Dhaka ০৪:৫২ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
ব্রাজিল–স্কটল্যান্ড ম্যাচে ভারি বৃষ্টির শঙ্কা, বিলম্ব হতে পারে খেলা নওগাঁয় মানব পাচার প্রতিরোধে দিনব্যাপী কর্মশালা অনুষ্ঠিত কালীগঞ্জে ৩৫ শত কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে ধান বীজ ও সার বিতরণ পাংশায় সংঘর্ষে নিহতের ঘটনায় মামলা, আসামি সাড়ে ৩০০ চিকিৎসা কষ্টে থাকা কাঙালিনী সুফিয়ার দায়িত্ব নিলো এবিজি ফাউন্ডেশন রিজার্ভ বেড়ে ফের ৩৬ বিলিয়ন ডলার ছাড়াল সংসদের অধিবেশন বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা পর্যন্ত মুলতবি খাগড়াছড়িতে সেনা অভিযানে সশস্ত্র সংগঠনের সদস্য নিহত, অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার ফিফা বিশ্বকাপ চলাকালীন ঢাবিতে বহিরাগত প্রবেশ ও যানচলাচলে নিষেধাজ্ঞা চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্স প্রবাহ ১৭.৮ শতাংশ বেড়েছে

স্মার্ট ক্লাসরুম বনাম স্মার্ট শিক্ষক: অগ্রাধিকার কোনটি?

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৪২:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 141

একটি জাতির ভবিষ্যৎ ট্যাব বা প্রজেক্টরে নয়, গড়ে ওঠে শিক্ষকের মনন ও বিবেকের ভেতর।সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার দেখা যাচ্ছে। সেখানে ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মতো প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো শুনতে চমকপ্রদ মনে হলেও, শিক্ষার মূল সংকটের গভীরে না গিয়ে এটি পুরনো পথেরই পুনরাবৃত্তি। শিক্ষার প্রকৃত রূপান্তর চাইলে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হবে: শিক্ষার লক্ষ্য কী? এটি কি শুধু কারিগরি দক্ষ জনশক্তি তৈরি, নাকি জ্ঞান, মনন ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা?

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের শিক্ষানীতির কেন্দ্রে আজও ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ আছে, কিন্তু ‘স্মার্ট শিক্ষক’ নেই। প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়া যায়, কিন্তু একজন স্বশিক্ষিত, উদ্ভাবনী ও নৈতিক দায়িত্বশীল শিক্ষক তৈরি হয় দীর্ঘকালীন বিনিয়োগ, উপযুক্ত মূল্যায়ন ও সামাজিক সম্মানের মাধ্যমে।

স্মার্ট ক্লাসরুম বনাম স্মার্ট শিক্ষক

ট্যাব কিংবা মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর অচল হয়ে যেতে পারে, অর্থের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ থমকে যেতে পারে। কিন্তু একজন দক্ষ ও স্বপ্রণোদিত শিক্ষক নিজেই একটি ‘সেলফ-সাসটেইনেবল’ প্রতিষ্ঠান। তিনি সীমিত সম্পদেও শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহলের বীজ বুনে দিতে পারেন। শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষক।

স্মার্ট ক্লাসরুমের চাকচিক্য দিয়ে শিক্ষার বাহ্যিক রূপ হয়তো বদলানো যায়, কিন্তু শিক্ষার অন্তঃসার কি কেবল প্রযুক্তিনির্ভর? তাই বিনিয়োগ অবকাঠামোর চেয়ে বেশি হওয়া উচিত শিক্ষকের মেধা ও মনন উন্নয়নে। প্রযুক্তি হবে শিক্ষার সহায়ক মাত্র, চালক নয়।

কারিগরি শিক্ষা: সবার জন্য নয়, মেধা অনুযায়ী

ইদানীং একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—সবার জন্যই কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার আলাপ উঠছে। এটি শুনতে আধুনিক মনে হলেও এর ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ। যে শিক্ষার্থী গণিত বা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য মেধা রাখে কিংবা যে ভবিষ্যতে দার্শনিক হতে চায়, তাকে কেন কারিগরি শিক্ষার বোঝা বইতে হবে? এটি কেবল মেধার অপচয় নয়, জাতির সম্ভাবনাকে সংকীর্ণ চিন্তার ফ্রেমে বাঁধার শামিল।

শিক্ষার কাঠামো হওয়া উচিত পিরামিড সদৃশ। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবাই একই মূল ধারায় পড়বে, যেখানে ভিত্তি তৈরি হবে নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মৌলিক জ্ঞানের উপর। অষ্টম শ্রেণির পর শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত—কারা কারিগরি ধারায় যাবে আর কারা উচ্চতর জ্ঞানচর্চায় থাকবে।

জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘জিমনাসিয়াম’ পদ্ধতিটি মেধাবীদের জন্য একটি সত্যিকারের ‘ব্রেইন জিমনাসিয়াম’। আমাদের দেশেও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার ধারাকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং রাখা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত মেধাবীরাই সেখানে অবস্থান করে। এজন্য আমাদের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের করতে হবে—বিদেশি প্রশিক্ষক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম নিয়ে।

শিক্ষকের মর্যাদা, বেতন ও গবেষণা

ইশতেহারে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, সেখানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার অভাব পরিলক্ষিত হয়। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকর্ষণ করতে কেবল মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ।

একজন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষক আর একজন পিএইচডি বা পোস্ট-ডক্টরাল ডিগ্রিধারী গবেষক-শিক্ষকের মূল্যায়ন এক হতে পারে না। জ্ঞানের সৃজনশীলতা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে বেতনের স্তরবিন্যাস থাকা জরুরি। যোগ্যতার ভিত্তিতে যদি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো না থাকে, তবে বিশ্বমানের স্কলাররা কখনোই এই পেশায় থিতু হবেন না।

তাই শুধু কথা নয়, চাই সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ—

* শিক্ষক বেতন কাঠামো পুনর্গঠন: উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক গবেষক—প্রত্যেকের যোগ্যতা ও গবেষণার ভিত্তিতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চাই।

* শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ: জিডিপির কত শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় হবে, তার স্পষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও ক্লাসরুমের মানোন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে।

* শিক্ষক নিয়োগে মেধার প্রাধান্য: রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষক বাছাই করতে হবে। শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করতে ক্যারিয়ার প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষার মূল দর্শন: নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা

শিক্ষায় প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি সুস্পষ্ট দর্শন নির্ধারণ। প্রাথমিক স্তরে নৈতিকতা, সামাজিক সচেতনতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। পড়াশোনাকে আনন্দময় করতে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে। খেলাধুলা ও সহ-শিক্ষা কার্যক্রম বাদ দিয়ে কেবল সিলেবাসের বোঝা চাপালে তা শিশুর সৃজনশীলতাকে গলা টিপে ধরবে।

শিক্ষার দর্শন হওয়া উচিত এমন—যেখানে শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর মেন্টর, শুধু তথ্যের সরবরাহকারী নন।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’কে স্মার্ট করতে হবে। দেশ এখন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, দার্শনিক, চিন্তক ও বিজ্ঞানী চায়—যারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেবে। তাদের গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে মেধা ও মানবিকতার সমন্বয়ে সাজাতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত কেবল চমকপ্রদ ইশতেহার নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবসম্মত ও মেধাভিত্তিক শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা প্রণয়ন করা। শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেলেই শিক্ষার প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।

শিক্ষায় বিপ্লব চাই, প্রথায় নয়—এবং সেই বিপ্লবের চাবিকাঠি হলেন স্মার্ট শিক্ষক।

লেখক: কলেজ শিক্ষক

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

স্মার্ট ক্লাসরুম বনাম স্মার্ট শিক্ষক: অগ্রাধিকার কোনটি?

প্রকাশের সময় : ০৭:৪২:২৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬

একটি জাতির ভবিষ্যৎ ট্যাব বা প্রজেক্টরে নয়, গড়ে ওঠে শিক্ষকের মনন ও বিবেকের ভেতর।সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার দেখা যাচ্ছে। সেখানে ট্যাব, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মতো প্রযুক্তির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো শুনতে চমকপ্রদ মনে হলেও, শিক্ষার মূল সংকটের গভীরে না গিয়ে এটি পুরনো পথেরই পুনরাবৃত্তি। শিক্ষার প্রকৃত রূপান্তর চাইলে প্রথমেই প্রশ্ন করতে হবে: শিক্ষার লক্ষ্য কী? এটি কি শুধু কারিগরি দক্ষ জনশক্তি তৈরি, নাকি জ্ঞান, মনন ও নৈতিকতায় সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম গড়ে তোলা?

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের শিক্ষানীতির কেন্দ্রে আজও ‘স্মার্ট ক্লাসরুম’ আছে, কিন্তু ‘স্মার্ট শিক্ষক’ নেই। প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি কিনে দেওয়া যায়, কিন্তু একজন স্বশিক্ষিত, উদ্ভাবনী ও নৈতিক দায়িত্বশীল শিক্ষক তৈরি হয় দীর্ঘকালীন বিনিয়োগ, উপযুক্ত মূল্যায়ন ও সামাজিক সম্মানের মাধ্যমে।

স্মার্ট ক্লাসরুম বনাম স্মার্ট শিক্ষক

ট্যাব কিংবা মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর অচল হয়ে যেতে পারে, অর্থের অভাবে রক্ষণাবেক্ষণ থমকে যেতে পারে। কিন্তু একজন দক্ষ ও স্বপ্রণোদিত শিক্ষক নিজেই একটি ‘সেলফ-সাসটেইনেবল’ প্রতিষ্ঠান। তিনি সীমিত সম্পদেও শিক্ষার্থীর মনে কৌতূহলের বীজ বুনে দিতে পারেন। শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হলেন শিক্ষক।

স্মার্ট ক্লাসরুমের চাকচিক্য দিয়ে শিক্ষার বাহ্যিক রূপ হয়তো বদলানো যায়, কিন্তু শিক্ষার অন্তঃসার কি কেবল প্রযুক্তিনির্ভর? তাই বিনিয়োগ অবকাঠামোর চেয়ে বেশি হওয়া উচিত শিক্ষকের মেধা ও মনন উন্নয়নে। প্রযুক্তি হবে শিক্ষার সহায়ক মাত্র, চালক নয়।

কারিগরি শিক্ষা: সবার জন্য নয়, মেধা অনুযায়ী

ইদানীং একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে—সবার জন্যই কারিগরি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার আলাপ উঠছে। এটি শুনতে আধুনিক মনে হলেও এর ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রশ্নবিদ্ধ। যে শিক্ষার্থী গণিত বা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য মেধা রাখে কিংবা যে ভবিষ্যতে দার্শনিক হতে চায়, তাকে কেন কারিগরি শিক্ষার বোঝা বইতে হবে? এটি কেবল মেধার অপচয় নয়, জাতির সম্ভাবনাকে সংকীর্ণ চিন্তার ফ্রেমে বাঁধার শামিল।

শিক্ষার কাঠামো হওয়া উচিত পিরামিড সদৃশ। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সবাই একই মূল ধারায় পড়বে, যেখানে ভিত্তি তৈরি হবে নৈতিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মৌলিক জ্ঞানের উপর। অষ্টম শ্রেণির পর শিক্ষকদের পর্যবেক্ষণ ও অভিভাবকদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হওয়া উচিত—কারা কারিগরি ধারায় যাবে আর কারা উচ্চতর জ্ঞানচর্চায় থাকবে।

জার্মানির শিক্ষা ব্যবস্থায় ‘জিমনাসিয়াম’ পদ্ধতিটি মেধাবীদের জন্য একটি সত্যিকারের ‘ব্রেইন জিমনাসিয়াম’। আমাদের দেশেও উচ্চতর জ্ঞানচর্চার ধারাকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং রাখা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত মেধাবীরাই সেখানে অবস্থান করে। এজন্য আমাদের কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের করতে হবে—বিদেশি প্রশিক্ষক ও যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম নিয়ে।

শিক্ষকের মর্যাদা, বেতন ও গবেষণা

ইশতেহারে শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধির কথা বলা হলেও, সেখানে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার অভাব পরিলক্ষিত হয়। মেধাবীদের শিক্ষকতায় আকর্ষণ করতে কেবল মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ।

একজন উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শিক্ষক আর একজন পিএইচডি বা পোস্ট-ডক্টরাল ডিগ্রিধারী গবেষক-শিক্ষকের মূল্যায়ন এক হতে পারে না। জ্ঞানের সৃজনশীলতা ও গবেষণার মানের উপর ভিত্তি করে বেতনের স্তরবিন্যাস থাকা জরুরি। যোগ্যতার ভিত্তিতে যদি স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো না থাকে, তবে বিশ্বমানের স্কলাররা কখনোই এই পেশায় থিতু হবেন না।

তাই শুধু কথা নয়, চাই সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ—

* শিক্ষক বেতন কাঠামো পুনর্গঠন: উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক, স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও পোস্ট-ডক গবেষক—প্রত্যেকের যোগ্যতা ও গবেষণার ভিত্তিতে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চাই।

* শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ: জিডিপির কত শতাংশ শিক্ষায় ব্যয় হবে, তার স্পষ্ট ঘোষণা থাকা উচিত। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও ক্লাসরুমের মানোন্নয়নে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে।

* শিক্ষক নিয়োগে মেধার প্রাধান্য: রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে শিক্ষক বাছাই করতে হবে। শিক্ষকতা পেশাকে আকর্ষণীয় করতে ক্যারিয়ার প্রবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করতে হবে।

শিক্ষার মূল দর্শন: নৈতিকতা ও সৃজনশীলতা

শিক্ষায় প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি সুস্পষ্ট দর্শন নির্ধারণ। প্রাথমিক স্তরে নৈতিকতা, সামাজিক সচেতনতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। পড়াশোনাকে আনন্দময় করতে খেলাধুলা ও সৃজনশীল কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করতে হবে। খেলাধুলা ও সহ-শিক্ষা কার্যক্রম বাদ দিয়ে কেবল সিলেবাসের বোঝা চাপালে তা শিশুর সৃজনশীলতাকে গলা টিপে ধরবে।

শিক্ষার দর্শন হওয়া উচিত এমন—যেখানে শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর মেন্টর, শুধু তথ্যের সরবরাহকারী নন।

স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে আগে ‘মানুষ গড়ার কারিগর’কে স্মার্ট করতে হবে। দেশ এখন তাত্ত্বিক পদার্থবিদ, দার্শনিক, চিন্তক ও বিজ্ঞানী চায়—যারা ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে জ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেবে। তাদের গড়ে তুলতে হলে শিক্ষাকে মেধা ও মানবিকতার সমন্বয়ে সাজাতে হবে।

রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত কেবল চমকপ্রদ ইশতেহার নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি, বাস্তবসম্মত ও মেধাভিত্তিক শিক্ষা দর্শনের রূপরেখা প্রণয়ন করা। শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেলেই শিক্ষার প্রকৃত মুক্তি সম্ভব।

শিক্ষায় বিপ্লব চাই, প্রথায় নয়—এবং সেই বিপ্লবের চাবিকাঠি হলেন স্মার্ট শিক্ষক।

লেখক: কলেজ শিক্ষক