Dhaka ০৮:১০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ:
গ্যাস সংকট সমাধানে বাংলাদেশকে সহযোগিতার আশ্বাস মালয়েশিয়ার মেয়েকে মানসিক রোগী দাবি করে ক্ষমা চাইলেন জামায়াত নেতা নওগাঁ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পুলিশ-র‌্যাবের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা নওগাঁয় দুবাই পাঠানোর নামে ১৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ফরিদপুরে হাতির ধাক্কায় উল্টে গেল অটোরিকশা, নিহত ১০ মাসের শিশু ২১ শিক্ষার্থীর প্রাণ গেল, অথচ ধর্মেন্দ্রকে মালা পরালো বিজেপি: কংগ্রেস নেতা স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি: শীর্ষ পদে আলোচনায় যাঁরা টানা বৃষ্টিতে মধুখালীতে মরিচ চাষে বিপর্যয়, মণপ্রতি দাম ১০ হাজার টাকা পোরশায় মাদকবিরোধী অভিযানে চোলাই মদ তৈরির উপকরণ উদ্ধার বন্ধ ইটভাটা ফের চালুর চেষ্টা, ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস পরিবেশ অধিদপ্তরের

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি স্বার্থের দৌরাত্ম্য : সমাজসেবার নামে নৈরাজ্য

মো. মাহবুবুর রহমান
  • প্রকাশের সময় : ০৭:৪২:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 158

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোগ এক সময় সমাজসেবা ও জনহিতৈষীর প্রতীক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ‘শিরোনাম’ বা প্রতিষ্ঠানের নাম এখন দখল করেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৌরাত্ম্য। সমাজসেবার মোহনায় গড়ে উঠা হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আজ পরিচালিত হচ্ছে পারিবারিক কর্তৃত্ব, স্বজনপ্রীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দুর্বৃত্তায়নে। ফলে শিক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রে পণ্য, প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার বলয়, আর পরিচালনা পরিণত হয়েছে বংশগত উত্তরাধিকারে। এই দৌরাত্ম্য শিক্ষার গুণগত মান ও নিয়মশৃঙ্খলাকে ক্ষয়িষ্ণু করছে এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শুরুতে অনেক নিঃস্বার্থ উদ্যোক্তা নিজের জমি, অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করে এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বপ্নে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সেই আলোকিত স্বপ্ন ম্লান হয়ে, প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের ব্যক্তিগত ‘জমিদারি’-তে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার শহরতলিতে অবস্থিত একটি কলেজের এক শিক্ষক (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন: “প্রতিষ্ঠাতার পরিবার এটাকে তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি ভাবে। অধ্যক্ষ থেকে অফিস সহকারী —অধিকাংশ  নিয়োগেই চলে আত্মীয়তা বা আনুগত্যের রাজনীতি।  যে প্রতিবাদ করে, তাকে হয় বাঁকা চোখে দেখা হয়, নয়তো হয়রানির শিকার হতে হয়।”

তবে সব প্রতিষ্ঠান একই কাঠিতে মাপা যায় না। ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠানও লক্ষ্য করা যায়।  মুক্তিযুদ্ধে  শহীদ, নামকরা মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের অথবা স্থানের নামে এলাকার সচেতন শ্রেণীর সহযোগিতায়  গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে এই নৈরাজ্য থেকে মুক্ত। এখানে সাধারণত প্রকৃত সমাজসেবার চেতনা নিয়ে পরিচালনা করা হয়, এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের দখলদারিত্বের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও শিক্ষার মানই অগ্রাধিকার পায়।

গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় , ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটিতে একই পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজন মিলে অধিকাংশ পদ দখল করে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানও সেই পরিবারের সদস্য । ফলে সেসব প্রতিষ্ঠান কার্যত একটি ‘ফ্যামিলি এন্টারপ্রাইজ’-এ পরিণত হয়েছে, আর সমাজসেবার লেবেলটি হয়ে ওঠে মুখোশ মাত্র।

অন্যদিকে, স্থানীয় শিক্ষায় অবদান নেই—কিন্তু পেশিশক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে যেসব ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান কমিটিতে যুক্ত হন, তাঁরাও স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর। এদের অনেকের কাছে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক ফায়দা ও আর্থিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার ছাড়া আর কিছু নয়।

এই দখলদারিত্বের সরাসরি ফল হলো নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম, বাজেট হেরফের ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং আত্মীয়তা, পরিচয় বা অনুগত দেখে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের চিত্র কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে বিব্রতকরভাবে দৃশ্যমান।

এক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান: “অনেক প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ পরস্পর আত্মীয়। তাঁরা পরস্পরকে ছাড়পত্র দেন, আর্থিক অনিয়ম  করেন, আর নিয়োগে চালান বংশবৃত্তান্ত দেখা।”এই পরিস্থিতিতে মেধাবীরা বাদ পড়েন, আর সেসব প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয় ভয় ও তোষামোদ-নির্ভর পরিবেশ, যেখানে জ্ঞানের সেবা নয়, আনুগত্যই প্রধান শর্ত।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ (মাউশি) দাবি করে, অনিয়ম রোধে ম্যানেজিং কমিটি গঠনসংক্রান্ত নীতিমালা কঠোর করা হয়েছে। মাউশির একজন অতিরিক্ত সচিব বিবরণ দেন: “নতুন নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। মাঠপর্যায়ে এই নীতিমালার প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং আইনের ফাঁক-ফোকরের কারণে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠাতা পরিবারই নীতিমালার অপব্যাখ্যা করে নিজেদের দখল ধরে রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এই অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমের কাছে মাধ্যমের কাছে  বলেন: “সমাজসেবার মুখোশ পরে যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, তাদের একটি অংশের মূল উদ্দেশ্য এখন সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক লাভ। এমপি-মন্ত্রীর সুপারিশে প্রতিষ্ঠান অনুমোদন, শুধু জমিদান করলেই আজীবন সভাপতি হওয়ার সংস্কৃতি—এগুলোই এই দৌরাত্ম্যের মূল ভিত্তি।”

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশন ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ব্যানবেইস)-এর তথ্যমতে, মাধ্যমিক পর্যায়ের ২১ হাজার ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৫৭টিই বেসরকারি—যা প্রায় ৯৪ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়।

বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বেসরকারি শিক্ষার দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি গুণগত বৈষম্য, দুর্বল জবাবদিহি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণে ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে। অর্থাৎ, সংখ্যায় বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গুণমানের অবক্ষয় গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই দৌরাত্ম্য ও সুশাসনের সংকট কেবল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সমস্যা নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, নৈতিকতা ও দক্ষতাকে সরাসরি বিপন্ন করছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন: “ম্যানেজিং কমিটি গঠন, শিক্ষক নিয়োগ, অর্থসংস্থান ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি এখন রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন। না হলে শিক্ষাক্ষেত্রের এই নৈরাজ্য জাতিকে উচ্চ মূল্য দিতে হবে।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিরোনামে প্রতিষ্ঠাতার নাম চিরস্মরণীয় করার মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তি হবে। বেসরকারি শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও জাতি গঠনের নিষ্ঠা, ব্যক্তির দৌরাত্ম্য নয়। এই দৌরাত্ম্য রোধে নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় যোগ্য, নৈতিক ও জবাবদেহী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। নতুবা, কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানের বদলে শুধু প্রভাবের প্রতিযোগিতা চলতে থাকবে—আর তার মূল্য দেবে পুরো জাতি।

লেখক : মো. মাহবুবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।

Tag :

সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন-

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তি স্বার্থের দৌরাত্ম্য : সমাজসেবার নামে নৈরাজ্য

প্রকাশের সময় : ০৭:৪২:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২৫

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেসরকারি উদ্যোগ এক সময় সমাজসেবা ও জনহিতৈষীর প্রতীক ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ‘শিরোনাম’ বা প্রতিষ্ঠানের নাম এখন দখল করেছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক দৌরাত্ম্য। সমাজসেবার মোহনায় গড়ে উঠা হাজার হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার মধ্যে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আজ পরিচালিত হচ্ছে পারিবারিক কর্তৃত্ব, স্বজনপ্রীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের দুর্বৃত্তায়নে। ফলে শিক্ষা এখন অনেক ক্ষেত্রে পণ্য, প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার বলয়, আর পরিচালনা পরিণত হয়েছে বংশগত উত্তরাধিকারে। এই দৌরাত্ম্য শিক্ষার গুণগত মান ও নিয়মশৃঙ্খলাকে ক্ষয়িষ্ণু করছে এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

শুরুতে অনেক নিঃস্বার্থ উদ্যোক্তা নিজের জমি, অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করে এলাকায় শিক্ষার আলো ছড়ানোর স্বপ্নে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু ক্ষেত্রে সেই আলোকিত স্বপ্ন ম্লান হয়ে, প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের ব্যক্তিগত ‘জমিদারি’-তে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার শহরতলিতে অবস্থিত একটি কলেজের এক শিক্ষক (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) বলেন: “প্রতিষ্ঠাতার পরিবার এটাকে তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি ভাবে। অধ্যক্ষ থেকে অফিস সহকারী —অধিকাংশ  নিয়োগেই চলে আত্মীয়তা বা আনুগত্যের রাজনীতি।  যে প্রতিবাদ করে, তাকে হয় বাঁকা চোখে দেখা হয়, নয়তো হয়রানির শিকার হতে হয়।”

তবে সব প্রতিষ্ঠান একই কাঠিতে মাপা যায় না। ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিষ্ঠানও লক্ষ্য করা যায়।  মুক্তিযুদ্ধে  শহীদ, নামকরা মুক্তিযোদ্ধা, প্রখ্যাত কবি-সাহিত্যিকদের অথবা স্থানের নামে এলাকার সচেতন শ্রেণীর সহযোগিতায়  গড়ে ওঠা অনেক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে এই নৈরাজ্য থেকে মুক্ত। এখানে সাধারণত প্রকৃত সমাজসেবার চেতনা নিয়ে পরিচালনা করা হয়, এবং প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের দখলদারিত্বের চেয়ে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও শিক্ষার মানই অগ্রাধিকার পায়।

গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় , ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠিত অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটিতে একই পরিবারের সদস্য এবং আত্মীয়-স্বজন মিলে অধিকাংশ পদ দখল করে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানও সেই পরিবারের সদস্য । ফলে সেসব প্রতিষ্ঠান কার্যত একটি ‘ফ্যামিলি এন্টারপ্রাইজ’-এ পরিণত হয়েছে, আর সমাজসেবার লেবেলটি হয়ে ওঠে মুখোশ মাত্র।

অন্যদিকে, স্থানীয় শিক্ষায় অবদান নেই—কিন্তু পেশিশক্তি বা রাজনৈতিক প্রভাবের জোরে যেসব ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান কমিটিতে যুক্ত হন, তাঁরাও স্বীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে তৎপর। এদের অনেকের কাছে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক প্রভাব বিস্তার, রাজনৈতিক ফায়দা ও আর্থিক সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার ছাড়া আর কিছু নয়।

এই দখলদারিত্বের সরাসরি ফল হলো নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, আর্থিক অনিয়ম, বাজেট হেরফের ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন। যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং আত্মীয়তা, পরিচয় বা অনুগত দেখে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের চিত্র কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে বিব্রতকরভাবে দৃশ্যমান।

এক উপজেলা শিক্ষা অফিসার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান: “অনেক প্রতিষ্ঠানে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি এবং প্রধান শিক্ষক/অধ্যক্ষ পরস্পর আত্মীয়। তাঁরা পরস্পরকে ছাড়পত্র দেন, আর্থিক অনিয়ম  করেন, আর নিয়োগে চালান বংশবৃত্তান্ত দেখা।”এই পরিস্থিতিতে মেধাবীরা বাদ পড়েন, আর সেসব প্রতিষ্ঠানে তৈরি হয় ভয় ও তোষামোদ-নির্ভর পরিবেশ, যেখানে জ্ঞানের সেবা নয়, আনুগত্যই প্রধান শর্ত।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ (মাউশি) দাবি করে, অনিয়ম রোধে ম্যানেজিং কমিটি গঠনসংক্রান্ত নীতিমালা কঠোর করা হয়েছে। মাউশির একজন অতিরিক্ত সচিব বিবরণ দেন: “নতুন নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।”

কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখায়। মাঠপর্যায়ে এই নীতিমালার প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে রাজনৈতিকভাবে মদদপুষ্ট স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপ, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং আইনের ফাঁক-ফোকরের কারণে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠাতা পরিবারই নীতিমালার অপব্যাখ্যা করে নিজেদের দখল ধরে রাখে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এই অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ মাধ্যমের কাছে মাধ্যমের কাছে  বলেন: “সমাজসেবার মুখোশ পরে যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন, তাদের একটি অংশের মূল উদ্দেশ্য এখন সামাজিক মর্যাদা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আর্থিক লাভ। এমপি-মন্ত্রীর সুপারিশে প্রতিষ্ঠান অনুমোদন, শুধু জমিদান করলেই আজীবন সভাপতি হওয়ার সংস্কৃতি—এগুলোই এই দৌরাত্ম্যের মূল ভিত্তি।”

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশন ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ব্যানবেইস)-এর তথ্যমতে, মাধ্যমিক পর্যায়ের ২১ হাজার ৮৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯ হাজার ৭৫৭টিই বেসরকারি—যা প্রায় ৯৪ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরেও প্রায় এক-চতুর্থাংশ প্রতিষ্ঠান বেসরকারি ব্যবস্থাপনায়।

বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কোর প্রতিবেদনে বেসরকারি শিক্ষার দ্রুত বিস্তারের পাশাপাশি গুণগত বৈষম্য, দুর্বল জবাবদিহি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণে ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে। অর্থাৎ, সংখ্যায় বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে গুণমানের অবক্ষয় গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে।

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই দৌরাত্ম্য ও সুশাসনের সংকট কেবল প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সমস্যা নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা, নৈতিকতা ও দক্ষতাকে সরাসরি বিপন্ন করছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন: “ম্যানেজিং কমিটি গঠন, শিক্ষক নিয়োগ, অর্থসংস্থান ও বাজেট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও কঠোর নজরদারি এখন রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন। না হলে শিক্ষাক্ষেত্রের এই নৈরাজ্য জাতিকে উচ্চ মূল্য দিতে হবে।”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিরোনামে প্রতিষ্ঠাতার নাম চিরস্মরণীয় করার মানে এই নয় যে প্রতিষ্ঠানটি তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সম্পত্তি হবে। বেসরকারি শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও জাতি গঠনের নিষ্ঠা, ব্যক্তির দৌরাত্ম্য নয়। এই দৌরাত্ম্য রোধে নীতিমালার কঠোর বাস্তবায়ন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রণ কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় যোগ্য, নৈতিক ও জবাবদেহী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। নতুবা, কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জ্ঞানের বদলে শুধু প্রভাবের প্রতিযোগিতা চলতে থাকবে—আর তার মূল্য দেবে পুরো জাতি।

লেখক : মো. মাহবুবুর রহমান

সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ফরিদপুর সিটি কলেজ, ফরিদপুর।