রাজবাড়ীতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পদ্মায় অবাধে ইলিশ শিকার

- প্রকাশের সময় : ১১:৪০:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / 2
ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে সরকার ঘোষিত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চলছে। এ সময় ইলিশ শিকার, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ থাকলেও রাজবাড়ীতে থামছে না ইলিশ নিধন। পদ্মা নদীতে প্রকাশ্যেই শত শত নৌকায় ইলিশ শিকার করছেন জেলেরা। সংসারের খরচ ও ঋণের কিস্তি পরিশোধের তাগিদে গ্রেফতারের ঝুঁকি নিয়েই নদীতে নামছেন তাঁরা।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন দেশের নদ-নদীতে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময় ইলিশ সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবহন ও বাজারজাতকরণও নিষিদ্ধ।
জেলায় নিবন্ধিত ইলিশ জেলের সংখ্যা ৬ হাজার ৩০৪। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজার ৫৯২ জনকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর।
শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের কাটাখালী ও তেনাপচা, সদর উপজেলার অন্তরমোড়, গোপালবাড়ি, উড়াকান্দা, মেছোঘাটা, কালীতলা, মহাদেবপুর ও ধাওয়াপাড়া ঘাট এবং কালুখালীর মাহেন্দ্রপুর এলাকার পদ্মা নদীতে ইলিশ শিকার করতে দেখা যায় জেলেদের।
ছোট ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌকায় নদীতে নেমেছেন তাঁরা। কেউ জাল ফেলে পাড়ে অপেক্ষা করছেন, কেউ জাল তুলছেন, আবার কেউ জাল গুছিয়ে নদী থেকে ফিরে যাচ্ছেন। নদীর তীরে বাঁধা রয়েছে অসংখ্য ছোট নৌকা। ক্যামেরা তাক করতেই কয়েকটি নৌকাকে দ্রুত সরে যেতে দেখা যায়। একেকটি নৌকায় ছিলেন চার থেকে ছয়জন জেলে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের মহাদেবপুর গ্রামের এক জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ১৩ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। এবার তাঁর নামে জেলে কার্ড হলেও চাল পাননি।
তিনি বলেন, ‘সমিতি থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে নৌকা বানিয়েছি। প্রতি সপ্তাহে কিস্তি দিতে হয়। আমার সংসারে ছয়জন মানুষ। তাঁদের মুখে খাবার তুলে দিতে হয়। নদীতে না নামলে এসব খরচ চলবে কীভাবে? দুই বেলাই নদীতে পুলিশ আসে। কয়েকজনকে জেলেও পাঠিয়েছে। গ্রেফতারের ভয় নিয়েই নদীতে থাকি। সরকার যদি আমাদের সংসার চালানোর মতো সহযোগিতা করত, তাহলে নদীতে নামতে হতো না।’
গোপালবাড়ি এলাকার আরেক জেলে বলেন, ‘আমরা দিন এনে দিন খাই। একদিন কাজ না করলে সংসার চলে না। নদীতে মাছ না ধরলে পেটে ভাত জোটে না। বাধ্য হয়েই নদীতে এসেছি। সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকি। শুধু পেশাদার জেলে নন, নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরতে নদীতে নামেন এমন অনেকেও রয়েছেন। সরকার তাঁদের থামাতে পারছে না। তাহলে আমরা বসে থেকে কী করব?’
সদর উপজেলার কালীতলা এলাকার নদীতীরবর্তী বাসিন্দা মোমেনা বেগম বলেন, আগে এ সময় নদীতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। এখন আর আগের মতো ইলিশ মেলে না। ইলিশের ডিম ছাড়ার সময় মাছ ধরা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও নদীতে শত শত নৌকায় মাছ শিকার চলছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর নদীতে ইলিশ আরও কমে যাবে। ইলিশ রক্ষায় সরকারের জোরালো ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় আটটি অভিযান চালিয়ে ৮৫ হাজার মিটার জাল ও ২৯ কেজি ইলিশ জব্দ করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১৭ দিনে জেলায় মোট ৬৮টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৩২ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে ৬২টি মামলা হয়েছে। জব্দ করে ধ্বংস করা হয়েছে মোট ১৩ লাখ ৯৬ হাজার মিটার জাল। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা। জব্দ করা হয়েছে ২৫৫ কেজি ইলিশ। নৌকা নিলামে বিক্রি করে আদায় করা হয়েছে ১ লাখ ১০০ টাকা। এ ছাড়া ২১ জনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, ইলিশ শিকার বন্ধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, জেলা পুলিশ, নৌ-পুলিশ, ব্যাটালিয়ন আনসার ও মৎস্য অধিদপ্তর সম্মিলিতভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। তবে অভিযানের সময় নৌকাগুলো সরে যায়, আবার অভিযান শেষ হলে নদীতে ফিরে আসে।
তিনি বলেন, ‘আমাদের ২৪ ঘণ্টা নদীতে বসে থাকার মতো জনবল নেই। শুধু আইন প্রয়োগ ও পাহারা দিয়ে ইলিশ শিকার বন্ধ করা যাবে না। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তা না হলে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।’





















