রাজবাড়ীর পদ্মা তীর সংরক্ষণ কাজের ২ স্থানে ফের ধস ॥ ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এলাকাবাসী
- প্রকাশের সময় : ১১:৪৬:৪৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৯ অগাস্ট ২০২১
- / 285
জনতার আদালত অনলাইন ॥ রাজবাড়ীতে পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের ব্লক ফের ধসে পড়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার দুই দফায় দুই স্থানে ৬০ মিটার এলাকা ধসে গেছে। ২১ দিনের ব্যবধানে ছয় দফা ভাঙনে এলাকাবাসীর আতঙ্ক ক্রমশঃ বাড়ছে। ভাঙন দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে পদ্মা পাড়ের মানুষ। হুমকির মুখে রয়েছে শহর রক্ষা বেড়ি বাঁধ, স্কুল, মসজিদ, বসতঘর, ফসলি জমিসহ বহু স্থাপনা। এভাবে ভাঙন অব্যাহত থাকলে ৩৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে যে প্রকল্পের কাজ চলমান তার পুরোটাই পানিতে চলে যাবে। ভাঙন প্রতিরোধের কাজ নিয়ে বরাবরের মতই প্রশ্ন তুলেছে এলাকাবাসী।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গোদারবাজার থেকে আনুমানিক একশ গজ দূরে চরধুঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে পদ্মা নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের প্রায় ৪০ মিটার এলাকার ব্লক ধসে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তীরের দুই মিটার ব্যাপ্তি ব্লকের পুরোটা বিলীন হওয়ার পর পাড়ও ধসে পড়ে গেছে অনেকখানি। ভাঙন প্রতিরোধে সেখানে বেশ কয়েকটি জিও টিউব ফেলা হয়েছে। এই ভাঙন স্থান থেকে দেড়শ মিটার দূরে সোনাকান্দর এলাকায় যেখানে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ সামগ্রী রাখার জন্য তিনটি অস্থায়ী টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছিল সেখানে ২০ মিটার এলাকার ব্লক নদীতে ধসে গিয়ে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে শ্রমিকরা। তাদের ঘরগুলোও সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সেখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দুইজন ওয়ার্ক এসিস্ট্যান্ট কাজের তদারকি করছেন। তবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাউকে পাওয়া যায়নি। ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে নদী সংলগ্ন মসজিদ, চরধুঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শত শত ঘারবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা। চরধুঞ্চি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এর আগে একাধিকবার নদী ভাঙনের কবলে পড়ে। এবার ভেঙে গেলে স্কুলটির অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের কয়েকশ ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
ভাঙন প্রতিরোধ কাজের শ্রমিক ফারুক হোসেন জানালেন, শনিবার সকালে তিনি ভাঙন দেখতে পেয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। বিকেলে ভেঙেছে আরেক জায়গায়।
ভাঙন আতঙ্কে থাকা কয়েকজন এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন, কাড়িকাড়ি টাকা খরচ করে নদীর ভাঙন ঠেকানোর কাজ করলো। আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। এবার রক্ষা পেলাম। কিন্তু কী কাজ করলো যে ভেঙে গেলো। তারা কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, সঠিকভাবে কাজ করা হলে নদী ভাঙতো না।
পদ্মা নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা আনু মন্ডলের স্ত্রী ফাতেমা বেগম জানান, শনিবার সকালে শুরু হয় ভাঙন। মানুষের হৈ হুল্লোড় শুনে দৌড়ে গিয়ে দেখতে পান নদীর ব্লক ধসে পড়ে যাচ্ছে। পরে এমপি (কাজী কেরামত আলী) এসে দেখে বলে গেছেন; রাজবাড়ীর নদী ভাঙন আর তিনি ঠেকাতে পারবে না। এখন আমরা খুবই আতঙ্কের মধ্যে আছি। রাতে ঘুমাতে পারিনা। নদীর ডাক শুনলে আরও আতঙ্ক হয়। কাতরকণ্ঠে তিনি জানান, এর আগে দুবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছেন। সবশেষে কয়েক বছর আগে গোদারবাজার এলাকায় বেড়ি বাঁধের পাশে বাড়িঘর করে সংসারটা কোনোমতে গুছিয়ে নিয়েছেন। দিনমজুর স্বামী যা রোজগার করেন তাই দিয়ে দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বেঁচে আছেন। ঘরে তার প্রতিবন্ধী নাতি রয়েছে। এবার নদী ভাঙলে আর যাবার জায়গা নেই। পরিবারের সবাইকে নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হবে।
আছিয়া বেগম জানান, নদীতে চারবার বসতঘর ভেঙেছে তার। গোদারবাজার এলাকায় এসে বাড়ি করেছিলেন। কয়েক দফা ভাঙনে তিন শতাংশ জমি বিলীন হয়ে গেছে। এখন বাকী আছে শুধু বাড়ি। এটা ভাঙলে মরে যাওয়া ছাড়া আর পথ থাকবেনা।
রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, ৩৭৬ কোটি ব্যয়ে (ড্রেজিংসহ) মোট পাঁচটি প্যাকেজের মাধ্যমে নদী ভাঙন তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। গোদারবাজারের অনতি দূরে পয়েন্ট থেকে ৪৩৫ মিটার ব্যপ্তির কাজ করছে ওয়েস্টার নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসে একাজ হস্তান্তর করার কথা রয়েছে। যেহেতু কাজ চলমান একারণে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যয়ও ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার এর প্রকৌশলী শামীম আল মামুন এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমরা কাজে কোনো অনিয়ম করিনি। এলাকাবাসী তো ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়টা বুঝবে না। তারা তাদের মত করে মনগড়া কথা বলতেই পারে। আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজাইন অনুসারে কাজ করেছি। যেকারণেই হোক নদীর তলদেশ থেকে বালু সরে গিয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে আমরা কাজ করে চলেছি। এখন অনেকটাই সুরক্ষিত আছে।
রাজবাড়ীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল আহাদ বলেন, ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে গোদারবাজার এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৮ সালে নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। কিন্তু প্রতিবছরই নদী ভাঙছে। নদীর মূল লাইন তীরের কাছে চলে এসেছে। আমরা সার্ভে করে দেখেছি নদীর যে লেভেলটা আগে যেখানে ছিল Ñ২২ (মাইনাস ২২) এ এখন চলে এসেছে Ñ২৮ (মাইনাস আটাশ) এ। নদীর গভীরতা সরে আসার কারণে নদীর যে ¯্রােত এর সাথে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। আমাদের যে ডিজাইন আছে সেটি সংশোধন হওয়া দরকার। অতিরিক্ত এক লাখ ১০ হাজার জিও ব্যাগ ফেলার জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। তারা এসে সাইট দেখে গেছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম প্রসঙ্গে বলেন, আমরা প্রত্যেকটি মেটেরিয়াল ব্লক চেক করেছি। তিন বছর ধরে কাজ চলছে। এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।
























