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।

হাট ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে কচুভর্তি বস্তা। কোথাও চলছে দরদাম, কোথাও নমুনা দেখে ক্রয়-বিক্রয়, আবার কোথাও নতুন ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন বিক্রেতারা। পুরো বাজারজুড়েই চলছে প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ বেচাকেনা।

কৃষক ওইদুল ইসলাম জানান, আগে কচু বিক্রির জন্য বিভিন্ন বাজারে ঘুরতে হতো। এখন বাসাবাড়ি হাটেই পাইকাররা এসে কচু কিনে নিয়ে যান। এতে সময় ও খরচ—দুটিই কমেছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ঝিকরগাছা উপজেলার নির্বাসখোলা এলাকার কৃষক সাহেব আলী। তিনি বলেন, “এই হাটে কচু নিয়ে এলে বিক্রি নিয়ে কোনো চিন্তা থাকে না। ক্রেতার অভাব হয় না, আর দামও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়।”

ব্যবসায়ীরা জানান, বাসাবাড়ি হাটের মুখি কচুর মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কচু ঢাকা, নাটোর, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ভালো মানের মুখি কচু প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে মৌসুমের শেষ দিকে তা ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, “এখানে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই সুবিধা পাচ্ছেন। কৃষকেরা সরাসরি বিক্রি করতে পারছেন, আবার আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত কচু সংগ্রহ করতে পারছি।”

তবে হাটে কচু পরিবহনে আসা ট্রাক, পিকআপ ও আলমসাধু চালকদের অভিযোগ, প্রতিটি ট্রাক থেকে ২০০ টাকা, পিকআপ থেকে ১০০ টাকা এবং আলমসাধু থেকে ৫০ টাকা করে বাজার কমিটির পক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে। টাকা না দিলে লোডিংয়ে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

এ বিষয়ে বাজার কমিটির সভাপতি রশিদ মীর বলেন, আদায়কৃত অর্থ বাজারের মসজিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

বেনাপোল সীমান্ত প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, “বাসাবাড়ির মুখি কচুর হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি এখন কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক এই হাটকে কেন্দ্র করে লাভবান হচ্ছেন।”

শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানান, বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ১৮০ হেক্টর জমিতে মুখি কচুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। আগামী বছরগুলোতে এ চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

যশোরের শার্শায় মুখি কচুর হাটে বদলাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য

প্রকাশের সময় : ১১:৫৮:২৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

যশোরের শার্শা উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি বাজার এখন মুখি কচুর অন্যতম বৃহৎ পাইকারি হাটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত জমজমাট এই হাটকে কেন্দ্র করে বদলে যাচ্ছে এলাকার হাজারো কৃষকের অর্থনৈতিক চিত্র। সরাসরি পাইকারদের কাছে কচু বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় কৃষকেরা যেমন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, তেমনি কমেছে সময় ও পরিবহন খরচও।

দুপুর গড়াতেই হাটে ভিড় বাড়তে শুরু করে। বিকেলের পর শত শত বস্তাভর্তি মুখি কচু নিয়ে হাজির হন কৃষকেরা। একদিকে দরদাম, অন্যদিকে ট্রাকে কচু তোলার ব্যস্ততায় সন্ধ্যার পর পুরো এলাকা রূপ নেয় এক বিশাল কৃষিপণ্যের বাণিজ্যকেন্দ্রে।

স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, বাসাবাড়ি এখন মুখি কচুর অন্যতম নির্ভরযোগ্য পাইকারি বাজার। প্রতিদিন শার্শার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও পাশের ঝিকরগাছা উপজেলা থেকে কৃষকেরা কচু নিয়ে আসেন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত পাইকাররা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে কচু কিনে নিয়ে যাওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য ছাড়াই তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন।

হাট ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে কচুভর্তি বস্তা। কোথাও চলছে দরদাম, কোথাও নমুনা দেখে ক্রয়-বিক্রয়, আবার কোথাও নতুন ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন বিক্রেতারা। পুরো বাজারজুড়েই চলছে প্রাণচাঞ্চল্যপূর্ণ বেচাকেনা।

কৃষক ওইদুল ইসলাম জানান, আগে কচু বিক্রির জন্য বিভিন্ন বাজারে ঘুরতে হতো। এখন বাসাবাড়ি হাটেই পাইকাররা এসে কচু কিনে নিয়ে যান। এতে সময় ও খরচ—দুটিই কমেছে।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ঝিকরগাছা উপজেলার নির্বাসখোলা এলাকার কৃষক সাহেব আলী। তিনি বলেন, “এই হাটে কচু নিয়ে এলে বিক্রি নিয়ে কোনো চিন্তা থাকে না। ক্রেতার অভাব হয় না, আর দামও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়।”

ব্যবসায়ীরা জানান, বাসাবাড়ি হাটের মুখি কচুর মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখান থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কচু ঢাকা, নাটোর, রাজশাহী, রংপুর, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে। মৌসুমের শুরুতে ভালো মানের মুখি কচু প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে মৌসুমের শেষ দিকে তা ৩০ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান বলেন, “এখানে কৃষক ও ব্যবসায়ী উভয়েই সুবিধা পাচ্ছেন। কৃষকেরা সরাসরি বিক্রি করতে পারছেন, আবার আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী মানসম্মত কচু সংগ্রহ করতে পারছি।”

তবে হাটে কচু পরিবহনে আসা ট্রাক, পিকআপ ও আলমসাধু চালকদের অভিযোগ, প্রতিটি ট্রাক থেকে ২০০ টাকা, পিকআপ থেকে ১০০ টাকা এবং আলমসাধু থেকে ৫০ টাকা করে বাজার কমিটির পক্ষ থেকে আদায় করা হচ্ছে। টাকা না দিলে লোডিংয়ে বাধা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।

এ বিষয়ে বাজার কমিটির সভাপতি রশিদ মীর বলেন, আদায়কৃত অর্থ বাজারের মসজিদ ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।

বেনাপোল সীমান্ত প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. সাহিদুল ইসলাম শাহীন বলেন, “বাসাবাড়ির মুখি কচুর হাট শুধু একটি বাজার নয়, এটি এখন কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। এ অঞ্চলের হাজারো কৃষক এই হাটকে কেন্দ্র করে লাভবান হচ্ছেন।”

শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানান, বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ১৮০ হেক্টর জমিতে মুখি কচুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সুযোগ বাড়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। আগামী বছরগুলোতে এ চাষ আরও সম্প্রসারিত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।