বন্ধুর নাম, পরিচিত মুখ—প্রতারণার নতুন ফাঁদ
- প্রকাশের সময় : ০১:৫৬:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 16
প্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের দূরের মানুষকে কাছে এনেছে। পুরোনো বন্ধু, সহপাঠী কিংবা পরিচিতজনের সঙ্গে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু এই যোগাযোগের সহজ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণির প্রতারক মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। পরিচিত মানুষের নাম ও ছবি ব্যবহার করে তৈরি করা ভুয়া ফেসবুক আইডির মাধ্যমে প্রতারণার ঘটনা এখন আর নতুন নয়। তবু প্রতারকের কৌশল এতটাই সূক্ষ্ম যে, অনেক সময় সচেতন মানুষও মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
সম্প্রতি আমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। ঘটনাটি হয়তো আমার একার নয়, অনেকের সঙ্গেই এমন ঘটতে পারে। তাই অভিজ্ঞতাটি সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া জরুরি বলে মনে করছি।
দিন কয়েক আগে ফেসবুকে আমার এলাকার এক বন্ধুর নামে একটি আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে। বন্ধুটি কানাডাপ্রবাসী। তার সঙ্গে ফেসবুকে আগে থেকেই যুক্ত ছিলাম। নতুন করে রিকোয়েস্ট আসায় মনে করেছিলাম, হয়তো নতুন আইডি খুলেছে। পরিচিত মানুষ ভেবে রিকোয়েস্টটি গ্রহণ করি। তখনো বুঝতে পারিনি, একটি সাধারণ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আমাকে কতটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
সোমবার দুপুরের দিকে ওই আইডি থেকে মেসেজ এল—‘ফ্রি না ব্যস্ত?’ তখন উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না। পরে মেসেঞ্জারে কল এলেও রিসিভ করতে পারিনি। রাত ১০টার দিকে আমি নিজেই কলব্যাক করি। কলটি রিসিভ হলেও ওপাশ থেকে কোনো কথা শোনা যাচ্ছিল না। কিছুক্ষণ পর মেসেজে জানানো হলো, সেখানে নেটওয়ার্কের সমস্যা। কথা বলা যাচ্ছে না।
এরপর জানানো হলো, সেদিনই সে বাংলাদেশে আসছে। স্বাভাবিকভাবেই লিখলাম, ‘ঠিক আছে, আয়। দেখা হবে।’
এরপরই শুরু হলো আসল ঘটনা।
বন্ধুর পরিচয়ে ওই ব্যক্তি জানাল, তার একটি জরুরি সাহায্য প্রয়োজন। সে নাকি কাতার এয়ারওয়েজের বিমানে চট্টগ্রাম নামবে, সেখান থেকে বিমানে ঢাকায় যাবে। টিকিটের টাকা আগেই পরিশোধ করেছে, কিন্তু টিকিটের কনফার্মেশন আসেনি। আমাকে একটি ফোন নম্বর দিয়ে অনুরোধ করল, ওই নম্বরে যোগাযোগ করে টিকিটটি নিশ্চিত করতে এবং কনফার্মেশন তার জিমেইলে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে।
বন্ধুর বিপদের কথা ভেবে আমিও দায়িত্ব নিয়ে ফোন করলাম। অপর প্রান্ত থেকে জানানো হলো, সার্ভার সমস্যার কারণে টিকিট নিশ্চিত হয়নি। টাকা সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টে ফেরত চলে গেছে। ওই ব্যক্তিকে ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। আবার টাকা পাঠালে টিকিট নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিষয়টি বন্ধুকে জানালে সে জানতে চাইল, এখন করণীয় কী। চট্টগ্রামে নেমে টিকিট নিশ্চিত করা যাবে কি না, তা-ও জানতে বলল। আমি আবার ফোন করলাম। এবার জানানো হলো, রাত সাড়ে ১১টার মধ্যে টাকা পাঠাতে পারলে টিকিট নিশ্চিত করা সম্ভব; অন্যথায় নয়।
এরপর এল অর্থ চাওয়ার পালা।
বন্ধুর পরিচয়ে ওই ব্যক্তি জানাল, রাত ১টায় চট্টগ্রামে নামবে। তার ইমিগ্রেশন ঢাকায়। সময়মতো সেখানে পৌঁছাতে না পারলে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই ২৬ হাজার ২০০ টাকা ম্যানেজ করে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে বলল। বাংলাদেশে পৌঁছেই টাকা ফেরত দেবে বলেও আশ্বাস দিল।
একদিকে বন্ধুর বিপদের কথা, অন্যদিকে এত অল্প সময়ে এত টাকা জোগাড় করার চাপ—আমি বেশ বিভ্রান্ত ও বিব্রত হয়ে পড়লাম। লিখলাম, এক ঘণ্টার মধ্যে এত টাকা ম্যানেজ করা সম্ভব নয়। তাকে বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে বললাম। এরপর আর বিষয়টি নিয়ে এগোইনি।
রাত সোয়া ১১টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। কথায় কথায় তাঁকে জানালাম, আমার ওই বন্ধু কানাডা থেকে দেশে আসছে। তিনি বললেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে তাঁকেও ওই আইডি থেকে মেসেজ দেওয়া হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, আরও অনেকের সঙ্গেই একইভাবে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানালেন।
তখন আর বুঝতে বাকি রইল না, পুরো ঘটনাটিই ছিল একটি পরিকল্পিত প্রতারণার ফাঁদ।
পরদিন বন্ধুকে ফোন করে বিস্তারিত জানালাম। তিনি আগেই বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন এবং ওই আইডির বিরুদ্ধে রিপোর্টও করেছেন। পরে মেসেঞ্জারে গিয়ে দেখি, আমার সঙ্গে করা সব মেসেজ মুছে ফেলা হয়েছে। প্রোফাইলটিও আর খুঁজে পেলাম না।
ঘটনাটি আমাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। প্রতারক শুধু টাকা চায় না; টাকা চাওয়ার আগে সে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে। পরিচিত মানুষের নাম, ছবি, সম্পর্ক ও আবেগকে ব্যবহার করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে সাহায্য না করলে নিজেকেই অপরাধী মনে হতে পারে। জরুরি প্রয়োজন, সময়ের চাপ এবং টাকা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস—সব মিলিয়ে ভুক্তভোগীকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়। আর এই তাড়াহুড়ার সুযোগেই ঘটে যায় সর্বনাশ।
আমার কাছে টাকা থাকলে এবং পরিস্থিতির চাপে পড়লে হয়তো আমিও টাকা পাঠিয়ে দিতাম। কারণ, তখন আমি একজন পরিচিত বন্ধুকেই সাহায্য করছি বলে বিশ্বাস করছিলাম।
এই অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ফেসবুকে পরিচিত কারও নামে নতুন আইডি থেকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এলে যাচাই না করে গ্রহণ করা উচিত নয়। পরিচিত কারও আইডি থেকে টাকা চাওয়া হলে মেসেঞ্জারে কথোপকথন চালিয়ে না গিয়ে তাঁর পুরোনো বা বিকল্প ফোন নম্বরে সরাসরি কথা বলে নিশ্চিত হতে হবে। ভিডিও কলের মাধ্যমে পরিচয় যাচাই করাও সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু পরিচিত ছবি, নাম, কণ্ঠস্বর কিংবা ভিডিও দেখেই পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া উচিত নয়। টাকা পাঠানোর জন্য কেউ অস্বাভাবিক তাড়া দিলে কিংবা অল্প সময়ের মধ্যে বড় অঙ্কের অর্থ জোগাড় করতে বললে আরও সতর্ক হতে হবে।
প্রতারণার শিকার হলে মেসেজ, ফোন নম্বর, প্রোফাইলের লিংক, লেনদেনের তথ্যসহ প্রাসঙ্গিক প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট আইডি ফেসবুকে রিপোর্ট করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে।
আমরা অনেক সময় ভাবি, এসব প্রতারণার শিকার হন অসচেতন মানুষ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতারক যখন পরিচিতজনের পরিচয় ব্যবহার করে আবেগ, বিশ্বাস ও জরুরি পরিস্থিতিকে এক সুতোয় বাঁধে, তখন যে কেউ বিভ্রান্ত হতে পারেন।
তাই মনে রাখা জরুরি—পরিচিত নাম মানেই পরিচিত মানুষ নয়, আর পরিচিত মানুষের নামে আসা অনুরোধ মানেই তা সত্য নয়। সন্দেহ হলে যাচাই করুন, সময় নিন, প্রয়োজনে অন্য কারও সঙ্গে পরামর্শ করুন। কয়েক মিনিটের সতর্কতা আপনাকে হাজার হাজার টাকার ক্ষতি থেকে বাঁচাতে পারে।
আমার এই অভিজ্ঞতা যদি একজন মানুষকেও এমন প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে, তাহলেই লেখাটির সার্থকতা।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক জনতার আদালত

























