তরী ভাসে জীবন হাসে
জীবনতরী হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে দুর্গম অঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষ
- প্রকাশের সময় : ০৫:৩৮:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
- / 621
রাজবাড়ী সদর উপজেলার লক্ষীকোল গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদ ফকির সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালান। চোখের সমস্যার কারণে ভালোভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। আবার অর্থাভাবে যেতে পারছিলেন না চিকিসকের কাছেও। সম্প্রতি জীবন তরী হাসপাতারের কথা জানতে পেরে সেখানে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে এখন তিনি ঠিকঠাক চোখে দেখতে পারছেন।
এভাবেই নদী তীরবর্তী আর দুর্গম এলাকার মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিয়ে চলেছে ইমপ্যাক্ট জীবন তরী ভাসমান হাসপাতাল। এই হাসপাতালটি এখন রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের সোনাকান্দর মৌলভীঘাটে অবস্থান করছে। অত্যন্ত কম খরচে চিকিৎসা সেবা পেয়ে খুশী এলাকার মানুষ।
মাহমুদ ফকির জানান, তার চোখের সমস্যার কারণে অনেক দিন ধরে ঠিকমতো কাজ করতে পারছিলেন না। তার ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মাথা ব্যথার কারণে তার ছেলের পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটছিল। বাবা-ছেলে দুজনই জীবন তরী হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছেন। টিকিট, পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব মিলিয়ে দুজনের খরচ হয়েছে মাত্র তিনশ টাকা। এত কম খরচে ভালো চিকিৎসা পেয়ে খুশী তিনি।
জীবন তরী হাসপাতাল সূত্র জানায়, ইমপ্যাক্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ১৯৯৯ সালে জীবন তরী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। গত ২৫ বছরে দেশের প্রায় ৫০টি জেলা ভ্রমণ করেছে হাসপতালটি। মূলত প্রান্তিক বা পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠির সেবা দেওয়াই এর মূল লক্ষ্য। মাত্র ৫০ টাকা টিকিট কেটে যে কেউ চিকিৎসা সেবা নিতে পারেন। হাসপাতালটিদেত স্বল্পমূল্যে চক্ষু রোগের চিকিৎসা ও ছানি অপারেশন, রোগীর চাহিদা অনুযায়ী লেন্স সংযোজন ও ফ্যাকো সার্জারী, নাক-কান-গলার রোগের চিকিৎসা ও অপারেশন করা হয়। এছাড়া জন্মগত বাঁকা-পা, ঠোঁট কাটা ও তালুকাটা রোগের অপারেশন, অর্থপেডিক সমস্যাজনিত শারীরিক ব্যথা, মাজা ব্যথা, মাথা-ব্যথা, ও বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা হয়। তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও চারজন নার্সসহ মোট ৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী ২৪ ঘণ্টাই হাসপাতালটি কর্মরত থাকছেন। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের ছয়দিন দেওয়া হয় চিকিৎসাসেবা। গত ১ জানুয়ারি থেকে রাজবাড়ীতে অবস্থান করছে হাসপাতালটি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোনাকান্দর মৌলভীঘাট এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে নোঙর করে রাখা হয়েছে আকাশি সাদা রংয়ে অঙ্কিত তিন তলা বিশিষ্ট হাসপাতালটি। নদী তীর থেকে সেখানে যাওয়ার জন্য বালুর বস্তা এবং বাঁশের মাচা দিয়ে রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। রোগীরা যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। নদীর পাড়ে রয়েছে একটি টিকিট কাউন্টার। এসময় কথা হয় ধুঞ্চি গ্রামের বাসিন্দা শাহেদা বেগমের সাথে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে চোখের সমস্যায় ভুগছেন। চোখে কম দেখেন। কোরআন তেলওয়াত করতে অসুবিধা হয়। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলেন না। এখানে কমমূল্যে চিকিৎসার কথা শুনে এসেছেন। ৫০ টাকা টিকিট কেটে ডাক্তার দেখিয়েছেন। খুব যতœ নিয়ে তার চোখ দেখেছে। পরীক্ষা নিরীক্ষাও করেছে। এখানে চিকিৎসা পেয়ে খুশী তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলম, রাকিবুল হোসেনসহ অনেকেই জানান, দুর্গম চরের মানুষ সব সময় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। জীবন তরী হাসপাতাল তাদের এলাকাতে আসায় মানুষের খুব উপকার হয়েছে। যতদিন থাকবে ততদিন তাদের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। যারা ওখানে চিকিৎসা নিতে যায় তাদের কাছে শুনেছেন ভালো চিকিৎসা সেবা দেয় ওখানে।
জীবন তরী হাসপাতালের প্রশাসক ডা. একেএম সহিদুল হক বলেন, মূলত মানুষকে সেবা দেওয়ার জন্যই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে অত্যন্ত কমমূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়ে থাকে। মাত্র চার হাজার টাকায় জটিল সব অপারেশন করা হচ্ছে। মানবতার সেবা দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য। নদ-নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ বেশির ভাগই তুলনামূলক দরিদ্র হয়। তাদের পক্ষে বেশি টাকা খরচ করে শহরে গিয়ে আধুনিক চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। তাই তাদের সুবিধার্থে আমরা ২৫ বছর ধরে চিকিৎসা সেবা দিয়ে আসছি। যে এলাকায় যান সেখানে সাধারণত দুই থেকে ছয় মাস আমরা অবস্থান করে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন। রাজবাড়ীতে তিন মাস বা তারও বেশি সময় অবস্থান করতে পারেন।


























